নিজস্ব প্রতিবেদক
ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (এনবিএফআই) ঋণের মানের অবনতি অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের জুন শেষে এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩৫ শতাংশই এখন খেলাপি। শুধু এপ্রিল থেকে জুন, এই তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৫৬২ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট ঋণ ও অগ্রিমের স্থিতি প্রায় ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৭ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা। ফলে মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭২ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে।
এর আগে মার্চ শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৬ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৫৬২ কোটি টাকা।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ আদায়ে দুর্বলতা, বড় গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধে অনীহা এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের ঋণ বিতরণে অনিয়মের কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। বিশেষ করে দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের হার অনেক বেশি হওয়ায় পুরো খাতের গড় খেলাপি ঋণের হারও বেড়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, কয়েক বছর ধরেই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে খাতটির খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় ২৫ হাজার ৮৯ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের মার্চে তা বেড়ে ২৭ হাজার ১৮৯ কোটি টাকায় ওঠে। এরপর জুন শেষে তা দাঁড়ায় ২৭ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা।
অর্থাৎ দেড় বছরেরও কম সময়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। এর ফলে ঋণের বিপরীতে আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি প্রভিশন সংরক্ষণেও চাপ তৈরি হচ্ছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর।
শিল্প খাতেই ঋণের বড় অংশ
আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণের বড় অংশই শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে রয়েছে। জুন শেষে শিল্প খাতে এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৪৪ শতাংশ।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে ঋণের বড় অংশ থাকায় অর্থনীতিতে মন্দাভাব, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট খাতে সংকট তৈরি হলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ আদায়ে তার প্রভাব পড়ে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অতীতে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ বিতরণের অভিযোগ।
দুর্বল প্রতিষ্ঠানেই খেলাপি বেশি
বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়নে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় অংশ বর্তমানে আর্থিকভাবে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হারও তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সমস্যাগ্রস্ত ২০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণের বড় অংশই খেলাপি। বিপরীতে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের হার অনেক কম। ফলে কয়েকটি দুর্বল প্রতিষ্ঠানের উচ্চ খেলাপি ঋণ পুরো এনবিএফআই খাতের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেলাপি ঋণ কমাতে শুধু পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের সুযোগ দিলেই হবে না। প্রকৃত খেলাপি ঋণ আদায়, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, জামানত ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং ঋণ বিতরণের সময় গ্রাহকের প্রকৃত সক্ষমতা যাচাই নিশ্চিত করতে হবে।
এন/আই
Tags: এনবিএফআই, খেলাপি, ব্যাংক