বাংলাদেশে গিনি সূচকের ভারসাম্যহীনতার কারণে ক্রমবর্ধমান আয় বৈষম্য কমাতে উচ্চ বিত্তশালী ব্যক্তিদের ওপর করের বোঝা বা আওতা বাড়ানোর বিষয়টি সরকারি কৌশলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
২০২৫ সালের জুনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রকাশিত ২০২৫-২৬ থেকে ২০৩৪-৩৫ অর্থবছরের মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী রাজস্ব কৌশলে (এমএলটিআরএস) কর ব্যবস্থায় এমন কাঠামগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
কর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উপায় সম্পর্কে এই কৌশলপত্রে বলা হয়েছে, “কৌশলগত কাঠামোর আওতায় উচ্চ বিত্তশালীদের ওপর অধিক কর নিশ্চিত করতে করের হার পুনর্বিবেচনা, তাদের জটিল আর্থিক বিষয়গুলোর কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং নজরদারি ও পরিপালন নিশ্চিত করার জন্য একটি ব্যবস্থা প্রবর্তনের বিষয়টিও প্রক্রীয়াধীন রয়েছে।”
এনবিআরের কর্মকর্তাদের একটি বিশেষ দলের তৈরি করা এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করা এবং দেশে কর-জিডিপি অনুপাতের উন্নতি ঘটানো।
ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে, বার্ষিক ৩৮ লাখ ৫০ হাজার টাকার বেশি আয়ের ব্যক্তিগত করদাতাদের ৩০ শতাংশ কর দিতে হয়। এছাড়া, সম্পদ ৪ কোটি টাকার বেশি হলে বিত্তশালী করদাতাদের সম্পদ অর্জনের ওপর ভিত্তি করে ১০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত সারচার্জ দিতে হয়।
চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, বর্তমানে বিপুল সম্পদের অধিকারী একজন উচ্চ বিত্তশালী ব্যক্তিকে প্রতি ১০০ টাকা অতিরিক্ত আয়ের জন্য ৪.০৫ টাকা কর দিতে হয়। তিনি বলেন, উচ্চ বিত্তশালীরা শিল্প, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি। তাদের ওপর উচ্চ কর আরোপ করা হলে এসব বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে তিনি বলেন, “তাই কেবল করের হার না বাড়িয়ে আমাদের উচিত বর্তমান উচ্চ-হারের ধাপগুলো মূল্যায়ন করা এবং সম্পদ সারচার্জের বিকল্প খুঁজে বের করার দিকে মনোনিবেশ করা।”
বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) কমিশনার ইখতিয়ার উদ্দিন মামুন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রায় ২৩ হাজার উচ্চ বিত্তশালী ব্যক্তি রয়েছেন, যাদের প্রত্যেকের ব্যাংক আমানত প্রায় ৪০ কোটি টাকা।
তবে তিনি জানান, এনবিআরের কাছে উচ্চ বিত্তশালী করদাতাদের এবং তাদের প্রদত্ত করের পরিমাণের কোনো সংকলিত তথ্য নেই, যদিও ওই ব্যাংক আমানতকারীরা করের আওতায় রয়েছেন। এলটিইউ-এর অধীনে প্রায় ৪০০ জন উচ্চ বিত্তশালী করদাতা রয়েছেন, যারা মূলত বড় কোম্পানিগুলোর স্পন্সর ডিরেক্টর এবং শেয়ারহোল্ডার।
তিনি বলেন, “যদি ওই ২৩ হাজার উচ্চ বিত্তশালী বর্তমান হারেই সঠিক কর প্রদান করেন, তবে মোট প্রত্যক্ষ কর আদায়ে ব্যক্তিগত করদাতাদের অবদানের অংশ ৮০ শতাংশ হতে পারত।”
তবে জনাব মামুন উচ্চ বিত্তশালীদের জন্য করের হার বৃদ্ধির এমএলটিআরএস কাঠামোর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন; বরং তিনি বিত্তশালীদের তথ্য গোপনের পথ বন্ধ করার পরামর্শ দেন।
কর ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তিনি বলেন, বিত্তশালীরা সঠিক কর দিলে এনবিআরকে কর আদায় বাড়াতে ছোট করদাতাদের পেছনে ছুটতে হবে না। তিনি যোগ করেন, “বর্তমানে অনেক ব্যক্তিগত করদাতা করযোগ্য আয়ের নিচে আয় থাকা সত্ত্বেও কর দিতে বাধ্য হচ্ছেন।”
তিনি মন্তব্য করেন, উচ্চ বিত্তশালীরা কর ফাঁকি দিলে সমতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা ক্ষুণ্ন হয়।
বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) চেয়ারপারসন আবুল কাসেম খান এটিকে ৬০-৭০ দশকের বিত্তশালীদের জন্য করের হার বৃদ্ধির ধারণার সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা প্রকৃত আয় গোপন করার প্রবণতা বাড়াতে পারে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি জনাব কাসেম বলেন, “উচ্চ বিত্তশালীদের হয়তো উচ্চ হারে কর দিতে বাধ্য করা যেতে পারে, কিন্তু এটি দীর্ঘ সময়ের জন্য কার্যকর থাকবে না।” তিনি পরামর্শ দেন, কালো ও ধূসর অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে আনতে সরকারকে অবশ্যই আইন সংশোধন করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, স্থবির ব্যবসায়িক পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও ২০২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে ১ কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ৫ হাজার ২৫৫টি বেড়েছে।ভ্রমণ গাইড
সম্প্রতি অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, দীর্ঘ দিন ধরে ঘরে গচ্ছিত অপ্রদর্শিত অর্থ এখন ব্যাংকে জমা হওয়ায় ১ কোটি টাকার বেশি থাকা ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা বাড়ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ১৯৭২ সালে ১ কোটি টাকার বেশি ব্যাংক হিসাব ছিল মাত্র পাঁচটি, ১৯৭৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৭টিতে এবং ১৯৮০ সালে হয় ৯৮টি।
গিনি সূচক ০ থেকে ১০০ স্কেলে পরিমাপ করা হয়, যেখানে ০ মানে পূর্ণ সমতা এবং ১০০ মানে পূর্ণ অসমতা। ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আয় বৈষম্য (যার মধ্যে উপার্জন, রেমিট্যান্স এবং সম্পদের মুনাফা অন্তর্ভুক্ত) আরও খারাপ হয়েছে। গিনি সূচক ৫১ থেকে বেড়ে ৫৪ পয়েন্টে পৌঁছেছে।
শহরাঞ্চলে গিনি সূচক ৩৩.১ থেকে বেড়ে ৩৪.৫ হয়েছে, তবে গ্রামাঞ্চলে তা ২৯.২ থেকে কমে ২৮.২-এ দাঁড়িয়েছে।
বিটি/আরকে
Tags: আয় বৈষম্য, কর, বিত্তশালী