২০২৫ সালের ১৬ জুন, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকা আলবানিজ একটি নতুন প্রতিবেদন প্রকাশ করেন যার শিরোনাম, ‘দখলদারিত্বের অর্থনীতি থেকে গণহত্যার অর্থনীতি’ (ফ্রম ইকোনোমি অফ ওকোপেশন টু ইকোনোমি অফ জেনোসাইড)। ৩৯ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান দখলদারিত্ব ও গণহত্যা থেকে মুনাফা অর্জনকারী কয়েকটি বহুজাতিক কর্পোরেশনের নাম উঠে আসে। এদের মধ্যে রয়েছে অ্যামাজন, ব্ল্যাকরক, গুগল, লকহিড মার্টিন এবং ভলভো।
এই সংস্থাগুলো, এবং কিছু বিশ্ববিদ্যালয় (বিশেষ করে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি), ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে সেখানে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনে বিশেষভাবে জড়িত। আলবানিজ তার প্রতিবেদনটি শেষ করেন কিছু যৌক্তিক দাবি দিয়ে: গণহত্যা থেকে লাভ করা বন্ধ করুন এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করুন।
এর প্রতিক্রিয়ায়, ৯ জুলাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আলবানিজের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর ফলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে তার নিজস্ব সম্পত্তিতে প্রবেশাধিকার হারান। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর দাবি করে, ‘আলবানিজ নির্লজ্জ ইহুদিবিদ্বেষ ছড়িয়েছেন, সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও পশ্চিমের প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞা দেখিয়েছেন।’
জাতিসংঘ এই নিষেধাজ্ঞাকে একটি ‘বিপজ্জনক নজির’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টেফান দুজারিক বলেন, ‘বিশেষ প্রতিবেদক বা অন্য কোনো জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞ বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একতরফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ অগ্রহণযোগ্য।’ এই ধরনের নিষেধাজ্ঞার শিকার আলবানিজই প্রথম নন। এর আগে, ২০২৫ সালের জুন মাসে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একই নির্বাহী আদেশের অধীনে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারকদের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
জাতিসংঘের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং তাদের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার এই শোরগোল আলবানিজের প্রতিবেদনের মূল বিষয় থেকে মানুষের মনোযোগ সরিয়ে দেয়। মনে হয় যেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই নিষেধাজ্ঞার অস্ত্র ব্যবহার করে এটিকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে চেয়েছেন। অনেক দিক থেকে রুবিও সফলও হয়েছেন। কারণ, এখন মূল আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায় যে, জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা কতটা গ্রহণযোগ্য, আলবানিজের প্রতিবেদনের মূল যুক্তিটি চাপা পড়ে যায়।
মেঘে ঢাকা গণহত্যা
আলবানিজের প্রতিবেদন অনুসারে, বেশ কয়েকটি বহুজাতিক সংস্থা গণহত্যা থেকে মুনাফা অর্জনে জড়িত। এই সংস্থাগুলো মূলত নির্মাণ, শিক্ষা, অর্থায়ন, পরিষেবা এবং অস্ত্র উৎপাদন খাতের। অপ্রত্যাশিত কিছু নামও রয়েছে, যেমন প্রধান অস্ত্র প্রস্তুতকারক লকহিড মার্টিন। এই অস্ত্র কোম্পানিগুলোর একটি সম্পূর্ণ তালিকা আমেরিকান ফ্রেন্ডস সার্ভিসেস কমিটি (এএফএসসি) তৈরি করেছে। অ্যামাজন সম্পর্কিত এএফএসসির অংশটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য:
ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রায় সকল গাজার মানুষের তথ্যের ভাণ্ডার সংরক্ষণের জন্য অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস (এডব্লিউএস) সার্ভার ব্যবহার করে। ২০২১ সাল থেকে, অ্যামাজন ১.২ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে ‘প্রোজেক্ট নিমবাস’-এর অধীনে ইসরায়েলি সরকারকে ক্লাউড পরিষেবা দিচ্ছে, যা তারা গুগলের সাথে ভাগ করে। এটি ইসরায়েলি সরকারের সব শাখাকে পরিষেবা দেয়, যার মধ্যে রয়েছে সেনাবাহিনী, ইসরায়েলি সিকিউরিটি এজেন্সি (শাবাক/’শিন বেত’), পুলিশ, কারাগার পরিষেবা, অস্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ এবং রাফায়েল, এবং অবৈধ বসতি স্থাপনকারী সরকারি সংস্থা।
আলবানিজের প্রতিবেদনে প্রোজেক্ট নিমবাসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং জানানো হয়েছে যে, এর প্রধান অর্থায়ন আসে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে। এরপর প্রতিবেদনে আরও গভীরে গিয়ে বলা হয়েছে:
মাইক্রোসফট, অ্যালফাবেট এবং অ্যামাজন ইসরায়েলকে তাদের ক্লাউড ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে প্রায় সরকারি-ব্যাপী প্রবেশাধিকার দেয়, যা তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নজরদারি এবং বিশ্লেষণ ক্ষমতাকে উন্নত করে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে যখন ইসরায়েলি অভ্যন্তরীণ সামরিক ক্লাউড অতিরিক্ত লোড হয়ে যায়, তখন মাইক্রোসফট তার আজুর প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এবং প্রোজেক্ট নিমবাস কনসোর্টিয়াম ক্লাউড ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো দিয়ে সাহায্যে এগিয়ে আসে।
তাদের ইসরায়েলে অবস্থিত সার্ভারগুলো ডেটা সার্বভৌমত্ব এবং জবাবদিহিতা থেকে সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয়, যা ন্যূনতম সীমাবদ্ধতা বা নজরদারির অনুকূল চুক্তির অধীনে পরিচালিত হয়। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে, একজন ইসরায়েলি কর্নেল ক্লাউড প্রযুক্তিকে আক্ষরিক অর্থেই একটি অস্ত্র হিসেবে বর্ণনা করেন এবং এই কোম্পানিগুলোর কথা উল্লেখ করেন।
এটা স্পষ্ট যে, এই প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো কেবল ইসরায়েলের দখলদারিত্ব ও গণহত্যার জন্য তথ্যই সরবরাহ করে না, বরং তারা ‘জবাবদিহিতা থেকে একটি সুরক্ষা বলয়ও’ তৈরি করে, কারণ তারা এমন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সুরক্ষা করে যা আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যেত। আলবানিজ ইসরায়েলের সেন্টার অব কম্পিউটিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমসের কমান্ডার কর্নেল রাচেলি ডেমবিনস্কির কথা উল্লেখ করেছেন, যিনি ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ডেটা প্রসেসিংয়ের কাজ করেন।
তেল আভিভের কাছে রিশোন লেজিয়নে অনুষ্ঠিত ‘আইটি ফর আইডিএফ’ শীর্ষক এক সম্মেলনে কর্নেল ডেমবিনস্কি বলেছিলেন যে তার সেনাবাহিনী এসব বহুজাতিক প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর (যেমন অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস, গুগল ক্লাউড এবং মাইক্রোসফট আজুর) ক্লাউড স্টোরেজ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিষেবার ওপর নির্ভরশীল। কর্নেল ডেমবিনস্কি জানান যে তার সেনাবাহিনীর ইউনিট—যাকে মামরাম বলা হয়—তাদের অভ্যন্তরীণ সার্ভারে একটি ‘অপারেশনাল ক্লাউড’ ব্যবহার করে, যা তিনি একটি ‘অস্ত্র প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে অভিহিত করেন। এসব সংস্থা গণহত্যা থেকে মোট কত লাভ করেছে, সে বিষয়ে কোনো জনসমক্ষে তথ্য নেই।
২০২৪ সালে, অ্যামাজন এবং গুগলের কর্মচারীরা ‘নো টেক ফর অ্যাপারথেড’ নামে একটি প্রচারাভিযান শুরু করেন। নিউ ইয়র্কের একটি অনুষ্ঠানে যখন গুগল ইসরায়েলের বারাক রেগেভ কথা বলছিলেন, তখন একজন গুগল কর্মচারী তাকে বাধা দিয়ে বলেন, ‘আমি একজন গুগল ক্লাউড সফটওয়্যার প্রকৌশলী এবং আমি এমন প্রযুক্তি তৈরি করতে অস্বীকার করি যা গণহত্যা, বর্ণবৈষম্য বা নজরদারির কাজে লাগে।’ এই ‘নো টেক ফর অ্যাপারথেড’ প্রচারাভিযানের সাথে যুক্ত থাকার কারণে বেশ কয়েকজন গুগল প্রকৌশলীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। তবে এতে এই আন্দোলন থেমে যায়নি এবং তারা আরও প্রতিবাদ সংগঠিত করছে।
অন্ধ এক চোখ
২০০৩ সালে, পিটার থিয়েল এবং অন্যান্যরা মিলে ‘প্যালান্টির’ নামে একটি প্রযুক্তি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। নামটি ‘লর্ড অব দ্য রিংস’ থেকে নেওয়া হয়েছে এবং এটি দূর থেকে দেখতে সক্ষম এক স্ফটিক গোলককে বোঝায়। থিয়েল, যিনি একজন গোঁড়া রক্ষণশীল মুক্তচিন্তাবিদ এবং ‘পাশ্চাত্য সভ্যতা’র প্রতি গভীর বিশ্বাসী, তিনি পেপাল ও ফেসবুক থেকে অর্থ উপার্জন করে সামরিক ও গোয়েন্দা চুক্তির লাভজনক জগতে প্রবেশ করেন (প্যালান্টিরের প্রথম বড় বিনিয়োগকারী ছিল সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম ইন-কিউ-টেল)। ২০১৫ সালে, প্যালান্টির ইসরায়েলে ব্যবসা শুরু করে, বিশেষ করে তাদের সামরিক ও গোয়েন্দা বিভাগের সাথে ডেটা ইন্টিগ্রেশন, ডেটা বিশ্লেষণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে কাজ করে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে, ইসরায়েলি গণহত্যার প্রথম ধাপে, প্যালান্টিরের সিইও অ্যালেক্স কার্প ফক্স বিজনেসের কাছে বলেছিলেন, ‘আমরা ইসরায়েলে বেশ সুপরিচিত।’
২০২৪ সালের ১২ জানুয়ারি, প্যালান্টির ইসরায়েলি সামরিক শিল্পের সঙ্গে গণহত্যায় সহায়তার জন্য একটি অংশীদারিত্ব গঠন করে। সেই সময় প্যালান্টিরের কার্যনির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট জশ হ্যারিশ বলেন, ‘উভয় পক্ষই যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত মিশনে সহায়তার জন্য প্যালান্টিরের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে পারস্পরিকভাবে সম্মত হয়েছে।’ ‘যুদ্ধ-সম্পর্কিত মিশন’ শব্দগুচ্ছটি সরাসরি গণহত্যার সঙ্গে সম্পর্কিত, যা ২৪ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতও উল্লেখ করে। প্যালান্টিরের ‘টাইটান’ সিস্টেম নির্ভুল লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু গাজায় বেসামরিক মানুষের বিপুল হতাহতের সংখ্যা থেকে বোঝা যায় যে এটি অসামরিক মানুষদের হত্যায় অত্যন্ত নির্ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল, হিল অ্যান্ড ভ্যালি ফোরামে প্যালান্টিরের সিইও কার্পকে ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুর বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তর দেন, ‘আমরা মূলত সন্ত্রাসীদের হত্যা করার জন্য দায়ী, এটা সত্যি।’ অবশ্যই এটি সত্যি নয়, কারণ গাজায় নিহতদের বেশিরভাগই বেসামরিক মানুষ (এক্ষেত্রে জাতিসংঘের কাছে ২০০৮ সাল থেকে ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুর মোট সংখ্যা বিষয়ক তথ্য দেখা যেতে পারে; যদি নিহত সবাই হামাস এবং ইসলামিক জিহাদের সদস্য হতো, তবে এই দলগুলো আরও শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীতে পরিণত হতো)।
২০২৪ সালে তেল আভিভের বৈঠকে এবং ২০২৫ সালের হিল অ্যান্ড ভ্যালি ফোরামে কার্পের মন্তব্যগুলোর ওপর ভিত্তি করে আলবানিজের প্রতিবেদন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে তারা ‘ইসরায়েলের বেআইনি বলপ্রয়োগের বিষয়ে নির্বাহী পর্যায়ের জ্ঞান এবং উদ্দেশ্যকে নির্দেশ করে, এবং এই ধরনের কাজ প্রতিরোধ বা অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকতে ব্যর্থ হয়েছে।’
প্যালান্টিরের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অভিবাসীদের নির্বাসনের খবর সামনে আসার পর, যুক্তরাষ্ট্রে প্যালান্টিরের অফিসগুলোর সামনে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রতিবাদগুলো ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে প্যালান্টিরের গণহত্যার কাজ এবং মার্কিন রাষ্ট্রের সঙ্গে অভিবাসীদের নির্বাসনের জন্য সহযোগিতার মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে।
দখলদারিত্ব থেকে মুনাফা
কয়েক দশক ধরে, জাতিসংঘ এবং অন্যান্য দল (ফিলিস্তিনি সংস্থাগুলো সহ) তদন্ত করে দেখেছে যে, কীভাবে কর্পোরেশনগুলো ফিলিস্তিন দখল থেকে লাভবান হচ্ছে। ইউএনসিটিএডির রক্ষণশীল অনুমান অনুযায়ী, ইসরায়েল শুধু পশ্চিম তীরকে সরাসরি শোষণ করে বার্ষিক ৪১ বিলিয়ন ডলার আয় করে (ইসরায়েলি জিডিপির প্রায় ৭%)। এর মধ্যে এমন অন্যান্য পরোক্ষ সুবিধা অন্তর্ভুক্ত নয় যা একটি দুর্বল জনগোষ্ঠীকে শোষণ করার মাধ্যমে আসে।
২০২০ সালে, জাতিসংঘ এমন কোম্পানিগুলোর একটি ডেটাবেস প্রকাশ করে যারা পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতি স্থাপন কার্যক্রম থেকে লাভবান হয়েছে। ডেটাবেসের বেশিরভাগ কোম্পানিরই সদর দপ্তর ইসরায়েলে, তবে অনেকগুলো বহুজাতিক কর্পোরেশনও ছিল। পরিচিত কিছু নাম হলো এয়ারবিএনবি (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র), বুকিং.কম (নেদারল্যান্ডস), এক্সপিডিয়া (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র), ট্রিপঅ্যাডভাইজর (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র), জেনারেল মিলস (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র), এবং মটোরোলা (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)।
এদিকে, ‘হুপ্রোফিটস’ ওয়েবসাইটটি শুধু গণহত্যা এবং দখলদারিত্ব থেকে লাভবান হওয়া সংস্থাগুলোর একটি সঠিক ডেটাবেস তৈরি করেই থেমে থাকেনি, বরং এটি নির্দিষ্ট কার্যক্রমের ক্ষেত্র নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনও প্রকাশ করে। যেমন, ২০২৪ সালের তাদের প্রতিবেদন ‘সবুজের আড়ালে দখলদারিত্ব’ (গ্রিনওয়াশিং ডিসপোসেশন): অবৈধভাবে দখলকৃত প্রাকৃতিক সম্পদ ও ইসরায়েলি নবায়নযোগ্য জ্বালানি শিল্প’ বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। ‘ডোন্ট বাই ইনটু অকুপেশন’ জোটের ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে ইউরোপীয় আর্থিক সংস্থাগুলো এবং অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপন প্রকল্পে তাদের লাভজনক যোগসূত্র তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
২০২৫ সালের ১০ জুন, গ্লোবাল লিগ্যাল অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (জিএলএএন), সাদাকা আয়ারল্যান্ড এবং আল-হক (ফিলিস্তিন) আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এয়ারবিএনবির বিরুদ্ধে দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে তাদের কার্যক্রমের জন্য কয়েকটি মামলা দায়ের করে। ২০১৮ সালে, এয়ারবিএনবি বলেছিল যে তারা ‘আমাদের প্রভাব বিবেচনা করবে এবং দায়িত্বশীলভাবে কাজ করবে,’ কিন্তু পরে তারা তাদের অবস্থান থেকে সরে আসে এবং জিএলএএন-এর তথ্য অনুযায়ী, তারা ‘পশ্চিম তীরে ৩০০টিরও বেশি থাকার জায়গার তালিকা করে রেখেছে।’
এই তিনটি সংস্থা যুক্তি দেয় যে, এখানে একটি অপরাধ হল ‘এয়ারবিএনবি কর্তৃক ইসরায়েলি যুদ্ধাপরাধের আয়ের অর্থ পাচার’ করা। এগুলো গুরুতর অভিযোগ, বিশেষ করে আয়ারল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্যে, যেখানে কঠোর অর্থ পাচারবিরোধী আইন রয়েছে।
জিএলএএন-এর সিনিয়র আইনজীবী জেরি লিস্টন বলেন, ‘এগুলোই প্রথম মামলা যেখানে যুক্তরাজ্যের এবং অন্যান্য জায়গার অর্থ পাচারবিরোধী আইনকে অবৈধ ইসরায়েলি বসতিতে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে প্রয়োগ করা হয়েছে। তারা দেখিয়েছে যে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব থেকে লাভবান হওয়া কোম্পানিগুলোর সিনিয়র কর্মকর্তারা একটি অত্যন্ত গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের জন্য বিচারের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।’
দখলদারিত্ব থেকে এই কোম্পানিগুলোর মুনাফা কেবল ফিলিস্তিনিদের খরচে অর্জিত আয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তারা ভূমি দখল এবং পরিবেশ দূষণেও অবদান রাখে। একটি উদাহরণ হল গেসুরি অ্যাগ্রোকেমিক্যাল কোম্পানি, যা তুলকারেমের স্থানীয় ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব ফেলে এবং এর ফলে ক্যান্সার, হাঁপানি এবং চোখ ও শ্বাসযন্ত্রের স্বাস্থ্যজনিত অস্বাভাবিকতার হার বেড়ে যায়। এই উদাহরণটি পশ্চিম তীরে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, কারণ ইসরায়েলি কোম্পানিগুলো পশ্চিম তীর জুড়ে ক্ষতিকর এবং দূষণকারী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে লাভবান হচ্ছে।
কোনো অধিকারবিহীন একটি দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর নিরীক্ষার জন্য ব্যবহার করা, অনুপ্রবেশকারী গুপ্তচরবৃত্তি প্রযুক্তি বিকাশের জন্য একটি মূল্যবান উৎস হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। এর একটি প্রধান উদাহরণ হল পেগাসাস স্পাইওয়্যার, যা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কুখ্যাত গোয়েন্দা ইউনিট ৮২০০, ইসরায়েলি শিক্ষাবিদ এবং ব্যক্তিগত পুঁজির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় তৈরি করা হয়েছে। এই স্পাইওয়্যারটি বিশ্বজুড়ে দমনমূলক সরকারগুলো ভিন্নমত পোষণকারীদের দমন করার জন্য ব্যবহার করেছে, যেখানে ৫০,০০০-এর বেশি মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
বয়কট ডিভেস্টমেন্ট অ্যান্ড স্যাঙ্কশনস (বিডিএস) আন্দোলনের তথ্য অনুসারে, ‘২০২০ সালে, ইসরায়েলি সাইবার ফার্মগুলো এই খাতে বৈশ্বিক বিনিয়োগের প্রায় ৩১% পেয়েছে। ইসরায়েলি সাইবার কোম্পানিগুলোর অধিগ্রহণ থেকে প্রায় ৪.৭ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে এবং ইসরায়েলি সাইবার রপ্তানি দাঁড়িয়েছিল ৬.৮৫ বিলিয়নে ডলার। ইসরায়েল স্পাইওয়্যার এবং নজরদারি বাজারের একটি প্রধান নেতা হয়ে উঠেছে, যা ডেটা সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণের দক্ষতা প্রদান করছে, যার মধ্যে রয়েছে স্পাইওয়্যার, ফেসিয়াল রিকগনিশন, ‘ব্যবহারকারী ট্র্যাকিং টুল’ যা পুলিশিং, নির্বাচনী কারসাজি এবং আরও অনেক কিছুর জন্য ব্যবহৃত হয়।
গণহত্যার অভিজাত শ্রেণি
জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ওপর মনোযোগ দেওয়াটা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। একটি নতুন প্রকল্প, ‘জেনোসাইড জেন্ট্রি’, সরাসরি অস্ত্র প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলোর (বোয়িং, এলবিট সিস্টেমস অফ আমেরিকা, জেনারেল ডাইনামিক্স, লকহিড মার্টিন, নর্থরপ গ্রুম্যান এবং আরটিএক্স—যা পূর্বে রেথিয়ন নামে পরিচিত ছিল) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ওপর নজর রাখে। এরা মার্কিন পেন্টাগনের প্রধান প্রতিরক্ষা ঠিকাদার। এই গ্রুপটি—যা ওপেন-সোর্স অনলাইন প্ল্যাটফর্ম লিটলসিস দ্বারা তৈরি—এই সংস্থাগুলোর জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বের নাম প্রকাশ করে, অন্যান্য কর্পোরেশনের সাথে তাদের সংযোগ খুঁজে বের করে এবং তারপর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে তাদের যোগসূত্র চিহ্নিত করে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোই সবচেয়ে দুর্বল সংযোগ, কারণ তারা গণহত্যার সাথে জড়িত কর্পোরেশনগুলোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে পছন্দ করে না, যদিও তাদের অর্থের প্রয়োজন হয়।
জেনোসাইড জেন্ট্রি একটি সহজ তিন-ধাপের কৌশল প্রস্তাব করে:
১. আপনার শহর/বিশ্ববিদ্যালয়/কর্মস্থলের সাথে গণহত্যার সংযোগ সম্পর্কে আরও ভালোভাবে বুঝুন। তাদের ডেটাবেসটি একটি শহরে কোনো অস্ত্র কোম্পানির সদস্য কোনো প্রতিষ্ঠানের বোর্ডে আছে কিনা, তা খুঁজে বের করতে সাহায্য করে।
২. আপনার সম্প্রদায়ের মধ্যে থাকা সাংস্কৃতিক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিত করুন যাদের অস্ত্র কোম্পানির সাথে যোগসূত্র রয়েছে।
৩. বোর্ড সদস্য এবং দাতাদের প্রোফাইল ব্যবহার করে নির্দিষ্ট উদাহরণ খুঁজে বের করুন যে কীভাবে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যুদ্ধযন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত।
এখানে একটি আকর্ষণীয় উদাহরণ হলো: ক্যাথি ওয়ার্ডেন নর্থরপ গ্রুম্যানের সিইও এবং তিনি ‘ক্যাটালিস্ট’-এর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য, যা একটি বৈশ্বিক অলাভজনক সংস্থা এবং ‘নারীদের জন্য কাজ করার মতো কর্মক্ষেত্র’ তৈরি করতে সাহায্য করে। কিন্তু অন্যদিকে, জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওমেন) অনুমান করে, গাজায় নর্থরপ গ্রুম্যানসহ কিছু সংস্থার সরবরাহ করা অস্ত্রের আঘাতে কমপক্ষে ২৮,০০০ নারী ও মেয়ে নিহত হয়েছে এবং সংস্থাটি সতর্ক করে যে নর্থরপ গ্রুম্যান দ্বারা চালিত যুদ্ধযন্ত্রের কারণে গাজায় ১০ লাখ নারী ও মেয়ে অনাহারে ভুগছে। তাহলে নারীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ক্যাটালিস্টের ‘ব্র্যান্ড’-এর কী হবে?
এই কৌশলগুলো সফলও হয়েছে। ২০২৪ সালের প্রথম দিকে, কর্মীরা অস্টিনের সাউথ বাই সাউথওয়েস্ট উৎসবে পারফর্ম করতে ইচ্ছুক শিল্পীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে। মার্চ মাসে, এলা উইলিয়ামস (যিনি স্কুইরেল ফ্লাওয়ার নামে গান করেন) ঘোষণা করেন যে, তিনি এসএক্সএসডব্লিউ-এ যাবেন না, কারণ এটি অস্ত্র প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলোর দ্বারা পৃষ্ঠপোষিত। ইনস্টাগ্রামে তিনি লেখেন, ‘এসএক্সএসডব্লিউ প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের, যার মধ্যে রেথিয়নের সহায়ক সংস্থাগুলোও রয়েছে, এবং উৎসবের প্রধান পৃষ্ঠপোষক মার্কিন সেনাবাহিনীকে প্ল্যাটফর্ম দিচ্ছে… গণহত্যা থেকে লাভবান হওয়া রেথিয়নের মতো সংস্থাগুলো আমাদের করের টাকায় কেনা অস্ত্র আইডিএফকে সরবরাহ করে। একটি সংগীত উৎসবে যুদ্ধ থেকে লাভবান হওয়াদের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত নয়। আমি এতে জড়িত হতে অস্বীকার করছি এবং প্রতিবাদে আমার শিল্প ও শ্রম প্রত্যাহার করে নিচ্ছি।’
এরপর আরও ৭৯ জন শিল্পী এই উৎসব বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন। ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে, এসএক্সএসডব্লিউ ঘোষণা করে যে, তারা মার্কিন সেনাবাহিনী এবং রেথিয়নের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন করবে।
গণহত্যা চলতে থাকায় এটি স্পষ্ট যে, বড় বিনিয়োগকারীদের জন্য ফিলিস্তিনের দখলদারিত্ব থেকে প্রাপ্ত মুনাফা রক্ষা করার কিছু স্বার্থ রয়েছে। পরিস্থিতি হতাশাজনক এবং কুৎসিত, কিন্তু এখন পর্যাপ্ত প্রমাণ রয়েছে—যেমন আলবানিজের প্রতিবেদন থেকে—যে জায়নবাদের ফিলিস্তিন দখল এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি তাদের আচরণের বর্বরতা কতটা প্রকট। এছাড়াও, এমন প্রচুর অকাট্য প্রমাণ রয়েছে যা থেকে জানা যায় যে, কীভাবে কর্পোরেশন এবং তাদের প্রযুক্তিগুলো ফিলিস্তিনিদের দমন করতে ব্যবহৃত হয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী এর ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে। এই প্রমাণগুলোর ওপর আন্তর্জাতিক সংস্থা, আদালত বা জনমত দ্বারা পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। নীরব থাকা কোনো বিকল্প নয়। আমরা তখন পর্যন্ত মুক্ত নই, যতক্ষণ না সবাই মুক্ত।
সূত্র: কাউন্টার কারেন্টস
Tags: ফিলিস্তিনি গণহত্যা, বৈশ্বিক অর্থীিতি