সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতীয় বিমান সংস্থাগুলির জন্য পাকিস্তানের আকাশসীমা বন্ধ করে দেওয়ায় এয়ার ইন্ডিয়াকে বছরে ৬০০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হতে পারে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংস্থার একটি অভ্যন্তরীণ চিঠির মাধ্যমে এই তথ্য জানা গেছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, যদি পাকিস্তানের আকাশসীমা বন্ধ থাকে, তবে আগামী এক বছরে এই বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত খরচ হতে পারে। এর প্রধান কারণ হলো বিমানগুলোকে ঘুরপথে চালানো, যার ফলে ফ্লাইটের সময় বেড়ে যাবে এবং জ্বালানি খরচও বৃদ্ধি পাবে।
এয়ারলাইনটি সতর্ক করেছে যে, ফ্লাইটের সময় বেড়ে যাওয়ার কারণে যাত্রীদেরও অসুবিধায় পড়তে হবে। এর ফলে, নিষেধাজ্ঞা যতদিন চলবে, প্রতি বছর এয়ার ইন্ডিয়ার ৫৯১ মিলিয়ন ডলারের বেশি লোকসান হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, পহেলগাম হামলার পর ভারত কর্তৃক আরোপিত কূটনৈতিক বিধিনিষেধের প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তান এই নিষেধাজ্ঞা জারি করে। দিল্লির অভিযোগ, এই হামলায় পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার মদত ছিল। এই নিষেধাজ্ঞা কতদিন চলবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, এটি ভারতের বাইরের আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
এই পরিস্থিতিতে, এয়ার ইন্ডিয়া লোকসান পোষানোর জন্য ভারত সরকারের কাছে আনুপাতিক ভর্তুকি চেয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, “ক্ষতিগ্রস্ত আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলির জন্য ভর্তুকি একটি ভালো, যাচাইযোগ্য এবং ন্যায্য বিকল্প… পরিস্থিতি উন্নত হলে ভর্তুকি প্রত্যাহার করা যেতে পারে।” চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, “আকাশসীমা বন্ধ হওয়া, অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ এবং ক্রুদের কারণে এয়ার ইন্ডিয়ার ওপর সর্বাধিক প্রভাব পড়েছে।”
এখনও পর্যন্ত এয়ার ইন্ডিয়া বা ভারতের বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
পাকিস্তানের নিষেধাজ্ঞা ও দীর্ঘ ফ্লাইট
শুধু এয়ার ইন্ডিয়াই নয়, অন্যান্য ভারতীয় বিমান সংস্থাও এই নিষেধাজ্ঞার কারণে বর্ধিত ব্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে। টাটা গ্রুপের মালিকানাধীন এয়ার ইন্ডিয়া এমনিতেই ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫২০ মিলিয়ন ডলারের নিট লোকসান করেছে, তাই এই অতিরিক্ত বোঝা তাদের জন্য উদ্বেগের কারণ।
ইন্ডিগো জানিয়েছে, তাদের কিছু ফ্লাইটও এই নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রভাবিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বৃহস্পতিবার তাদের নয়াদিল্লি-বাকু (আজারবাইজান) ফ্লাইটে স্বাভাবিকের চেয়ে ৩৮ মিনিট বেশি সময় লেগেছে, মোট সময় লেগেছে ৫ ঘন্টা ৪৩ মিনিট।
তবে, এয়ার ইন্ডিয়ার আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সংখ্যা বেশি হওয়ায় এবং সেগুলোর বেশিরভাগই স্বাভাবিকভাবে পাকিস্তানের ওপর দিয়ে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আমেরিকায় চলাচল করায় তাদের ওপর এই নিষেধাজ্ঞার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, দিল্লি থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী ফ্লাইটগুলোকে এখন অন্তত এক ঘণ্টা বেশি উড়তে হবে, যার জন্য স্বাভাবিকভাবেই অতিরিক্ত জ্বালানির প্রয়োজন হবে।
এয়ার ইন্ডিয়া, এর বাজেট পরিষেবা এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস এবং ইন্ডিগো মিলিয়ে শুধু এপ্রিল মাসেই প্রায় ১,২০০টি ফ্লাইট নয়াদিল্লি থেকে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রা করেছিল।
পটভূমি ও সরকারি পদক্ষেপ
পহেলগাম হামলার প্রতিশোধ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার। বুধবার প্রধানমন্ত্রী প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল অনিল চৌহানের সাথে বৈঠক করেছেন এবং নিষিদ্ধ পাকিস্তানি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী লস্কর-ই-তৈয়বার ছায়া সংগঠন ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’-এর বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের অনুমোদন দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
তবে, সরকার এই পরিস্থিতি এবং এর ফলস্বরূপ রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার কারণে কাশ্মীর তথা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে অবগত রয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, সরকার বিমান সংস্থাগুলির ওপর এই প্রভাব কমাতে বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করছে। এর মধ্যে থাকতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মতো দীর্ঘ রুটের ফ্লাইটের জন্য অতিরিক্ত পাইলট নিয়োগের অনুমতি দেওয়া, কর ছাড় এবং এমনকি পাকিস্তানের মিত্র দেশ চীনের সাথে ওভারফ্লাইট ক্লিয়ারেন্সের জন্য আলোচনা করা।
বিটি/আরকে
Tags: এয়ার ইন্ডিয়া, পাকিস্তান