সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা, যা মাইক্রোপ্লাস্টিক নামে পরিচিত, এখন আমাদের মস্তিষ্কেও জমা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে কি না, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
এই অদৃশ্য প্লাস্টিকের টুকরোগুলো এখন পৃথিবীর সব জায়গায় পাওয়া যাচ্ছে। পাহাড়ের চূড়া থেকে শুরু করে সাগরের তলদেশ পর্যন্ত, এমনকি আমরা যে বাতাস শ্বাস নিই এবং যে খাবার খাই, তার ভেতরেও এটি আছে। মানুষের শরীরের ভেতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, যেমন ফুসফুস, হৃদপিণ্ড, গর্ভফুল এবং এমনকি মস্তিষ্কের ভেতরেও এগুলোর অস্তিত্ব মিলেছে। এ থেকে বোঝা যায়, মাইক্রোপ্লাস্টিক আমাদের শরীরের রক্ত-মস্তিষ্কের প্রতিরক্ষা স্তর ভেদ করে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি বিশ্বজুড়ে একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের আসন্ন প্লাস্টিক দূষণ চুক্তি আলোচনাতেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং এর চেয়েও ক্ষুদ্র ন্যানোপ্লাস্টিকের মানব স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব পড়ে, তা এখনও পুরোপুরি বোঝা যায়নি। এই নতুন গবেষণা ক্ষেত্রটিতে বিজ্ঞানীরা নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন।
গবেষণায় যা উঠে এসেছে
মস্তিষ্কে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণাটি গত ফেব্রুয়ারিতে ‘নেচার মেডিসিন’ জার্নালে প্রকাশিত হয়। এই গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা ২০১৬ সালে মারা যাওয়া ২৮ জন এবং গত বছর মারা যাওয়া ২৪ জন মানুষের মস্তিষ্কের টিস্যু পরীক্ষা করেন। এতে দেখা যায়, সময়ের সাথে সাথে মস্তিষ্কে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ বাড়ছে।
এই গবেষণার প্রধান বিজ্ঞানী, মার্কিন বিষাক্ত বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ ক্যাম্পেন জানান, তারা মৃত মানুষের মস্তিষ্কে একটি প্লাস্টিকের চামচের সমপরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক পেয়েছেন। তিনি আরও বলেন, একটি দান করা মানব মস্তিষ্ক থেকে প্রায় ১০ গ্রাম প্লাস্টিক বের করা সম্ভব, যা একটি অব্যবহৃত ক্রেয়নের ওজনের সমান। এই তথ্য বিশ্বজুড়ে সংবাদ শিরোনাম হয়েছিল।
সতর্কতার আহ্বান
তবে অন্য গবেষকরা এই ছোট গবেষণাটি নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। স্কটল্যান্ডের হেরিয়ট-ওয়াট ইউনিভার্সিটির বিষাক্ত বিশেষজ্ঞ থিওডোর হেনরি বলেন, “এটি একটি আকর্ষণীয় আবিষ্কার হলেও, এটি স্বাধীনভাবে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত সতর্কতার সাথে ব্যাখ্যা করা উচিত। প্লাস্টিক কণার সম্ভাব্য স্বাস্থ্য প্রভাব নিয়ে যে অনুমান করা হচ্ছে, তার স্বপক্ষে এখনো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।”
অস্ট্রেলিয়ার আরএমআইটি ইউনিভার্সিটির রসায়ন অধ্যাপক অলিভার জোন্সও বলেন, “নিউ মেক্সিকোর তথ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে দৃঢ় সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব নয়।” তিনি আরও মনে করেন, মস্তিষ্কে অপরিশোধিত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার চেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকার ধারণাটি “অসম্ভব”।
জোন্স আরও জানান, গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা মারা যাওয়ার আগে সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন। গবেষকরাও স্বীকার করেছেন যে, এই মাইক্রোপ্লাস্টিক কণাগুলোই ক্ষতির কারণ, এমনটা প্রমাণ করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য নেই। জোন্স বলেন, “যদি (এবং এটি একটি বড় ‘যদি’) আমাদের মস্তিষ্কে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকেও, এর ফলে ক্ষতির কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।”
অসম্পূর্ণ তথ্যের ঝুঁকি
মাইক্রোপ্লাস্টিকের স্বাস্থ্য প্রভাব নিয়ে অধিকাংশ গবেষণাই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে করা হয়েছে। এর ফলে, কারণ ও ফলাফল প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। গত বছর ‘নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, রক্তনালীতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি হৃদরোগে আক্রান্ত, স্ট্রোক এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ইঁদুরের উপর চালানো গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক তাদের মস্তিষ্কে বিরল ধরনের রক্ত জমাট বাঁধাতে পারে। তবে গবেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, ইঁদুরের শরীর মানুষের থেকে ভিন্ন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২২ সালের একটি পর্যালোচনাতেও বলা হয়েছে যে, মাইক্রোপ্লাস্টিক থেকে মানব স্বাস্থ্যের ঝুঁকির পরিমাণ নির্ধারণের জন্য “প্রমাণ অপর্যাপ্ত।”
তবে অনেক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সতর্কতামূলক নীতি অনুসরণ করার কথা বলছেন। তারা বলছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবেলায় এখনই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। বার্সেলোনা ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল হেলথ-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “নীতিগত সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ তথ্যের জন্য অপেক্ষা করতে পারে না।”
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, “এখনই পদক্ষেপ নিয়ে প্লাস্টিকের সংস্পর্শ কমানো, ঝুঁকির মূল্যায়ন উন্নত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়া গেলে, এই সমস্যাটি ব্যাপক জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হওয়ার আগেই সমাধান করা সম্ভব।”
২০০০ সাল থেকে বিশ্বে প্লাস্টিক উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে এবং ধারণা করা হচ্ছে ২০৬০ সালের মধ্যে তা বর্তমানের তুলনায় তিনগুণ হবে। এই পরিস্থিতিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের হুমকি আমাদের সামনে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
সূত্র: এএফপি
Tags: ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা, প্লাস্টিক, মস্তিষ্ক, মানুষ