সোমবার ইজরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা “ইরান থেকে উৎক্ষেপণ করা ক্ষেপণাস্ত্রের” জবাব দিচ্ছে। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের রপ্তানি কেন্দ্র ‘খারাগ দ্বীপ’ দখলের কথা বলছেন।
সামরিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “অল্পক্ষণ আগে আইডিএফ ইজরায়েল রাষ্ট্রের ভূখণ্ডের দিকে ইরান থেকে উৎক্ষেপিত ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করেছে।” এতে আরও বলা হয় যে, “প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো হুমকি মোকাবিলায় কাজ করছে” এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত জনগণকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
গত রবিবার প্রকাশিত ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তিনি “ইরানের তেল দখল” করতে চান এবং খারাগ দ্বীপের রপ্তানি কেন্দ্রটি কবজা করতে পারেন। এরই মধ্যে ওই অঞ্চলে প্রায় ২,৫০০ মার্কিন মেরিন সেনা পৌঁছেছে।
ইরানের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত খারাগ দ্বীপ দেশটির একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল টার্মিনাল। পেন্টাগন সেখানে স্থল অভিযানের পরিকল্পনা করছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র জোর দিয়ে বলেছে যে তারা পূর্ণমাত্রার আক্রমণ থেকে বিরত থাকবে।
দ্বীপে ইরানি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে ট্রাম্প বলেন, “আমি মনে করি না তাদের কোনো প্রতিরক্ষা আছে। আমরা খুব সহজেই এটি দখল করতে পারি।”
ইরানের তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশই এই দ্বীপ দিয়ে পরিচালিত হয়। এটি দখল করলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জ্বালানি বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারবে, যা তেহরানের অর্থনীতির ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করবে।
ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান “প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে” বৈঠক করছে এবং ইরানের নতুন নেতারা “বেশ যুক্তিবাদী”। তবে ওই অঞ্চলে আরও মার্কিন সেনা পৌঁছানোয় তেহরান সতর্ক করে দিয়েছে যে তারা কোনো অবমাননা মেনে নেবে না।
গত মাসে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। রবিবার পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, তারা আগামী দিনে “অর্থবহ আলোচনার” আয়োজন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর পরপরই ট্রাম্পের এই মন্তব্যগুলো সামনে আসে।
রবিবার সন্ধ্যায় এয়ার ফোর ওয়ান বিমানে ওয়াশিংটন যাওয়ার পথে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “আমি মনে করি আমরা তাদের সাথে একটি চুক্তিতে পৌঁছাব, আমি মোটামুটি নিশ্চিত। তবে এটাও সম্ভব যে আমরা সফল হব না।”
ট্রাম্প দাবি করেন যে, হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা এবং অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিহতের পর তেহরানে ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন’ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তবে তিনি দুবার উল্লেখ করেন যে, তাদের উত্তরসূরিদের “যুক্তিবাদী” মনে হচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইজরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন, যার স্থলাভিষিক্ত হন তার ছেলে মোজতবা।
এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটাচ্ছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে আঘাত হানার পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার বলেছেন, রবিবার আঞ্চলিক পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার উপায় এবং ইসলামাবাদে সম্ভাব্য মার্কিন-ইরান আলোচনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, “চলমান সংঘাতের একটি ব্যাপক ও স্থায়ী সমাধানের জন্য আগামী দিনগুলোতে উভয় পক্ষের মধ্যে অর্থবহ আলোচনার আয়োজন ও সুবিধা প্রদান করতে পেরে পাকিস্তান সম্মানিত বোধ করবে।” তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এতে যোগ দিতে সম্মত হয়েছে কি না তা স্পষ্ট নয়।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবাফ এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন যে, তারা আলোচনার বার্তা পাঠানোর পাশাপাশি স্থল অভিযানের পরিকল্পনা করছে। তিনি বলেন, মার্কিন সৈন্য মোতায়েন করা হলে তেহরান জবাব দিতে প্রস্তুত। জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, “যতক্ষণ আমেরিকানরা ইরানের আত্মসমর্পণ চাইবে, আমাদের উত্তর হলো আমরা কখনোই অপমান মেনে নেব না।”
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার সৈন্য পাঠিয়েছে, যা ট্রাম্পকে স্থল অভিযান শুরু করার সুযোগ করে দিয়েছে।
একজন ইজরায়েলি কর্মকর্তা বলেছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনার আগে ইরানের ওপর হামলা কমানোর কোনো পরিকল্পনা নেই। ইজরায়েল সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে হামলা চালিয়ে যাবে।
ইজরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় তারা তেহরানসহ মধ্য ও পশ্চিম ইরানে ১৪০টিরও বেশি বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং মজুদাগারসহ অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হয়েছে। ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, মেহরাবাদ বিমানবন্দর এবং উত্তরের শহর তাবরিজের একটি পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্টে হামলা হয়েছে।
ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার সময় দক্ষিণ ইজরায়েলের বিয়ারশেবা শহরের কাছে একটি রাসায়নিক প্ল্যান্টে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ আঘাত হানে। ফলে কর্তৃপক্ষ জনসাধারণকে “বিপজ্জনক রাসায়নিক” থেকে দূরে থাকার সতর্কবার্তা দিয়েছে।
বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস বহনকারী হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কার্যকর অবরোধ তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
সোমবার এশিয়ার শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে। বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘস্থায়ী উপসাগরীয় যুদ্ধের আশঙ্কা করছেন, যার ফলে তেলের দাম রেকর্ড মাসিক বৃদ্ধির দিকে যাচ্ছে এবং বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি ও মন্দার ঝুঁকি বাড়ছে। জাপানের নিক্কেই সূচক ৪.৭ শতাংশ কমেছে।
এদিকে তেলের দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার ৩.০৯ ডলার বা ২.৭৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১৫.৬৬ ডলারে পৌঁছেছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, আরও কয়েকশ স্পেশাল অপারেশন কর্মী এই অঞ্চলে পৌঁছেছেন। এর আগে শুক্রবার একটি উভচর আক্রমণকারী জাহাজে করে হাজার হাজার মার্কিন মেরিন সেনা সেখানে পৌঁছায়।
রয়টার্স জানিয়েছে যে, পেন্টাগন স্থলবাহিনীসহ বিভিন্ন সামরিক বিকল্প বিবেচনা করছে, যদিও ট্রাম্প এখনও সেই পরিকল্পনাগুলো অনুমোদন করেননি।
অধিকাংশ আমেরিকান এই যুদ্ধের বিরোধী। এই সামরিক উত্তেজনা ট্রাম্পের জনসমর্থন আরও কমিয়ে দিতে পারে, যা নভেম্বরের কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তার জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শনিবার ইয়েমেনের ইরান-পন্থী হুথিরা এই যুদ্ধে যোগ দিয়ে ইজরায়েলে তাদের প্রথম হামলা চালায়। এতে বাব আল-মান্দেব প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষ রবিবার জানিয়েছে, তারা ইয়েমেন থেকে উৎক্ষেপণ করা দুটি ড্রোন প্রতিহত করেছে।
বিটি/ আরকে
Tags: আক্রমণ, ইরান যুদ্ধ, ইরানে মার্কিন হামলা, ইরানে হামলা, ইসরায়েল, ট্রাম্প, মধ্যপ্রাচ্য, স্থলযুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র, হুথি