ক্রিকেটের বর্তমান বাস্তবতা হলো—ভারতের স্থানীয় রাজনীতির একটি ছোট পদক্ষেপ অন্য কোনো দেশের ক্রিকেটীয় ভাগ্যে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
১৯৯৩ সালে বলিউডের এক উদীয়মান তারকা ‘ডর’ এবং ‘বাজিগর’-এর মতো ব্লকবাস্টার সিনেমার মাধ্যমে ‘অ্যান্টি-হিরো’ বা খল-নায়ক চরিত্রের ধারণা জনপ্রিয় করেছিলেন। ঠিক ৩৩ বছর পর, সেই ঘটনার এক পরোক্ষ রেশ যেন বাংলাদেশকে একটি বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পথে ঠেলে দিল।
আপনার কাছে এই সংযোগটি অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, তবে এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক অস্বস্তিকর সত্য—বর্তমান আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভারতের ক্ষমতাসীন ‘হিন্দুত্ববাদী’ শাসনের একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
মোস্তাফিজের বিদায় থেকে বাংলাদেশের বহিষ্কার
পুরো বিষয়টি শুরু হয় গত ২ জানুয়ারি। ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির নেতা সঙ্গীত সোম ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় মুসলিম ব্যক্তিত্ব শাহরুখ খানকে ‘দেশদ্রোহী’ বলে আক্রমণ করেন। শাহরুখ আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর)-এর মালিক, যে দলে বাংলাদেশি ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমান চুক্তিবদ্ধ ছিলেন। সোম মোস্তাফিজকে “ভয়াবহ পরিণতির” হুমকি দেন এবং দাবি করেন যে শাহরুখের ভারতে থাকার অধিকার নেই। এই উস্কানি দ্রুতই শাহরুখ ও মোস্তাফিজের বিরুদ্ধে ঘৃণার জোয়ার তৈরি করে।
এর কয়েক দিন পরেই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) কেকেআর-কে তাদের এই খেলোয়াড়কে ছেড়ে দেওয়ার ‘অনুরোধ’ জানায়। কারণ হিসেবে অস্পষ্টভাবে বলা হয়, “চারপাশে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা”।
এই ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে (বিসিবি) নির্দেশ দেন যাতে তারা আইসিসি-র কাছে আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ভেন্যু ভারত থেকে সরিয়ে শ্রীলঙ্কায় নেওয়ার দাবি জানায়। তিনি যুক্তি দেন, “যদি একজন বাংলাদেশি ক্রিকেটার ভারতে নিরাপদ না হন, তবে পুরো দলের পক্ষে সেখানে ভ্রমণ করা অনিরাপদ।”
তবে আইসিসি বিসিবির এই অনুরোধ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে জানায় যে, এমন দাবি মেনে নিলে ভবিষ্যতে আইসিসি ইভেন্টের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ণ হবে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দিয়ে সেখানে স্কটল্যান্ডকে স্থলাভিষিক্ত করা হয়।
‘অস্পষ্টতার সমুদ্র’ ও নেপথ্যের রাজনীতি
ভারতের এই ‘হিন্দুত্ববাদী’ শাসনের সঙ্গে ক্রিকেটের সম্পর্ক ঠিক কোথায়? সঙ্গীত সোমের এই হুমকি ছিল মূলত পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজেপির চিরচেনা মুসলিম-বিদ্বেষী প্রচারণার অংশ। তারা বারবার শাহরুখ খানকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে কারণ তিনি ভারতের মুসলিম সমাজের অন্যতম আইকনিক মুখ।
সবচেয়ে নজিরবিহীন বিষয় ছিল বিসিসিআই-এর ভূমিকা। কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা ছাড়াই সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কেকেআর-কে মোস্তাফিজকে বাদ দিতে বলা হয়। অভিজ্ঞ ক্রীড়া সাংবাদিক শারদা উগ্রার মতে, বিসিসিআই ইচ্ছাকৃতভাবে একটি ‘অস্পষ্টতার সমুদ্র’ তৈরি করে রাখে যাতে কোনো সুনির্দিষ্ট নথিপত্র বা কারণ দর্শাতে না হয়।
আইসিসি কি ভারতের হাতের পুতুল?
আইসিসি বর্তমানে পরিচালিত হচ্ছে জয় শাহর মাধ্যমে, যিনি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ছেলে। ফলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আইসিসি যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, তাকে ‘চরম ভণ্ডামি’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে যখন পাকিস্তানের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ভেন্যু ভারতের আপত্তির কারণে হাইব্রিড মডেলে নেওয়া হয়েছিল, তখন আইসিসি-র ‘নিরপেক্ষতা’ কোথায় ছিল—সেই প্রশ্ন তুলেছেন পাকিস্তানের পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাভি।
বাংলাদেশি সাংবাদিক মোহাম্মদ ইসাম মনে করেন, বিসিবির জন্য বিসিসিআই-এর বিরুদ্ধে লড়াই করা কঠিন, কারণ ভারতের সাথে একটি সিরিজ থেকেই বোর্ডের কয়েক বছরের খরচ উঠে আসে। এই আর্থিক নির্ভরশীলতাই ভারতকে বিশ্ব ক্রিকেটে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছে।
ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ কী?
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক সুশান্ত সিংয়ের মতে, মোস্তাফিজের ঘটনাটি শেষ নয়। সংখ্যাগুরুবাদী রাজনীতির বেদীতে ভবিষ্যতে আরও খেলোয়াড়কে বলি হতে হবে। অন্যদিকে শারদা উগ্রা মনে করেন, আইসিসি এখন একটি ‘অগম্ভীর’ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে এবং অস্ট্রেলিয়া বা ইংল্যান্ডের মতো বড় বোর্ডগুলো ভারতের অনুগত হয়েই থাকতে পছন্দ করে।
বর্তমানে পাকিস্তানও ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের ঘোষণা দিয়েছে, যা আইসিসি-র বিশাল আয়ের উৎসকে হুমকির মুখে ফেলেছে। ভারতের এই একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ এখন ক্রিকেটের চেয়ে রাজনৈতিক ‘ভোটব্যাংক’ সন্তুষ্ট করতেই বেশি ব্যস্ত।
দুর্ভাগ্যবশত, এই সমস্যার কোনো দ্রুত সমাধান নেই। যতক্ষণ না ক্রিকেট বোর্ডগুলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায় আসছে, ততক্ষণ ভারতের স্থানীয় রাজনীতির ‘প্রজাপতির ডানার ঝাপটানি’ অন্য দেশের ক্রিকেটে এভাবেই টাইফুন হয়ে আছড়ে পড়বে।
সূত্র: ডন
Tags: ‘হিন্দুত্ববাদ, আইসিসি, ক্রিকেটের মানচিত্র, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, পিসিবি, বিজেপি, বিবিসিআই, বিসিবি, মুস্তাফিজ, মোস্তাফিজ