প্রস্তাবিত ‘বাণিজ্যিক আদালত অধ্যাদেশ ২০২৫’ সারা দেশের বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন বাণিজ্যিক বিরোধগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য নতুন আশার আলো দেখাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই অধ্যাদেশের আওতায়, জেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বাণিজ্যিক আদালত স্থাপন করা হবে, যেগুলো একচেটিয়াভাবে বাণিজ্যিক বিরোধগুলো পরিচালনা করবে এবং দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করবে।
আইন মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ের পর, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন উপদেষ্টা পরিষদ চলতি বছরের ১১ ডিসেম্বর খসড়া অধ্যাদেশটি অনুমোদন করে। বর্তমানে খসড়াটি রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের স্বাক্ষরের অপেক্ষায় রয়েছে।
আইন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ পরামর্শক ও খসড়া পর্যালোচনাকারী ব্যারিস্টার তানিম হোসেন শাওন ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস’কে বলেন, রাষ্ট্রপতি আগামী সপ্তাহে খসড়াটিতে স্বাক্ষর করতে পারেন। রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর করলেই এ বিষয়ে একটি গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি করা হবে বলে তিনি জানান।
২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে নিবন্ধিত কোম্পানির সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৮ হাজার ৮৬৯টি। অথচ হাইকোর্ট বিভাগের মাত্র দুটি বেঞ্চ অন্যান্য মামলার পাশাপাশি করপোরেট বিরোধগুলো পরিচালনা করে, যার ফলে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়।
২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সারা দেশের আদালতগুলোতে মোট ৪৬ লাখ ৫০ হাজার মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগ এবং সারা দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক করপোরেট বিরোধ ঝুলে আছে।
সম্প্রতি এক সেমিনারে সদ্য বিদায়ী প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, “দ্রুত, দক্ষ এবং স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দিয়ে আমরা বাণিজ্যিক ন্যায়বিচারের একটি শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করছি। একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়িত অর্থনীতিতে, একটি জাতির বিচার বিভাগের গুণমান একটি প্রাথমিক অর্থনৈতিক সূচক হয়ে উঠেছে।”
তিনি আরও বলেন, “দেশি হোক বা বিদেশি—বিনিয়োগকারীরা একটি দেশকে শুধু কর প্রণোদনা বা অবকাঠামো দিয়ে বিচার করেন না। তারা নিশ্চয়তা চান। তারা আশ্বাস চান যে চুক্তির সম্মান করা হবে, অধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং বিরোধগুলো দশকের পর দশক ধরে নয়, বরং কয়েক মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি হবে।”
তিনি যোগ করেন, “এই বাণিজ্যিক আদালতগুলোর মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে আমরা বিশ্বকে একটি স্পষ্ট ও জোরালো বার্তা দিচ্ছি যে বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত এবং এর বিচার ব্যবস্থা সেই প্রতিশ্রুতির রক্ষক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।”
খসড়া অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বাণিজ্যিক আদালতগুলো ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বীমা সংক্রান্ত বিষয়সহ অন্তত ২২ ধরনের বাণিজ্যিক বিরোধের বিচার করবে।
এর মধ্যে ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসায়ীদের সাধারণ লেনদেন সংক্রান্ত বিরোধ—যেমন বাণিজ্যিক নথিপত্রের সম্পাদন ও ব্যাখ্যা; পণ্য বা সেবার আমদানি-রপ্তানি; বিমান, বিমানের ইঞ্জিন, সরঞ্জাম ও হেলিকপ্টার সংক্রান্ত লেনদেন (বিক্রয়, ইজারা ও অর্থায়নসহ); পণ্য পরিবহন এবং টেন্ডারসহ নির্মাণ ও অবকাঠামো চুক্তিগুলোও বাণিজ্যিক আদালতে বিচার করা হবে। এছাড়া সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সময় সময় অন্য যে কোনো বাণিজ্যিক বিরোধকে বাণিজ্যিক আদালতের এখতিয়ারভুক্ত করতে পারবে বলে অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
জেলা ও দায়রা জজদের বাণিজ্যিক আদালতের বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে এবং প্রধান বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে এক বা একাধিক বাণিজ্যিক আপিল বেঞ্চ গঠন করবেন।
খসড়া অধ্যাদেশের ৭(১) ধারা অনুযায়ী, এই অধ্যাদেশের অধীনে দায়েরকৃত কোনো মামলা বা আবেদনে বাণিজ্যিক বিরোধের বিষয়বস্তুর মূল্য ৫০ লাখ টাকার কম হতে পারবে না। তবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সরকারি গেজেটে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সময় সময় এই মূল্য সংশোধন করতে পারবে।
ধারা ৭(২)(ক)-তে বলা হয়েছে, “যেক্ষেত্রে কোনো মামলা বা আবেদনের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের প্রতিকার চাওয়া হয়, সেক্ষেত্রে মামলা বা আবেদন দায়ের করার তারিখ পর্যন্ত অর্জিত সুদসহ দাবি করা অর্থই নির্ধারিত মূল্য হিসেবে গণ্য হবে।”
অধ্যাদেশের ৯(১) ধারা অনুযায়ী, বাণিজ্যিক আদালতের কোনো রায় বা আদেশে সংক্ষুব্ধ কোনো পক্ষ রায় বা আদেশের তারিখ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে ‘কমার্শিয়াল আপিল কোর্ট’ বা বাণিজ্যিক আপিল আদালতে আপিল করতে পারবে।
আবার ৯(২) ধারা অনুযায়ী, বাণিজ্যিক আপিল আদালতের সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ কোনো পক্ষ সিদ্ধান্তের তারিখ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করতে পারবে।
বাণিজ্যিক আপিল আদালত আপিল দায়েরের তারিখ থেকে ছয় মাসের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তির চেষ্টা করবে এবং সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বাণিজ্যিক আপিল আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত আপিল তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির চেষ্টা করবে।
এই অধ্যাদেশের অধীনে কোনো বিরোধের ক্ষেত্রে, বিবাদীর ওপর সমন জারি করার পর মামলার কোনো পক্ষ ইস্যু গঠনের পর সংক্ষিপ্ত বিচারের মাধ্যমে ‘সামারি জাজমেন্ট’ বা সংক্ষিপ্ত রায়ের জন্য আবেদন করতে পারবে।
বিটি/ আরকে
Tags: নতুন আইন, নিষ্পত্তি, বাণিজ্যিক বিরোধ