আমরা সাধারণত মনে করি ঘুমের প্রক্রিয়াটি কেবল আমাদের মস্তিষ্কে ঘটে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, শরীর পুনর্গঠনকারী গভীর বা ‘রিস্টোরেটিভ’ ঘুমের শুরুটা হয় শরীরের অনেক নিচে—আমাদের অন্ত্রে।
আমাদের পরিপাকতন্ত্রে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন অণুজীব বাস করে, যাকে বলা হয় ‘গাট মাইক্রোবায়োম’। আমাদের ঘুমের মান, মেজাজ এবং সামগ্রিক সুস্থতা নিয়ন্ত্রণে এটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। অন্ত্রের এই অণুজীবের ভারসাম্য ঠিক থাকলে ঘুম ভালো হয়; আর এই ভারসাম্য বিঘ্নিত হলে অনিদ্রা ও অস্থিরতার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
অন্ত্র ও মস্তিষ্কের নিবিড় যোগাযোগ অন্ত্র এবং মস্তিষ্ক একে অপরের সাথে ক্রমাগত যোগাযোগ রক্ষা করে চলে, যাকে বলা হয় ‘গাট-ব্রেইন অ্যাক্সিস’। স্নায়ু, হরমোন এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সংকেতের মাধ্যমে এই যোগাযোগ ঘটে। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে পরিচিত অংশ হলো ‘ভেগাস নার্ভ’, যা অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে তথ্যের দ্বিমুখী আদান-প্রদান নিশ্চিত করে। গবেষকরা বলছেন, এই স্নায়ুর সক্রিয়তা আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত রাখতে এবং হৃদস্পন্দন স্থিতিশীল রেখে আমাদের ঘুমের দিকে ধাবিত করতে সাহায্য করে।
রাসায়নিক সংকেত ও ঘুমের হরমোন অন্ত্রের অণুজীবগুলো কেবল খাদ্য হজমই করে না, তারা এমন কিছু নিউরোট্রান্সমিটার এবং মেটাবোলাইটস তৈরি করে যা ঘুমের হরমোনকে প্রভাবিত করে। যখন অন্ত্রের ভারসাম্য ঠিক থাকে, তখন এই পদার্থগুলো মস্তিষ্ককে শান্ত থাকার সংকেত পাঠায়। কিন্তু যখন অন্ত্রে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার আধিপত্য বেড়ে যায় (যাকে বলা হয় ‘ডিসবায়োসিস’), তখন এই বার্তা আদান-প্রদান ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়ে।
অন্ত্রে ঘুমের জন্য প্রয়োজনীয় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক তৈরি হয়:
সেরোটোনিন: এটি আমাদের মন ভালো রাখে এবং ঘুম-জাগরণের চক্র নিয়ন্ত্রণ করে। শরীরের অধিকাংশ সেরোটোনিন অন্ত্রেই তৈরি হয়।
মেলাটোনিন: রাতে আমাদের ঘুম ঘুম ভাব আনার জন্য দায়ী এই হরমোনটি কেবল মস্তিষ্কে নয়, বরং অন্ত্রেও তৈরি হয়।
গ্যাবা : এটি একটি শান্তকারক নিউরোট্রান্সমিটার যা নির্দিষ্ট কিছু উপকারী অণুজীব তৈরি করে। এটি স্নায়ুতন্ত্রকে শিথিল হওয়ার সংকেত দেয়।
প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন এবং ঘুমের ব্যাঘাত একটি সুস্থ অন্ত্র শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখে। কিন্তু খাদ্যাভ্যাস খারাপ হলে বা অন্ত্রের আস্তরণ ক্ষতিগ্রস্ত হলে (যাকে ‘লিকি গাট’ বলা হয়), ক্ষতিকর কণা রক্তে মিশে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন তৈরি করতে পারে। এই প্রদাহ মস্তিষ্কের ঘুমের স্বাভাবিক ধাপগুলো সম্পন্ন করার ক্ষমতায় বাধা দেয়। এছাড়া প্রদাহের ফলে স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসল’ বেড়ে যায়, যা শরীরকে বিশ্রামের বদলে কাজ করার জন্য উত্তেজিত করে তোলে।
মানসিক চাপ ও অন্ত্রের দুষ্টচক্র মানসিক চাপ, ঘুম এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্য একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। মানসিক চাপ উপকারী অণুজীব কমিয়ে দেয়, যা অন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করে। আবার অসুস্থ অন্ত্র মস্তিষ্ককে উদ্বেগের সংকেত পাঠায়, যা ঘুম নষ্ট করে। অপর্যাপ্ত ঘুম কর্টিসল হরমোন আরও বাড়িয়ে দেয়, যা পুনরায় অন্ত্রের ক্ষতি করে। এভাবেই একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়।
অন্ত্রের সুরক্ষায় করণীয় অন্ত্রকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে ঘুমের মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করা সম্ভব। এর জন্য খুব জটিল কিছু করার প্রয়োজন নেই:
১. প্রোবায়োটিক ও ফারমেন্টেড খাবার: দই বা এজাতীয় গেঁজানো খাবার উপকারী ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
২. চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার বর্জন: অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার অন্ত্রে প্রদাহ তৈরি করে, তাই এগুলো এড়িয়ে চলাই ভালো।
৩. খাবারের নির্দিষ্ট সময়: পরিপাকতন্ত্রের নিজস্ব একটি ঘড়ি আছে, তাই প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খেলে অন্ত্র সুস্থ থাকে।
৪. পর্যাপ্ত জল পান: সঠিক হাইড্রেশন হজম ও পুষ্টি পরিবহনে সাহায্য করে এবং অন্ত্রের সুরক্ষাকবচ বজায় রাখে।
ভালো ঘুমের প্রস্তুতি আপনি বিছানায় যাওয়ার মুহূর্তে শুরু হয় না। এটি শুরু হয় তার অনেক আগে, আপনার অন্ত্রের সুস্বাস্থ্যের মাধ্যমে। অন্ত্র যখন সুস্থ থাকে, তখন শরীর প্রাকৃতিকভাবেই নিজেকে শান্ত করতে এবং গভীর ঘুমের ছন্দে ফিরে যেতে সক্ষম হয়।
দ্য কনভারসেশনে, ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টমিনিস্টারের মেডিকেল মাইক্রোবায়োলজির সিনিয়র লেকচারার মানাল মোহাম্মদের লেখা থেকে।
Tags: ঘুম, পাকস্থলী, বিজ্ঞান, রহস্য