1. ershadmc@gmail.com : নিউজ ডেস্ক : নিউজ ডেস্ক .
  2. ashraf@websofttechnologyltd.com : businesstimesadmin :
  3. shafidocs@gmail.com : News Desk : News Desk
  4. rezadu31@gmail.com : বিজনেস ডেস্ক : বিজনেস ডেস্ক .
  5. abdullahsheak8636@gmail.com : Shk Abd : Shk Abd

‘কোভিডের চেয়েও খারাপ’: ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতিতে সংকটে লাখ লাখ ভারতীয়র রুজি-রোজগার

রেজাউল করিম
  • আপডেট সময় রবিবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৫

দুই দশক আগে জয়নুল আবেদীন তার পরিবারকে ছেড়ে ভারতের রাজধানীতে চলে আসেন। এক বছর ধরে তিনি জারদোজি, একটি প্রাচীন এবং জটিল সুতার কাজ শেখেন। তার আশা ছিল, এই দক্ষতা তাকে আগামী অনেক বছর ধরে পরিবারের ভরণপোষণের সুযোগ করে দেবে।

তার সেই চেষ্টা সফল হয়েছিল। তিনি দিল্লির উপকণ্ঠে অবস্থিত একটি বড় পোশাক কারখানা, অরিয়েন্ট ক্রাফটে চাকরি পান। এই কারখানাটি গ্যাপ, রাল্ফ লরেন এবং আমেরিকান ঈগলের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোকে পোশাক সরবরাহ করে। গত ১২ বছর ধরে আবেদীন এমন সব পোশাক তৈরি করছেন, যেগুলো প্রায় ৮,০০০ মাইল দূরের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দোকানে পৌঁছায়।

সেলাই মেশিনে সুতা চালাতে চালাতে তিনি বলেন, “এটি একটি সত্যিকারের দক্ষতা। তা না হলে এটি শিখতে এক বছর সময় লাগত না।” এখন তার সেই কষ্টে অর্জিত জীবিকা এক অদৃশ্য শক্তির দ্বারা হুমকির মুখে পড়েছে।

সম্প্রতি হোয়াইট হাউস ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০% শুল্ক আরোপ করেছে। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক তার যেকোনো বাণিজ্যিক অংশীদারের ওপর আরোপ করা সর্বোচ্চ শুল্কগুলোর মধ্যে অন্যতম। এর ফলে বস্ত্র, হীরা, ইস্পাত, এবং অটোমোবাইলের মতো ভারতীয় রপ্তানি খাতের ব্যবসাগুলো মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

এই ৫০% শুল্কের অর্ধেক এসেছে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর ভারতের অতিরিক্ত রুশ তেল কেনার ‘শাস্তি’ হিসেবে। বাকি অর্ধেক এসেছে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অংশ হিসেবে, যার লক্ষ্য হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো। ২০২৪ সালে ভারতের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৪৭.৫ বিলিয়ন ডলার।

এই পদক্ষেপ নরেন্দ্র মোদীর ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ স্বপ্নের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। মোদী তার দেশকে একটি শক্তিশালী উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন। ভারতের বৃহত্তম রপ্তানি বাজার হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেই স্বপ্নের একটি বড় অংশ ছিল।

অরিয়েন্ট ক্রাফট কারখানার প্রায় ৮২% পণ্যই যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে এখন হতাশা জেঁকে বসেছে।

আবেদীন বলেন, “এর কারণে অনেক সমস্যা হচ্ছে, এবং কোম্পানি সংকটে পড়েছে। কোম্পানি যদি সংকটে পড়ে, আমরাও সংকটে পড়ব। দেশ যদি সংকটে পড়ে, আমরাও সংকটে পড়ব।”

ভারতের জন্য এটি এমন এক সমস্যা যা মোদী উপেক্ষা করতে পারেন না। কারণ, বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির এই দেশে লাখ লাখ তরুণ-তরুণী এরই মধ্যে চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে হিমশিম খাচ্ছে।

‘কোভিডের চেয়েও খারাপ’
নীরজ পাণ্ডে ২২ বছর ধরে এই কারখানায় কাজ করছেন। তার মাসিক আয় প্রায় ২০৫ ডলার, যা দিয়ে তিনি তার মেয়ের এমবিএ এবং ছেলের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনে সহায়তা করেছেন। কিন্তু এই নতুন শুল্ক তার জীবনকে এলোমেলো করে দিতে পারে।

তিনি বলেন, “আমরা সবকিছু হারাতে পারি। আমাদের চাকরি চলে যাবে।”

সুমিত্রা দেবীর জন্য অরিয়েন্ট ক্রাফটের কারখানায় কাজ করা কেবল একটি চাকরি ছিল না। তিনি বলেন, “আমার গ্রামের নারীরা সাধারণত কাজ করে না। আমি গৃহিণী ছিলাম।”

কারখানার উপার্জন তার জীবনকে বদলে দিয়েছে। তিনি তার সন্তানদের বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন, এবং এখন তার বড় মেয়ে একজন ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। স্কুল থেকে ঝরে পড়া দেবীর জন্য এটি ‘গর্বের বিষয়’।

তিনি এখন আশঙ্কা করছেন যে, নতুন শুল্ক তার সবকিছু মুছে ফেলতে পারে।

তিনি বলেন, “আমার স্বামীর বেতন যথেষ্ট নয়। যদি আমার চাকরি চলে যায়, মেয়েদের সরকারি স্কুলে ফিরে যেতে হবে… আর আমার মেয়েরা খুব গর্বিত। তারা বলে, ‘দেখো, আমার মা কাজ করে’।”

পাণ্ডে এবং দেবীর এই গল্পগুলো ভারতের একটি বৃহত্তর জাতীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষারই প্রতিচ্ছবি: মোদীর ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’—একটি কৌশল যা দেশের অভ্যন্তরে পণ্য তৈরি করে বিশ্বে বিক্রি করার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

২০১৪ সালে চালু হওয়া এই ফ্ল্যাগশিপ প্রোগ্রামটি মোদীর রাজনৈতিক ব্র্যান্ডের কেন্দ্রবিন্দু। এতে জাতীয় গর্ব এবং ১৪০ কোটির এই জাতির জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। সরকার পোশাকের মতো খাতগুলোতে ২৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রণোদনা দিয়েছে, যাতে ভারতের আমদানির উপর নির্ভরশীলতা কমে এবং দেশটি একটি উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে।

অরিয়েন্ট ক্রাফটের মালিক, সুধীর ধিংরা এই সময়টিকে “খুবই চ্যালেঞ্জিং” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, আমেরিকান ক্রেতাদের কিছু অর্ডার এরই মধ্যে স্থগিত হয়ে গেছে।

অরিয়েন্ট ক্রাফটের ফ্যাব্রিকস বিভাগের প্রধান হেমন্ত মাখিজা অনুমান করছেন, সারা দেশে প্রায় ২ কোটি সুতার কলের শ্রমিক চাকরি হারাতে পারে।

তিনি বলেন, “এই মৌসুমে সর্বোচ্চ উৎপাদন হওয়ার কথা থাকলেও জাতীয় রাজধানীর আশেপাশের মিলগুলো এরই মধ্যে ৫০% সক্ষমতায় কাজ করছে।”

সাবেক বাণিজ্য কর্মকর্তা এবং নিউ দিল্লির গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের প্রধান অজয় শ্রীবাস্তব অনুমান করেন, এই শুল্কের কারণে রপ্তানি কেন্দ্রগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তার মতে, ৫.৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের মার্কিন অর্ডার ৬০% থেকে ৯০% পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

ধিংরার জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো এর মানবিক মূল্য। তিনি বলেন, “(শ্রমিকদের) পরিবারের ভরণপোষণ করা খুবই কঠিন। এটি কোভিডের চেয়েও খারাপ।”

বাজার বহুমুখী করার প্রয়োজনীয়তা
পশ্চিমের শহর সুরাট বৈশ্বিক হীরা শিল্পের কেন্দ্র। এটি একটি বিশাল প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র, যেখানে দক্ষ কারিগররা বিশ্বের প্রায় ৯০% অপরিশোধিত হীরাকে পালিশ করে বিশ্ব বাজারের জন্য প্রস্তুত করে।

ইন্ডিয়া ব্র্যান্ড ইক্যুইটি ফাউন্ডেশন (আইবিইএফ) অনুসারে, এই খাতটি সারাদেশে প্রায় ৫০ লাখ মানুষকে কর্মসংস্থান দেয় এবং দেশের জিডিপিতে প্রায় ৭% অবদান রাখে।

ভারতের জেম অ্যান্ড জুয়েলারি এক্সপোর্ট প্রমোশন কাউন্সিলের আঞ্চলিক চেয়ারম্যান জয়ন্তীভাই সাভালিয়া বলেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও ভারতীয় হীরার ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। যেকোনো মন্দা ১০০% প্রভাব ফেলবে, যা সম্ভবত চাকরি হারানো এবং বেতন কমানোর দিকে নিয়ে যাবে।”

তিনি মনে করেন, এই পরিস্থিতি শিল্পের জন্য একটি “সতর্কবার্তা” এবং বাজার বহুমুখী করা প্রয়োজন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অধীনে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। অনেকটা মোদীর মতোই।

এই নীতির উদ্দেশ্য হলো উৎপাদনকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনা। কিন্তু এর ফলে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধক হিসেবে ভারতের সঙ্গে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হুমকির মুখে পড়তে পারে।

মূল সমস্যাটি হলো ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি, যা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যদিও দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

২০২৪ সাল পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছিল ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। একই বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য অংশীদারদের তালিকায় ভারত ছিল দশম স্থানে। ২০২৪ সালে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল এই দেশটির সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ছিল ১২৯.২ বিলিয়ন ডলার, যা দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে একটি রেকর্ড।

গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের শ্রীবাস্তব বলেন, উচ্চ শুল্ক পোশাকের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বাজারে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতকে কার্যকরভাবে মুছে ফেলতে পারে।

তিনি বলেন, “এটি ভিয়েতনামের ২০% এবং চীনের ৪২% শুল্কের তুলনায় ভারতীয় পোশাককে অপ্রতিযোগিতামূলক করে তুলছে।”

তবে তিনি আরও বলেন, শুল্কের কারণে পোশাক, বস্ত্র, গয়না এবং সামুদ্রিক খাদ্যের মতো রপ্তানি-নির্ভর খাতগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, এগুলো ভারতের জিডিপির প্রায় ২০%। এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয় মাত্র এক-পঞ্চমাংশ।

শ্রীবাস্তব বলেন, “শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা, ৬-৭% প্রবৃদ্ধি এবং চলমান সংস্কারগুলো প্রভাবকে কিছুটা প্রশমিত করবে, যা একটি সামগ্রিক সংকট প্রতিরোধ করবে। ভারত হয়তো স্বল্পমেয়াদী ক্ষতির মুখোমুখি হবে, কিন্তু এর বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার এই আঘাত সহ্য করতে পারবে, যা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করবে।”

তবে এই উদ্বেগের কারণে অরিয়েন্ট ক্রাফটের ধিংরা এরই মধ্যে বিকল্প নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন।

তিনি বলেন, “রাশিয়া একটি অনাবিষ্কৃত বাজার। আমি বলব ইউরোপের কিছু অংশে আমরা ব্যবসা পেতে পারি। আমরা দক্ষিণ আমেরিকাতেও যেতে পারি, যা আমরা করিনি। কিন্তু আমার উদ্বেগ হলো, এই শুল্ক ইন্দো-আমেরিকান সম্পর্কের মধ্যে একটি গভীর ক্ষত রেখে যাবে।”

মোদী পিছিয়ে আসছেন না
অনেক দেশ ট্রাম্পের সঙ্গে শুল্ক কমানোর জন্য বাণিজ্যিক চুক্তি করতে ছুটে গেলেও মোদী সহজে নতি স্বীকার করতে রাজি নন।

নয়াদিল্লি এই শুল্ককে “অন্যায়” এবং “অযৌক্তিক” বলে অভিহিত করেছে। তারা ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের কপটতা তুলে ধরেছে, কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ এখনও রাশিয়ার সার ও রাসায়নিক কিনছে।

এই মাসের শুরুতে মোদী বলেন, ভারত “কৃষক, জেলে এবং দুগ্ধ খামারিদের স্বার্থের সঙ্গে কখনও আপস করবে না।”

তিনি আরও বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি, আমাকে এর জন্য বড় মূল্য দিতে হবে, কিন্তু আমি এর জন্য প্রস্তুত।”

প্রভাব কমানোর জন্য সরকার কিছু পাল্টা ব্যবস্থা ঘোষণা করেছে, যার মধ্যে রয়েছে কাঁচামালের ওপর আমদানি শুল্ক স্থগিত করা এবং রপ্তানি বাজার বহুমুখী করার জন্য বাণিজ্য আলোচনা ত্বরান্বিত করা।

কিন্তু সাধারণ কারখানার শ্রমিকদের জন্য এর মানে খুব কমই।

পাণ্ডে বলেন, “যদি আমার চাকরি চলে যায়, আমার আর কোনো কাজ নেই। আমি আর কিছু করতে জানি না।”

“যদি তারা কোনো সমঝোতায় আসতে পারে, তাহলে ভালো হবে। যদি না পারে, আমরা কী করতে পারি?”

সূত্র: সিএনএন

Tags: , , , ,

এই ধরনের আরও নিউজ
© কপিরাইট ২০২৫ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: NagorikIT