যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকির অবসান ঘটিয়ে তা কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে নতুন করে গতি ফিরতে শুরু করেছে। একাধিক মার্কিন ক্রেতা ইতোমধ্যে স্থগিত অর্ডার পুনরায় চালু করতে রপ্তানিকারকদের নির্দেশনা দিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
শিল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শুল্ক নিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা এবং ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের আশঙ্কায় অনেক অর্ডার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সমঝোতার ফলে পরিস্থিতি এখন অনেকটাই স্বাভাবিকের পথে।
স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম ইংরেজি দৈনিক ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে বলেছেন, “শুল্ক বাড়ার আশঙ্কায় আমাদের প্রায় ৫০ লাখ ডলারের অর্ডার স্থগিত ছিল, যা প্রায় ৩ লাখ পোশাকের সমান। এখন ২০ শতাংশ হার নির্ধারণের পর ক্রেতারা আবার যোগাযোগ করে অর্ডার পুনরায় চালু করতে বলছেন।”
তিনি জানান, অন্তত দেড় ডজন মার্কিন বিখ্যাত ক্রেতা অর্ডার বন্ধ করেনি এবং তারা শুল্ক বৃদ্ধির অতিরিক্ত চাপও বাংলাদেশের সরবরাহকারীদের ওপর চাপায়নি।
তিনি বলেন, “আমি যেসব খুচরা বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলেছি, তারা মূল্যস্ফীতি ও শুল্ক বিবেচনায় খুচরা মূল্য সামান্য বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর ফলে সাময়িকভাবে চাহিদা কমে যেতে পারে। ”
চট্টগ্রামভিত্তিক পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এশিয়ান গ্রুপ, যাদের ৯৩ শতাংশ রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্রে, তারাও এই সমঝোতাকে ইতিবাচকভাবে দেখছে।
এশিয়ান গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক খোন্দকার বেলায়েত হোসেন জানান, “আমাদের বড় দুই মার্কিন ক্রেতা টার্গেট ও ওয়ালমার্ট অর্ডার স্থগিত করেনি। তবে কিছু ক্রেতা এখনো চুক্তির আনুষ্ঠানিকতা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন। আশা করছি, আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে তারা সিদ্ধান্ত নেবেন।”
তিনি আরও জানান, গত এপ্রিল মাসে শুল্ক ১০ শতাংশ বাড়ানোর পর কিছু ক্রেতা পরোক্ষভাবে সরবরাহকারীদের কাছ থেকে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় চেয়েছিল।
বেলায়েত মনে করেন, ভবিষ্যতে কিছু ক্রেতা হয়তো আবার আংশিক খরচ ভাগাভাগির কথা তুলতে পারে, বিশেষ করে যেসব ক্ষেত্রে সরবরাহকারীদের ক্রেতাদের ওপর প্রভাব বেশি।
তিনি পরামর্শ দেন, “মার্কিন বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমাতে হবে এবং উৎপাদন খরচ অন্তত ১ থেকে ২ শতাংশ কমাতে হবে। এর জন্য অটোমেশন ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতি গ্রহণ করা দরকার।”
জায়ান্ট গ্রুপের পরিচালক এস এম মজিদুর রহিম বলেন, “২০ শতাংশ প্রতিপালনমূলক শুল্ক হার ক্রেতা ও সরবরাহকারী উভয়ের জন্যই স্বস্তিদায়ক। এটি বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধার করেছে।”
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “ক্রেতারা এখন ছুটিতে থাকায় অর্ডার সংক্রান্ত আলোচনা কিছুটা ধীরগতির। আগস্টের ৭ তারিখ থেকে নতুন শুল্ক কার্যকর হবে। ফলে খুচরা দামে প্রভাব কেমন পড়বে তা নিয়েই এখন হিসাব চলছে।”
আরডিএম গ্রুপের চেয়ারম্যান রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, “৩০ জুলাইয়ের পর যেসব অর্ডার স্থগিত হয়েছিল, সেগুলোর উৎপাদন আবার শুরু হয়েছে। সোমবারের মধ্যে আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ আশা করছি।”
তবে তিনি ৪০ শতাংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজনের শর্ত নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও বলেন, “এই শর্ত যদি কার্যকর হয়, তাহলে কিছু কারখানা সমস্যায় পড়বে। সব পণ্যের ক্ষেত্রে এতটা মূল্য সংযোজন সম্ভব নয়।”
তিনি বলেন, “ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক গড়তে হবে। বাইং হাউসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেরা মার্চেন্ডাইজিং দক্ষতা বাড়াতে হবে।”
স্নোটেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম খালেদ বলেন, “একটি বড় মার্কিন ক্রেতার অর্ডার স্থগিত ছিল। এখন আশা করছি আগামী সপ্তাহেই সেটির আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাব। আগের মত অর্ডার অন্য দেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কা এখন অনেকটাই কেটে গেছে।”
তিনি আরও বলেন, “মূল প্রশ্ন হলো, তারা কতটা অর্ডার দেবে। কারণ দাম বাড়বে, আর তাতে খুচরা পর্যায়ে চাহিদা কমার সম্ভাবনা আছে।”
এদিকে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “বাংলাদেশ এখন যুক্তরাষ্ট্রে ২০ শতাংশ শুল্কে রপ্তানি করছে, যেখানে ভিয়েতনামেও একই হার এবং ভারতের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ। এতে করে প্রতিযোগিতায় আমরা তুলনামূলক ভালো অবস্থানে আছি।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে কোনো সময় ভারতের শুল্ক পরিবর্তন করতে পারেন বা ভিয়েতনামের সুবিধা বাতিল করতে পারেন। ফলে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।”
তিনি বলেন, “চীনের রপ্তানি কমছে এবং চীনা কাঁচামালের ওপর ভিয়েতনামের নির্ভরতা বেশি। ফলে যারা চীনের বিকল্প খুঁজছে, তাদের কাছে বাংলাদেশ ভালো বিকল্প হতে পারে। চীনা উৎস থেকে আসা পণ্যে সম্মিলিত শুল্ক ৬৪ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে।”
বিটি/ আরকে
Tags: পোশাক রপ্তানি, যুক্তরাষ্ট্র, রপ্তানিকারক, শুল্ক