ভারতের ও চীনের সাম্প্রতিক সফরকে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। নয়াদিল্লি ও বেইজিংয়ে তিনি বাণিজ্য, অবকাঠামো, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সংযোগ নিয়ে আলোচনা করেন। বিভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, বিনিয়োগ উৎসাহিত করা হয় এবং কৌশলগত প্রকল্পগুলোর প্রতি পুনরায় অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়।
তবে রাষ্ট্রীয় সফর ও কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে রয়েছে আরও জটিল এক বাস্তবতা। এমন এক সময়ে মিয়ানমারের সামরিক সরকার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের চেষ্টা করছে, যখন বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যে তাদের ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণ ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। সেখানে আরাকান আর্মি (এএ) এবং ইউনাইটেড লীগ অব আরাকান (ইউএলএ) প্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
ফলে এই সফরগুলোর গুরুত্ব কেবল কূটনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এগুলো দেখিয়ে দেয়, কীভাবে আরাকান (রাখাইন) চীন ও ভারতের আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে এগুলো এই ধারণার সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করে যে, শুধুমাত্র নেপিদোই বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে সক্ষম।
রাখাইনের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্ব
চীন ও ভারতের উভয়ের কাছেই মিয়ানমার এখন আর শুধু একটি প্রতিবেশী দেশ নয়; এটি ভারত মহাসাগরে পৌঁছানোর একটি কৌশলগত করিডর।
চীনের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হলো চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর (সিএমইসি), যা বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই করিডর ইউনান প্রদেশকে মান্দালয়ের সঙ্গে যুক্ত করে এবং শেষ পর্যন্ত রাখাইনের উপকূলীয় শহর কিয়াউকফিউ পর্যন্ত পৌঁছায়। এর মূল উপাদান হলো কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড), যা বেইজিংকে সরাসরি বঙ্গোপসাগরে প্রবেশের সুযোগ দেয় এবং মালাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমায়।
ভারতের কৌশলগত স্বার্থও সমানভাবে স্পষ্ট। কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রকল্প-এর মাধ্যমে নয়াদিল্লি সিত্তে ও পালেতোয়া হয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে সমুদ্রপথের সঙ্গে সংযুক্ত করতে চায়। এর মাধ্যমে বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি সংকীর্ণ শিলিগুড়ি করিডরের ওপর নির্ভরতাও কমানো সম্ভব হবে।
এই দুই প্রকল্পই রাখাইনকে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রস্থলে নিয়ে এসেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. সাই কি জিন সোয়ে সম্প্রতি ডিএমজি-কে বলেন, মিয়ানমার এখন চীন ও ভারতের উভয়ের জন্যই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। কারণ, উভয় দেশই ভারত মহাসাগরে প্রবেশাধিকারকে তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নিরাপত্তা কৌশলের জন্য অত্যাবশ্যক মনে করে।
এই প্রতিযোগিতা ভবিষ্যতে আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
কূটনীতি বনাম মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা
চীন ও ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—তাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প এখন এমন এলাকায় অবস্থিত, যেখানে সামরিক সরকার কার্যকর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।
যদিও জান্তা এখনো সিত্তে, কিয়াউকফিউ, মানাউং এবং কয়েকটি সামরিক ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে, তবে সামগ্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতা নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। রাখাইনের অধিকাংশ এলাকায় এখন ইউএলএ/এএ স্থানীয় প্রশাসন, কর আদায়, পুলিশি ব্যবস্থা, বিচারিক কার্যক্রম এবং জনসেবা পরিচালনা করছে।
মিন অং হ্লাইংয়ের চীন সফর নিয়ে ডিএমজি-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এই বাস্তবতা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। চীনা প্রকল্প পর্যবেক্ষণকারী এক স্থানীয় বিশ্লেষক বলেন, জান্তা বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও এসব প্রকল্পের বড় অংশই সংঘাতপূর্ণ এবং ক্রমবর্ধমানভাবে এএ-এর প্রভাবাধীন এলাকায় অবস্থিত।
তিনি বলেন, “এএ-এর সঙ্গে কোনো না কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়া এসব প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।”
এই মূল্যায়ন বৃহত্তর আঞ্চলিক বাস্তবতারই প্রতিফলন। বেইজিং কিংবা নয়াদিল্লি—কেউই আর রাখাইনে গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে উপেক্ষা করতে পারছে না।
সামরিক সরকার চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারলেও, সেগুলোর বাস্তবায়ন ক্রমেই এমন পক্ষগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যারা নেপিদোর নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
বিমান হামলা ও সম্পৃক্ততার দ্বৈত বাস্তবতা
একদিকে যখন চীন ও ভারত বাণিজ্য করিডর ও উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করছে, অন্যদিকে রাখাইনের মানবিক পরিস্থিতি ক্রমাগত অবনতির দিকে যাচ্ছে।
ডিএমজি-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৭ জুন মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর যুদ্ধবিমান কিয়াউকতাও এবং আশপাশের এলাকায় ধারাবাহিক বিমান হামলা চালায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে একাধিক যুদ্ধবিমান ১০টিরও বেশি বোমা হামলা চালায়। প্রাথমিক তথ্যে নারী-শিশুসহ বেসামরিক হতাহতের খবর পাওয়া যায়।
গত দুই বছরে এটি একটি ধারাবাহিক প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। গ্রাম, স্কুল, হাসপাতাল, বাজার, আটক কেন্দ্র এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়স্থল বারবার বিমান হামলার শিকার হয়েছে।
এখানেই একটি সুস্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যায়।
একদিকে আঞ্চলিক শক্তিগুলো রাখাইনকে বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সংযোগের প্রবেশদ্বার হিসেবে দেখছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত বিমান হামলার আশঙ্কার মধ্যে জীবনযাপন করছে। কূটনৈতিক বৈঠকে অবকাঠামো ও বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হলেও, মাঠপর্যায়ে মানুষ অনিরাপত্তা, বাস্তুচ্যুতি এবং মানবিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে।
ফলে রাখাইন এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাতে আটকে আছে—একটি কৌশলগত করিডর ও অর্থনৈতিক সংহতিকে কেন্দ্র করে, অন্যটি যুদ্ধের কঠোর বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে।
কিয়াউকফিউর ভবিষ্যৎ
কিয়াউকফিউর চেয়ে ভালোভাবে এই দ্বন্দ্বকে আর কোনো প্রকল্প ব্যাখ্যা করতে পারে না।
চীনের জন্য কিয়াউকফিউ ভারত মহাসাগরে প্রবেশের একটি কৌশলগত পথ এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সামরিক সরকারের জন্য এটি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা প্রদর্শনের একটি সুযোগ।
কিন্তু রাখাইনের মানুষের জন্য প্রকল্পটি আরও মৌলিক একটি প্রশ্ন উত্থাপন করে—এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত কে নির্ধারণ করবে?
এএ-এর নেতারা একাধিকবার বলেছেন, তারা এমন বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানায় যা স্থানীয় জনগণের উপকারে আসে এবং আঞ্চলিক উন্নয়নে অবদান রাখে। তারা আন্তর্জাতিক প্রকল্পে সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আগ্রহও প্রকাশ করেছে।
এসব বক্তব্য ইঙ্গিত করে যে, ভবিষ্যতে রাখাইনের সঙ্গে কার্যকর সম্পৃক্ততার জন্য কেবল জান্তার ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগাযোগের প্রয়োজন বাড়তে পারে।
এর অর্থ এই নয় যে, তাদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হবে। তবে এটি স্পষ্ট করে যে, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চর্চা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান ক্রমশ বাড়ছে।
রাষ্ট্রীয় সফরের বাইরের বাস্তবতা
ভারত ও চীন সফরের মাধ্যমে মিন অং হ্লাইং নিঃসন্দেহে কূটনৈতিকভাবে কিছু দৃশ্যমানতা অর্জন করেছেন। চলমান সংঘাত ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও এসব সফর সামরিক নেতৃত্বকে আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার একটি চিত্র তুলে ধরার সুযোগ দিয়েছে।
কিন্তু এই সফরগুলোর প্রকৃত তাৎপর্য অন্যত্র।
এগুলো দেখিয়ে দেয় যে, রাখাইন আজকের মিয়ানমারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চল হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে এগুলো প্রমাণ করে যে, চীন ও ভারত উভয়ই তাদের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষায় নিজেদের কৌশল পুনর্বিন্যাস করছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পশ্চিম মিয়ানমারের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কার্যকর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব এখন আর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়—এ বাস্তবতা ক্রমেই উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠছে।
আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা এবং বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পগুলো এগিয়ে চললেও, রাখাইনের ভবিষ্যৎ কেবল নেপিদো, বেইজিং বা নয়াদিল্লিতে নির্ধারিত হবে না।
এটি নির্ধারিত হবে মাঠপর্যায়ে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক বাস্তবতার মাধ্যমে এবং সেইসব মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে, যারা আজও ভূরাজনীতি ও যুদ্ধ—উভয়ের ছায়ায় বসবাস করছে।
অং মার্ম উ রাখাইন-ভিত্তিক সংবাদ সংস্থা ডেভেলপমেন্ট মিডিয়া গ্রুপ (ডিএমজি)-এর প্রধান সম্পাদক ও নির্বাহী পরিচালক। তিনি মিয়ানমারের বেআইনি সংগঠন আইনের অধীনে অভিযুক্ত এবং ২০১৯ সালের মে মাস থেকে আত্মগোপন করে আছেন।
সূত্র: দ্য ইরাবতী
Tags: ক্ষমতা, চীন, পাইপলাইন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বন্দর, ভারত, রাখাইন, রাজনীতি