একটি গেম শোর কথা ভাবুন, যেখানে উপস্থাপক একজন প্রতিযোগীকে তিনটি বিকল্প এ,বি, বা সি থেকে যেকোনো একটি বেছে নিতে বলেন।
ধরুন, প্রতিযোগী বি অপশনটি বেছে নিলেন। এরপর উপস্থাপক বাকি দুটি অপশন থেকে একটি (ধরুন সি) দেখিয়ে বলেন যে, সেটিতে কোনো পুরস্কার নেই। এরপর তিনি প্রতিযোগীকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি কি তার সিদ্ধান্ত বদলিয়ে বাকি থাকা অপশন এ বেছে নিতে চান, নাকি তার প্রথম পছন্দ বি-তেই অবিচল থাকবেন?
আমেরিকান গেম শো উপস্থাপক মন্টি হলের নামে পরিচিত এই বিখ্যাত ধাঁধাটি কয়েক দশক ধরে গণিতবিদদের মুগ্ধ করে আসছে। তবে এটি আমাদের মানব মন ও মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে, সে সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়।
কেন কিছু মানুষ তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন, আর কিছু মানুষ তাদের প্রথম সিদ্ধান্তে অটল থাকেন? আপনি কী করবেন এবং আপনার এই সিদ্ধান্ত আপনার মন সম্পর্কে কী জানাতে পারে?
কখন সিদ্ধান্ত বদলাতে হয়
সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ওপর করা গবেষণায়, কখন এবং কীভাবে মনের পরিবর্তন ঘটে তা ব্যাখ্যা করতে ‘মেটাকগনিশন’ ধারণাটি ব্যবহার করা হয়। সহজভাবে বলতে গেলে, মেটাকগনিশন হলো এমন একটি মনস্তাত্ত্বিক এবং জৈবিক প্রক্রিয়া যা আমাদের জানায় আমরা কোনো কাজ কতটা ভালোভাবে করছি। এক অর্থে, এটি আমাদের ভেতরের সেই কণ্ঠস্বর যা আমাদের বলে যে, আমরা সঠিক পথে আছি, অথবা আমাদের আরও বেশি চেষ্টা করা উচিত।
স্বাভাবিকভাবে মনে হতে পারে, আমাদের প্রথম পছন্দের ওপর যখন আত্মবিশ্বাস কম থাকে, তখনই আমরা সিদ্ধান্ত বদলাই। কিন্তু আমার সহকর্মীরা এবং আমি যখন বিভিন্ন ধরনের সিদ্ধান্তের ওপর হওয়া গবেষণাগুলো পর্যালোচনা করি, তখন দেখতে পাই যে, মানুষ যতটা ভাবা হয়, ততটা ঘন ঘন তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে না। এটি বেশ অবাক করার মতো, কারণ আমরা প্রায়শই আমাদের পছন্দ সম্পর্কে অনিশ্চয়তায় ভুগি।
অন্যদিকে, যখন মানুষ তাদের মন পরিবর্তন করে, তখন প্রায়শই সেই সিদ্ধান্তটি ভালো ফল নিয়ে আসে। সঠিকভাবে মন পরিবর্তনের এই ক্ষমতাকে মেটাকগনিটিভ সেনসিটিভিটি বলা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যখন মানুষকে সময়সীমার মধ্যে রাখা হয়, তখন তারা মন পরিবর্তন করার বিষয়ে আরও ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
আমরা কীভাবে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নেই, তা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারলে আমরা আমাদের মনকে আরও ভালো পছন্দ করার জন্য প্রশিক্ষণ দিতে পারি।
মস্তিষ্ক দেখিয়ে দেয় কখন আমরা মন বদলাব
সিদ্ধান্ত পরিবর্তন সম্পর্কে আরেকটি আকর্ষণীয় প্রশ্ন হলো, মানুষ কখন এটি করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর উত্তর হয়তো আপনার কাছে সহজ মনে হতে পারে— মানুষ প্রথম পছন্দ করার পরেই কেবল তার মন পরিবর্তন করতে পারে।
এই প্রক্রিয়াটি আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য, আমরা একটি ল্যাবরেটরি পরীক্ষার আগে মানুষের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পরিমাপ করি। এই পরীক্ষার সময়ে স্ক্রিনে চলমান ছবি দেখে প্রশ্নের উত্তর দিতে বলা হয়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা সফলভাবে মন পরিবর্তন করার কয়েক সেকেন্ড আগেই তা অনুমান করতে পেরেছিলাম।
এই গবেষণা থেকে বোঝা যায় যে, মস্তিষ্কের এমন কিছু কার্যকলাপ যা সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের পূর্বাভাস দেয়, সেগুলোকে কাজে লাগিয়ে পরবর্তীতে মন পরিবর্তন করার প্রয়োজন ছাড়াই প্রথম পছন্দটির মান উন্নত করা সম্ভব। এই মস্তিষ্কের কার্যকলাপের ওপর ভিত্তি করে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাস্থ্য বা প্রতিরক্ষা শিল্পের মতো সংবেদনশীল পেশার মানুষদের আরও ভালো সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করা যেতে পারে।
আমরা কেন ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করি না?
মেটাকগনিশন নিয়ে গবেষণা থেকে জোরালো প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, মন পরিবর্তন করা সাধারণত ভালো ফল নিয়ে আসে। তাহলে কেন মানুষ তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে এত অনীহা দেখায়?
এর সম্ভাব্য দুটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হলো সাধারণত প্রথম পছন্দটির মান বিশ্লেষণ করার জন্য অতিরিক্ত মানসিক প্রচেষ্টা। সব সিদ্ধান্তের জন্য এই ধরনের প্রচেষ্টা প্রয়োজন হয় না। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বেশিরভাগ পছন্দ নিখুঁত না হলেও চলে, শুধু যথেষ্ট ভালো হলেই হয়।
উদাহরণস্বরূপ, ভুল ব্র্যান্ডের কমলা স্বাদের সফট ড্রিংক বেছে নিলে আমাদের সুস্থতায় সম্ভবত খুব বেশি প্রভাব পড়বে না। আসলে, ভোক্তা গবেষণা দেখায় যে, যখন ক্রেতাদের কম বিকল্প দেওয়া হয়, তখন তারা পণ্যের ওপর বেশি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে। এই ঘটনাকে ‘প্যারাডক্স অফ চয়েস’ বলা হয়। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, বেশি বিকল্প থাকা এবং তাই মন পরিবর্তন করার বেশি সুযোগ থাকা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন এমন কিছু ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যের ইঙ্গিত হতে পারে যা সামাজিকভাবে খুব একটা পছন্দের নয়। অর্থপূর্ণ এবং সন্তোষজনক পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ভর করে অন্য একজন ব্যক্তির কার্যকলাপ অনুমান এবং বিশ্বাস করার ক্ষমতার ওপর। অস্থির এবং ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, এবং মানুষ সম্ভবত সামাজিক সম্পর্ক ভালো রাখার জন্য এটি এড়িয়ে চলে।
সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ
সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের বিজ্ঞান একটি উত্তেজনাপূর্ণ গবেষণার ক্ষেত্র, যা দ্রুত গতিতে বিকশিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই ক্ষেত্রের গবেষণাগুলো সম্ভবত সঠিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের নির্দিষ্ট মস্তিষ্কের কার্যকলাপ চিহ্নিত করার ওপর মনোযোগ দেবে। যদি নির্ভরযোগ্য এবং বৈধ মার্কার খুঁজে পাওয়া যায়, তবে সেগুলোকে কাজে লাগিয়ে মানুষকে কখন তাদের মন পরিবর্তন করা উচিত, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হতে সাহায্য করা যেতে পারে। এর ফলে তাদের পেশাগত এবং সামাজিক জীবন আরও ভালো হবে।
ওহ, মন্টি হলের সেই ধাঁধার কথায় ফিরে আসি: যদি কখনও কোনো গেম শো উপস্থাপক আপনাকে এমন কোনো প্রস্তাব দেন, তবে অবশ্যই আপনার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা উচিত। কারণ, গাণিতিক কারণে, আপনার প্রথম পছন্দ থেকে সরে আসা আপনার জেতার সম্ভাবনা দ্বিগুণ করে দেবে।
সূত্র: দ্য কনভারসেশন