চীনের শানসি প্রদেশের রাজধানী শিয়ান শহরটি প্রাচীনকালে ছাংআন নামে পরিচিত ছিল। রেশম পথ বা ঐতিহাসিক সিল্ক রোডের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে এই নগরীর মাধ্যমে মধ্য এশিয়া, পারস্য ও আরব বিশ্বের সঙ্গে প্রাচীন চীনের বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই ঐতিহাসিক ধারার নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে শিয়ানের বিখ্যাত গ্রেট মসজিদ বা হুয়াজুয়ে লেন মসজিদ, যার প্রতিষ্ঠার সূত্র ধরে প্রাচীন দুই সভ্যতার মেলবন্ধনের চিত্র ফুটে ওঠে। ১৩ শতাব্দীর ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন শিয়ানের বিখ্যাত গ্রেট মসজিদ বা হুয়াজুয়ে লেন মসজিদ। কিন্তু ঐতিহাসিক গবেষণায় এ বর্ণনার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মসজিদটির চীনা নাম হুয়াজুয়ে শিয়াং ছিংজেন দাসি।
তাং রাজবংশের সম্রাট শুয়ানজংয়ের রাজত্বকালে ৭৪২ খ্রিষ্টাব্দে এই মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত হয় বলে প্রচলিত ঐতিহ্য নির্দেশ করে। ২০২৬ সালের হিসাবে এই স্থাপনার বয়স দাঁড়িয়েছে প্রায় ১,২৮৪ বছর। তৎকালীন চীনা রাজপ্রাসাদ ও চিরাচরিত প্যাগোডা উদ্যানের আদলে নির্মিত এই মসজিদটি মধ্যপ্রাচ্যের গম্বুজ ও উঁচু মিনারের প্রথাগত স্থাপত্যের চেয়ে আলাদা। বিশাল উঁচু মিনারের বদলে এখানে চীনা প্যাগোডা শৈলীর মিনার এবং অলংকৃত কাঠের প্রাসাদতুল্য কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে। ২০২৬ সাল হিসাবে সেই প্রতিষ্ঠাকালের বয়স দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ২৮৪ বছর। বরং চীনের ঐতিহ্যবাহী প্রাসাদ, উদ্যান ও ধর্মীয় স্থাপনার স্থাপত্যরীতির সঙ্গে ইসলামের ধর্মীয় পরিচয়কে একীভূত করে গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ চীনের গুয়াংজু শহরে তার নামের সঙ্গে একটি মসজিদ ও সমাধিস্থানের ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। মসজিদটি পরবর্তী মিং ও ছিং রাজবংশের সময়ে একাধিকবার সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। স্থাপত্যের দিক থেকে মসজিদটি বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। প্রাচীন ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় স্থাপত্যের ধারাবাহিকতাও এতে প্রতিফলিত হয়েছে। তারা চীনা ভাষা, সামাজিক রীতিনীতি ও স্থানীয় স্থাপত্যের অনেক বৈশিষ্ট্য গ্রহণ করলেও ইসলামি ধর্মীয় পরিচয় ও অনুশীলন বজায় রেখেছেন।
তবে মসজিদে প্রবেশের পর অভ্যন্তরীণ বিন্যাস এবং মক্কার কিবলামুখী প্রার্থনাকক্ষ এটি নিশ্চিত করে যে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি উপাসনালয়। স্থাপনাটিতে আরবি ক্যালিগ্রাফি, কোরআনের আয়াত এবং স্থানীয় ফুল ও প্রকৃতির নকশার সুনিপুণ সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। যদিও বর্তমানে বিদ্যমান ভবনগুলো দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন যুগের পুনর্নির্মাণ ও সম্প্রসারণের ফল, তবে সামগ্রিক নকশায় তাং আমলের ঐতিহ্য ধরে রাখা হয়েছে। এই মসজিদটি ১৯৫৬ সাল থেকে সংরক্ষিত জাতীয় ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি পেয়ে আসছে। এর নামাজের স্থান পশ্চিম দিকে, অর্থাৎ মক্কার কিবলামুখী করে নির্মিত।
মসজিদের প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে আধুনিক ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছু গবেষণাগত মতামত রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের গবেষক লরেন্স ই. বাটলার তাঁর ‘মসজিদ অ্যান্ড ইসলামিক আইডেন্টিটিজ ইন চায়না’ নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, ৭৪২ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদটি প্রতিষ্ঠার যে লোকায়ত বা প্রচলিত ঐতিহ্য রয়েছে, বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক নথির মাধ্যমে তত প্রাচীন প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নিশ্চিত করা বেশ কঠিন। তবুও ১৩ শতকের পুরনো এই স্থানটিকে চীনা মুসলিম ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ধরা হয়।
চীনে ইসলামের আগমন ও প্রসারের ক্ষেত্রে ৬৫১ খ্রিষ্টাব্দ একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
তখন চীনা মূল ভূখণ্ডে তাং বংশের শাসন চলছিল এবং আরব উপদ্বীপে খলিফা হজরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর শাসনকাল বিদ্যমান ছিল। দক্ষিণ কোরিয়ার হানিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হি-সু লি ২০০২ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘দ্য স্প্রেড অব ইসলামিক কালচার টু ইস্ট এশিয়া বিফোর দ্য এরা অব মডার্ন ইউরোপিয়ান হেজিমনি’ শীর্ষক গবেষণাপত্রে প্রাচীন চীনা রাজকীয় নথির বরাত দিয়ে জানান, ৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম আরব প্রতিনিধিদল চীনে আনুষ্ঠানিকভাবে সফর করেছিল। ৬৫১ সালে আরব প্রতিনিধি দলের চীন সফরের প্রমাণ পাওয়া যায়।
তবে প্রথম কূটনৈতিক সফরের তথ্য নিশ্চিত হলেও ওই বছরই স্থায়ী মুসলিম বসতি গড়ে উঠেছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। প্রচলিত একটি বর্ণনায় বলা হয়, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুসারী সাহাবি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) চীনে আগমন করেছিলেন। তবে জেমস ডি ফ্রাঙ্কেলের বিশ্লেষণ এবং কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত ‘দ্য মুসলিম মার্চেন্টস অব প্রিমডার্ন চায়না’ গ্রন্থের গবেষণা অনুযায়ী, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর আগমনের ইতিহাস এবং ৬৫১ সালের রাজকীয় কূটনৈতিক সফর দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ঐতিহাসিক বিষয়।
চীনা মূল ভূখণ্ডে ইসলাম সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ছড়ায়নি; বরং বাণিজ্য, সীমান্ত অভিবাসন ও বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমেই স্থানীয় সমাজে মুসলিমদের বিকাশ ঘটেছে। প্রাচীন ভারত মহাসাগর ও সমুদ্রপথ অতিক্রম করে আরব ও পারস্যের বণিকেরা গুয়াংজু ও ছুয়ানচৌসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চীনা বন্দর নগরীতে স্থায়ী বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তীতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের বৈবাহিক ও সামাজিক সম্পর্ক তৈরি হয়, যা স্থায়ী মুসলিম সমাজ গড়ে তুলতে অবদান রাখে। অন্যদিকে মধ্য এশিয়া হয়ে স্থলপথের রেশমপথও ছিল মুসলিম বণিক, পর্যটক ও জ্ঞানচর্চাকারীদের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, জ্ঞানচর্চা, নৈতিক আচরণ, সামাজিক আস্থা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ও দীর্ঘমেয়াদে ধর্মীয় ও সভ্যতাগত পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেসের গবেষণাগ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, অষ্টম শতাব্দীতে তাং রাজবংশের সময় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও স্থানীয় অর্থনীতিতে মুসলিম বণিকরা সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। এর পাশাপাশি ৭৫১ খ্রিষ্টাব্দের ঐতিহাসিক তালাসের যুদ্ধ এবং ৭৫৫ থেকে ৭৫৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত চলা আন লুশান বিদ্রোহের সাময়িক প্রেক্ষাপটও চীনের সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের কৌশলগত সম্পর্ক উন্নয়নে প্রভাব ফেলেছিল। তবে এসব রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে জনবসতির সরাসরি যোগাযোগ কতটুকু ছিল, তা নিয়ে বিভিন্ন ইতিহাসবিদ ভিন্নমত পোষণ করেন।
শিয়ানের প্রায় ১৩ শতকের পুরনো এই মসজিদটি মধ্য প্রাচ্য ও চীনা সংস্কৃতির পারস্পরিক অভিযোজনের স্পষ্ট স্মারক। এই অঞ্চলের প্রধান মুসলিম জনগোষ্ঠী ‘হুই’ সম্প্রদায়ের মানুষ চীনা ভাষাকে নিজেদের মাতৃভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং স্থানীয় পোশাক ও খাদ্যাভ্যাস আপন করে নিয়েছে, কিন্তু নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও ক্যালিগ্রাফির ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রেখেছে। মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের গবেষণায়ও তুলে ধরা হয়েছে কীভাবে চীনা মসজিদগুলো ইসলামি সত্তা বজায় রেখেই স্থানীয় শিল্পের প্রকাশ ঘটিয়েছে। ফলে স্থাপনাটি একই সঙ্গে চীনা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ইসলামি পরিচয়ের প্রতিনিধিত্ব করছে।
বর্তমান চীনে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের প্রধান দুটি রূপ দেখা যায় হুই এবং উইঘুর জনগোষ্ঠীর মধ্যে। এ ছাড়া কাজাখ, কিরগিজ, তাজিক, তাতার, সালার ও দংজিয়াংসহ একাধিক ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ইসলাম অনুসারী। তবে এদের মধ্যে উইঘুর সম্প্রদায় প্রধানত শিনজিয়াং অঞ্চলে বসবাস করে এবং তাদের সংস্কৃতি ও ভাষার ভিত্তি মধ্য এশীয় তুর্কি ধারার সাথে সম্পর্কিত, যেখানে হুই সম্প্রদায়ের মানুষ মূলত চীনা ভাষাভাষী ও দেশের অন্যান্য অংশে ছড়ানো। তাদের অনেকে ব্যবসার প্রয়োজনে চীনে অবস্থান শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।
বাণিজ্যিক লেনদেন, মানবীয় আচরণ এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির শ্রদ্ধাশীল সহাবস্থান কীভাবে সামরিক বলপ্রয়োগ ছাড়াই সুদূর অঞ্চলে ধর্মীয় পরিচয় বিস্তার করতে পারে, শিয়ানের বিখ্যাত এই গ্রেট মসজিদটি তারই দৃশ্যমান ঐতিহাসিক প্রমাণ। প্রাচীন কাঠের কারুকাজ, চমৎকার বাগানের আঙিনা ও ক্যালিগ্রাফির মাধ্যমে এটি আজ হাজার বছর ধরে দুই সভ্যতার ঐতিহাসিক যোগসূত্রের পরিচয় বহন করে চলেছে। কোনো ধর্ম বা সভ্যতার বিস্তার সব সময় রাজনৈতিক ক্ষমতা কিংবা সামরিক প্রভাবের মাধ্যমে ঘটে না।
Tags: ইসলামি স্থাপত্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা, চীন, শিয়ান মসজিদ, সিল্ক রোড