আবুধাবিতে এমন অনেক কিছুই আছে যা একজন সার্ফার তার নিখুঁত ঢেউয়ের সন্ধানে খুঁজে বেড়ায়: উষ্ণ আবহাওয়া, সারা বছর রোদ এবং স্বচ্ছ পানি। শুধু একটি জিনিসের অভাব ছিল, আর তা হলো ঢেউ।
২০২৪ সালের অক্টোবরে ‘সার্ফ আবুধাবি’ খোলার পর সেই অভাব পূরণ হয়। বিশ্বের দীর্ঘতম কৃত্রিম ঢেউয়ের পুল খুলে কোম্পানিটি আবুধাবিকে একটি বৈশ্বিক সার্ফিং গন্তব্যে পরিণত করার আশা করছে।
এই ঢেউ পুলটি ৬৯০ মিটার (৭৫৫ গজ) লম্বা, আর এখানে একটি ঢেউয়ে এক মিনিট পর্যন্ত সার্ফ করা যায়। অন্যান্য সব ঢেউ পুল যেখানে স্বাদু পানি ব্যবহার করে, সেখানে সার্ফ আবুধাবি ৮০ মিলিয়ন লিটার লোনা পানি ব্যবহার করে, যা আরব উপসাগর থেকে পাম্প করে আনা হয়। এখানকার পানি স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি লবণাক্ত হওয়ায় এটিকে হালকা লবণমুক্ত করা হয়।
ঢেউ তৈরি হয় পুলের নিচে থাকা একটি পাখার মাধ্যমে, যা পুলির সাহায্যে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। এই পাখা পানিকে নাড়িয়ে দেয় এবং পুলের নিচে থাকা বিশেষভাবে তৈরি কাঠামো, যা বাথিমেট্রি নামে পরিচিত, ঢেউগুলোকে ভাঙতে সাহায্য করে। সার্ফ আবুধাবির জেনারেল ম্যানেজার রায়ান ওয়াটকিনস জানান, এই পুলের বাথিমেট্রি, যা সব জাদুর উৎস, তার পেটেন্ট করা আছে।
এই প্রযুক্তিটি এসেছে কেলি স্লেটারের মস্তিষ্ক থেকে, যিনি ইতিহাসের সবচেয়ে সফল পেশাদার সার্ফার। যখন অন্য পেশাদার সার্ফারদের নিজস্ব ব্র্যান্ডের পোশাক থাকে, তখন স্লেটারের আছে তার নিজস্ব ঢেউ। নিখুঁত ঢেউ তৈরির জন্য তিনি সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্লুইড মেকানিকস বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম ফিঞ্চামের সঙ্গে কাজ করেন। এক সাক্ষাৎকারে ইউএসসি-র এক অধ্যাপক এই প্রকল্পটিকে “গাণিতিকভাবে ভয়ানক” বলে মন্তব্য করেন।
২০১৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সার্ফ র্যাঞ্চে প্রথম এই প্রযুক্তি উন্মোচন করা হয়। এরপর ২০১৮ সালে পেশাদার সার্ফিং প্রতিযোগিতা ওয়ার্ল্ড সার্ফ লীগ (ডব্লিউএসএল) তাদের একটি ইভেন্ট সার্ফ র্যাঞ্চ পুলে আয়োজন করে। এরপর ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আবু ধাবির এই পুলেও তারা একটি ইভেন্ট করে। ২০১৬ সালে, ওয়ার্ল্ড সার্ফ লীগের মূল সংস্থা ডব্লিউএসএল হোল্ডিংস কেলি স্লেটার ওয়েভ কোম্পানিকে কিনে নেয়, যারা এই প্রযুক্তির মালিক।
নিখুঁত ঢেউয়ের খোঁজে
সার্ফারদের মনে নিখুঁত ঢেউয়ের ধারণাটি দৃঢ় হয় “দ্য এন্ডলেস সামার” নামক একটি তথ্যচিত্রের মাধ্যমে। ১৯৬৬ সালের এই তথ্যচিত্রে দুই ক্যালিফোর্নিয়ান সার্ফার নিখুঁত ঢেউয়ের খোঁজে বিশ্বভ্রমণে বের হন। গ্রীষ্মকে অনুসরণ করতে করতে তারা শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ সেন্ট ফ্রান্সিসে তাদের কাঙ্ক্ষিত ঢেউ খুঁজে পান।
এই ছবিটি সার্ফারদের জন্য সম্মোহক — বালির ওপর দিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাওয়া ঢেউয়ের পর ঢেউ, যেন কোনো মেশিনে তৈরি করা হয়েছে। ছবির বর্ণনাকারী বলেন, “এই ঢেউগুলো দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনো এক ধরনের যন্ত্র দিয়ে বানানো হয়েছে।”
কিন্তু কেপ সেন্ট ফ্রান্সিসের এই ঢেউগুলো এখন আর আগের মতো নেই। সেখানকার বিভিন্ন নির্মাণকা বালির চলাচল আটকে দিয়েছে, যা একসময় ঢেউয়ের আকার তৈরি করতো। তাই কেপ সেন্ট ফ্রান্সিস আর কখনও তার সেই নিখুঁত অবস্থা ফিরে পাবে না।
তবে সার্ফ আবু ধাবির ঢেউ সবসময় একই রকম থাকে। ওয়াটকিনস মার্কিন ক্যাবল চ্যানেল সিএনএনকে বলেন, “আমরা পরিমাণের চেয়ে গুণগত মানকে অগ্রাধিকার দিয়েছি। আমরা বিশ্বের সেরা ঢেউ তৈরি করি, সবচেয়ে বেশি ঢেউ নয়।”
তাদের ৮০ শতাংশেরও বেশি গ্রাহক আন্তর্জাতিক পর্যটক, যারা এই ঢেউয়ের টানে এখানে আসেন। সার্ফ আবু ধাবি মূলত বিলাসবহুল পর্যটন বাজারকে লক্ষ্য করে কাজ করছে।
তারা মূল পুলের মধ্যবর্তী এবং উন্নত সার্ফারদের জন্য একসাথে মাত্র চারজনকে সার্ফ করার অনুমতি দেয়। প্রত্যেকের জন্য ভাড়া প্রায় ৯৫৬ ডলার। প্রতিটি সার্ফার ছয়টি ঢেউ উপভোগের নিশ্চয়তা পায়, যদিও অন্য কেউ পড়ে গেলে তারা আরও বেশি ঢেউ পেতে পারে। তবে ওয়াটকিনস বলেন, বেশিরভাগ মানুষ ব্যক্তিগতভাবে পুল ভাড়া নিতে পছন্দ করে, যার জন্য ৯০ মিনিটের খরচ প্রায় ৫,৪৫০ ডলার।
ওয়াটকিনসের মতে, এই উচ্চ মূল্য যথার্থ ও যোক্তিক। তিনি বলেন, “আমাদের ঢেউ একটি থেকে অন্যটির দূরত্বে যেতে ৫৫ সেকেন্ড সময় নেয়, আর আপনি দুটি নিখুঁত টিউব পাবেন (ভেঙে যাওয়া ঢেউয়ের ভেতরে সার্ফ করা)।” গ্রাহকরা পানিতে কোচিং এবং পরে তার ভিডিও পর্যালোচনাও করতে পারেন।
২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী সার্ফ পর্যটন শিল্পের আয় ছিল ৬৮.৩ বিলিয়ন ডলার, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৯৫.৯৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সার্ফ আবু ধাবি বিশ্বাস করে, তাদের পুল এই বিলাসবহুল বাজারের একটি বড় অংশ দখল করতে পারে। কিন্তু তার জন্য তাদের গ্রাহকদের বোঝাতে হবে যে, পুলে সার্ফ করা সাগরে সার্ফ করার চেয়েও ভালো।
বিকল্প, কিন্তু প্রতিস্থাপন নয়
যখন ফেলিপ বোনলা ডাল পিয়েরো তার বিলাসবহুল সার্ফ ভ্রমণ ব্যবসা ‘মাহালো সার্ফ এক্সপেরিয়েন্স’ শুরু করেন, তখন তিনি বলেন, কেউ এই ধারণাটি বুঝতে পারছিল না। সবাই তাকে বলছিল, “সার্ফাররা তো সাধারণত গরিব হয়।” কিন্তু এখন ডাল পিয়েরো তার জীবন কাটান সিইও এবং বিলিয়নেয়ারদের বিশ্বের গোপন কোণগুলোতে নিয়ে গিয়ে ফাঁকা ঢেউয়ের সন্ধানে। তার কাছে আবহাওয়াবিদদের একটি দল আছে যারা ঝড় ট্র্যাক করে, আর যখন পরিস্থিতি পুরোপুরি মিলে যায়, তখন তিনি তার গ্রাহকদের একজনকে হঠাৎ করে অভিযানের জন্য ফোন করেন।
এমন একটি চার দিনের ভ্রমণের খরচ প্রায় ১,৫০,০০০ ডলার থেকে শুরু হয়। ডাল পিয়েরো বলেন, এই দাম এত বেশি কারণ “ব্যর্থতার কোনো সুযোগ নেই।” তার গ্রাহকরা খারাপ ঢেউ, অস্বস্তিকর থাকার জায়গা বা অন্য সার্ফারদের কারণে তাদের অফিস থেকে বের হতে চান না। তিনি সিএনএনকে বলেন, “এটা সত্যিই জেমস বন্ডের একটি অপারেশনের মতো,” যেখানে তার গ্রাহকদের সেরা ঢেউগুলোর কাছে পৌঁছানোর জন্য স্পিডবোট এবং সীপ্লেন ব্যবহার করা হয়।
ডাল পিয়েরোর গ্রাহকরা ক্রমশ ঢেউ পুলে সার্ফিং শিখছে। পুলের এই নিয়ন্ত্রণ এবং পূর্বাভাসযোগ্যতা সময়-সংকটে থাকা পেশাদারদের জন্য একটি আকর্ষণীয় বিকল্প, যারা ঢেউয়ের পেছনে ছুটতে চান না। ব্রাজিলের সাও পাওলোতে তেমনই এক এক্সক্লুসিভ সার্ফ ক্লাব তৈরি হয়েছে, যার একটি ফ্যামিলি মেম্বারশিপের খরচ ব্রাজিলিয়া মুদ্রায় ৯,৫০,০০০ (প্রায় ১,৭৪,০০০ ডলার)।
এর ফলে গ্রাহকদের প্রত্যাশাও বদলে যাচ্ছে। তাদের দক্ষতা পুলে অনুশীলন করে আরও তীক্ষ্ণ হয়েছে, যা মহাসাগরের প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল পরিবেশে হয় না। ডাল পিয়েরো বলেন, “মহাসাগর এই মানুষদের অনেককেই বিনয়ী করে তোলে, কারণ পুলে সবকিছুই বেশ নিয়ন্ত্রিত।” তার কিছু গ্রাহককে ধাক্কা দিয়ে ঢেউয়ের মধ্যে নামাতে হয়, কারণ তাদের মধ্যে সমুদ্রে সার্ফিং করার জন্য প্রয়োজনীয় প্যাডেল ফিটনেসের অভাব থাকে।
তিনি বলেন, তার গ্রাহকরা ঢেউ পুল ব্যবহার করেন কারণ এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সহজলভ্য। তিনি এমনকি তার গ্রাহকদের ঢেউ পুলেও নিয়ে যান; একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে নির্দিষ্ট দক্ষতা নিয়ে কাজ করা সহজ। মালদ্বীপ বা ইন্দোনেশিয়ায় যাওয়ার পথে তিনি প্রায়শই সার্ফ আবু ধাবিতে যাত্রাবিরতি করেন এবং ঢেউ পুলকে ওয়ার্ম-আপ হিসেবে ব্যবহার করেন।
ডাল পিয়েরো মনে করেন, ঢেউ পুলের একটি নিজস্ব জায়গা থাকলেও, এটি কোনো বিকল্প হতে পারে না। “একটি ঢেউয়ের ওপর দাঁড়িয়ে ১০০ মিটার যাওয়াটা সার্ফিং নয়।” তার গ্রাহকরা তার কাছে আসে কারণ তারা “প্রকৃতির সঙ্গে, সাগরের ছন্দের সঙ্গে সংযোগ” চায় এবং তারা নিয়ন্ত্রণহীনতা অনুভব করতে চায়।
তিনি বলেন, “আপনি যদি একজন বিলিয়নেয়ার, একজন সিইও হন, তাহলে আপনার জীবনের সবকিছুই পরিকল্পিত এবং নির্ধারিত। কিন্তু একবার যখন আপনি সাগরে ঝাঁপ দেন, তখন সব পরিকল্পনা ভেঙে যায়। আপনি জানেন না যে পরবর্তী ঢেউটি আপনার জীবনের সেরা ঢেউ হবে নাকি সবচেয়ে খারাপ ঢেউ হবে।”
কিন্তু ওয়াটকিনসের মতে, এই নিয়ন্ত্রণহীনতাই অনেককে খেলাটি থেকে দূরে রাখে। পুলে সার্ফিং খেলাটিকে আরও সহজলভ্য করে তোলে। তিনি বলেন, “আমাদের কাছে সবচেয়ে বয়স্ক যে সার্ফার এসেছেন তার বয়স ৮৬ বছর।” পুলের নিরাপত্তা এবং এক্সক্লুসিভিটি সিইও এবং তারকাদের জন্য একটি আকর্ষণীয় বিকল্প, যারা সাগরে অন্য সার্ফারদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করতে চান না। ক্রিস হেমসওয়ার্থ, স্টিভ আওকি এবং লুইস হ্যামিল্টন সার্ফ আবু ধাবির নিয়মিত গ্রাহক, আর প্রিন্স হ্যারি এবং ইভাঙ্কা ট্রাম্পকে ক্যালিফোর্নিয়ার সার্ফ র্যাঞ্চে দেখা গেছে।
ওয়াটকিনস বলেন, “গলফ কোর্সের দিক থেকে, আমরা হব অগাস্টা।” অগাস্টা ন্যাশনাল গলফ ক্লাব একটি বিখ্যাত এক্সক্লুসিভ কোর্স, যেখানে একবারে প্রায় ৩০০ সদস্য থাকে। নিউ ইয়র্কার ম্যাগাজিন জানায়, এই পরিমার্জিত স্থানে লুকানো স্পিকার থেকে পাখির ডাক বাজানো হয়, এমনকি পাইন স্ট্রও আমদানি করা হয়।
এই তুলনাটি উপযুক্ত; কয়েক দশক আগে, আবু ধাবি সার্ফ যাদের লক্ষ্য করছে সেইসব এক্সিকিউটিভ এবং পেশাদাররা গলফ খেলতেন। এখন “সবাই সার্ফার হতে চায়,” ওয়াটকিনস বলেন। কিন্তু এই সার্ফাররা শুধু যেকোনো সার্ফ চায় না। তারা চায় নিখুঁত ঢেউ।
ফুটবলের মতো মূলধারার খেলা
স্লেটার সার্ফ র্যাঞ্চ খোলার অনেক আগে থেকেই ঢেউ পুলের স্বপ্ন দেখছিলেন। ২০০৩ সালের তার আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছিলেন যে, “সার্ফাররা চূড়ান্ত ঢেউ তৈরির যন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছে। নিখুঁত ব্যবস্থাটি আমেরিকায় প্রতিটি শহরে সার্ফিং পৌঁছে দেবে এবং খেলাটিকে ফুটবলের মতো মূলধারার খেলায় পরিণত করবে।”
তবে, বর্তমানে স্লেটারের প্রযুক্তিতে মাত্র দুটি পুল চালু আছে, ক্যালিফোর্নিয়ার সার্ফ র্যাঞ্চ এবং সার্ফ আবু ধাবি। তৃতীয়টি টেক্সাসের অস্টিনে নির্মাণাধীন। সার্ফ আবু ধাবি পুলটি নির্মাণের খরচ নিশ্চিত করতে অস্বীকার করেছে, তবে ব্লুমবার্গ ৯০ মিলিয়ন ডলারের কথা জানিয়েছিল।
স্লেটারের সিস্টেমটি একমাত্র উপলব্ধ সিস্টেম নয়। ২০২৪ সালে, বিশ্বজুড়ে ৩৬টি ঢেউ পুল চালু ছিল এবং আরও ৭৬টি নির্মাণাধীন রয়েছে। এই পুলগুলোর বেশিরভাগই ভিন্ন ভিন্ন সিস্টেম ব্যবহার করে, যার জন্য ছোট পুলের প্রয়োজন হয়, যা সস্তা, তবে ছোট ঢেউ তৈরি করে। যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টলে অবস্থিত দ্য ওয়েভ-এ এক ঘণ্টা সার্ফিংয়ের খরচ ৭৫ ডলার।
প্রত্যেকের কাছে নিখুঁত ঢেউয়ের ধারণা ভিন্ন। ওয়াটকিনস ব্যাখ্যা করেন, একজন শিক্ষানবিশ সার্ফারের জন্য এটি তিন সেকেন্ডের জন্য ঢেউয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা হতে পারে, যেখানে একজন পেশাদারের জন্য ৩০ সেকেন্ডের ঢেউ প্রয়োজন। “এটি এতটাই বিষয়ভিত্তিক।”
তা সত্ত্বেও, সব সার্ফারই নিখুঁত ঢেউয়ের আদর্শের পেছনে ছোটে। তাহলে সার্ফ আবু ধাবি কি সেটি তৈরি করতে পেরেছে? ওয়াটকিনস বলেন, “আমরা সেটির একটি সংস্করণ তৈরি করেছি।”
সূত্র: সিএনএন