মিয়ানমারের পশ্চিম সীমান্তের রাজনৈতিক ভূগোল আঞ্চলিক কূটনীতির স্বীকৃতির চেয়ে অনেক দ্রুত বদলে গেছে। মিয়ানমারের সঙ্গে ২৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তে বেড়া নির্মাণের জন্য বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রস্তাব এই উদীয়মান বাস্তবতারই প্রতিফলন। জুন মাসে ঘোষিত এই প্রকল্পটি সীমান্ত–পারের অপরাধ, অনিয়মিত অভিবাসন, মাদক পাচার এবং অন্যান্য আন্তঃদেশীয় হুমকি মোকাবিলার লক্ষ্যে গৃহীত বৃহত্তর নিরাপত্তা কৌশলের অংশ।
সীমান্ত নজরদারি জোরদার করতে ঢাকা সীমান্ত সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি থার্মাল ইমেজিং ডিভাইস, সিসিটিভি ক্যামেরা, নাইট ভিশন সরঞ্জাম এবং ড্রোন নজরদারি ব্যবস্থা মোতায়েনেরও পরিকল্পনা করেছে।
প্রথম নজরে এই প্রস্তাবটি একটি প্রচলিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটি আরও বড় একটি প্রশ্ন উত্থাপন করে: এখন সীমান্তের শাসন করছে কে? বহু দশক ধরে সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার—এই দুই সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যকার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সেই ধারণা আর বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
পুরো সীমান্তটি রাখাইন রাজ্যের মংডু ও বুথিডং টাউনশিপজুড়ে বিস্তৃত, যা বর্তমানে আরাকান আর্মি (এএ)-এর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বাংলাদেশ এখনও মিয়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখলেও, নেপিদো আর সীমান্তের ওপর কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করতে পারে না।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতা শুধু সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য নয়, মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া, শরণার্থী প্রত্যাবাসন, সীমান্ত–পারের বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও গভীর তাৎপর্য বহন করে।
আরাকানের এক প্রবীণ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক রাখাইনভিত্তিক সংবাদ সংস্থা ডেভেলপমেন্ট মিডিয়া গ্রুপ (ডিএমজি)-কে বলেন, “সীমান্তে বেড়া কেবল একটি ভৌত প্রতিবন্ধক। প্রকৃত নিরাপত্তা দেয়াল দিয়ে আসে না। কার্যকর একমাত্র বাস্তবসম্মত সমাধান হলো বাংলাদেশ এবং মাটিতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণকারী আরাকান পিপলস গভর্নমেন্টের মধ্যে সরাসরি সহযোগিতা। তা না হলে এই প্রকল্পটি কেবল কাগজে-কলমে থাকা একটি ব্যয়বহুল সমাধানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।”
তার এই মন্তব্য বর্তমানে বাংলাদেশের সামনে থাকা মূল সংকটটিকেই স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব আর একই বিষয় নয়
প্রতিটি সার্বভৌম রাষ্ট্রেরই নিজের সীমান্ত সুরক্ষিত রাখার অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি দায়িত্বও রয়েছে। আন্তঃদেশীয় অপরাধ, মাদক পাচার, মানবপাচার এবং অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ পুরোপুরি যৌক্তিক। পাশাপাশি দেশটি এখনও ১২ লক্ষেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে চলেছে, ফলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জাতীয় নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গুরুত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তবে নিরাপত্তা নীতি রাজনৈতিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করতে পারে না। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আরাকান আর্মি মংডুর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে কার্যত এই সীমান্ত বাংলাদেশ এবং এএ-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের মধ্যকার সীমান্তে পরিণত হয়েছে।
এটি কূটনৈতিক স্বীকৃতির সমতুল্য নয়, তবে এটি একটি কার্যকর বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে। ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে সরকারগুলো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক অবস্থান অপরিবর্তিত রেখেও বাস্তব প্রয়োজনে ডি-ফ্যাক্টো (বাস্তব নিয়ন্ত্রণকারী) কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা করেছে। মানবিক সহায়তা, যুদ্ধবিরতি এবং সীমান্ত সমন্বয় প্রায়ই এমন বাস্তববাদী সম্পৃক্ততার ওপর নির্ভর করেছে। বাংলাদেশ এখন ঠিক এমনই এক পরিস্থিতির মুখোমুখি।
একটি বেড়া রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে পারে না
ভৌত প্রতিবন্ধকতা কিছু ধরনের অবৈধ চলাচল কমাতে পারে, কিন্তু এগুলো খুব কম ক্ষেত্রেই সেই রাজনৈতিক বাস্তবতাগুলো দূর করতে পারে, যেগুলো থেকে নিরাপত্তাহীনতার জন্ম হয়। বাংলাদেশ–রাখাইন সীমান্ত এখন এমন এক ভূখণ্ড, যা সশস্ত্র সংঘাত, মানবিক বাস্তুচ্যুতি, প্রতিদ্বন্দ্বী শাসনব্যবস্থা, শরণার্থীদের চলাচল এবং পরিবর্তিত আঞ্চলিক ভূরাজনীতির দ্বারা গঠিত।
সীমান্তের উভয় পাশে কার্যকর কর্তৃত্ব প্রয়োগকারী পক্ষগুলোর মধ্যে বাস্তবভিত্তিক সমন্বয় ছাড়া সবচেয়ে উন্নত নজরদারি প্রযুক্তি ও ভৌত অবকাঠামোও তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম।
আরেকজন সীমান্ত পর্যবেক্ষক ডিএমজি-কে বলেন, “বাংলাদেশের উদ্দেশ্য যদি সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা বা সীমান্তের ওপর পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়, তবে যে এএ ওই ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে, তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছাড়া বেড়া নির্মাণ প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এএ-কে শাসনকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দিক বা না দিক, তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া এই প্রকল্প সফল হবে না।”
মানবিক বাস্তবতা আরও অবনতির দিকে
সীমান্তে বেড়া নির্মাণ নিয়ে বিতর্ক এমন এক সময়ে চলছে, যখন মানবিক পরিস্থিতি ক্রমেই আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণ হারালেও, তারা এখনও আকাশপথে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কিয়াউকতাও, বুথিডং এবং মংডু টাউনশিপজুড়ে বেসামরিক এলাকায় বারবার বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে।
১৭ জুন জান্তা বাহিনীর এক বিমান হামলায় কিয়াউকতাওয়ে ১০ জন বেসামরিক মানুষ নিহত এবং আরও ১৬ জন আহত হন। ১ জুলাই যুদ্ধবিমান ও ওয়াই-১২ বিমান বুথিডংয়ের মুসলিম অধ্যুষিত ক্যেত মাউক তাউং গ্রামে বোমা হামলা চালায়। এতে দুই শিশুসহ তিনজন বেসামরিক মানুষ আহত হন এবং বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই রাতের পরে সামরিক বাহিনী মংডুতেও সমন্বিত আরেকটি বিমান হামলা চালায়। খবর অনুযায়ী, শহরের প্রবেশপথ, থ্রি-মাইল এলাকা এবং সাবেক বর্ডার গার্ড পুলিশ সদরদপ্তর নম্বর–৫-এর আশপাশে প্রায় এক ডজন বোমা ফেলা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের হামলা দিন দিন আরও ঘন ঘন ঘটছে।
একজন বাসিন্দা ডিএমজিকে বলেন “সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সামরিক বাহিনী মংডুতে বারবার বিমান হামলা চালাচ্ছে, যার ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা চরম আতঙ্কে রয়েছে। কিছু পরিবার ইতোমধ্যে আত্মীয়স্বজনের কাছে আশ্রয় নিতে আশপাশের গ্রামে চলে গেছে। আমাদের বিশ্বাস, সীমান্ত–পারের বাণিজ্য আবার শুরু হওয়ার এই সময়ে বেসামরিক মানুষকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে।”
এই ঘটনাগুলো সীমান্ত অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে। একটি বেড়া বেসামরিক মানুষকে বিমান হামলা থেকে রক্ষা করতে পারে না, আবার শরণার্থীদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশও সৃষ্টি করতে পারে না।
সীমান্ত এখন একটি আঞ্চলিক ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে
বাংলাদেশ–রাখাইন সীমান্ত ক্রমশ এমন একটি আঞ্চলিক কৌশলগত পরিসরে পরিণত হচ্ছে, যেখানে নিরাপত্তা, মানবিক সুরক্ষা, বাণিজ্য এবং ভূরাজনীতি একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। সীমান্তপারের বাণিজ্য ধীরে ধীরে পুনরায় শুরু হয়েছে এবং মানবিক সংস্থাগুলো সংঘাত–কবলিত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের টেকসই সমাধান খুঁজে বের করতে বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রয়েছে। অন্যদিকে আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি (আরসা), রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) এবং আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি (এআরএ)-সহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী এখনও সীমান্তের কিছু অংশে সক্রিয় রয়েছে, যা আগেই নাজুক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এই চ্যালেঞ্জগুলোর কোনোটিই কেবল ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়।
একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার আবির্ভাব
মিয়ানমারের সামরিক সরকারগুলো অতীতে তাদের সীমান্তের বিভিন্ন অংশে বিপুল বিনিয়োগ করে বেড়া নির্মাণ করেছিল। কিন্তু সেই প্রচেষ্টার সাফল্য ছিল খুবই সীমিত।
আরেকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডিএমজিকে বলেন, “সত্যিকার অর্থে যা প্রয়োজন, তা হলো সীমান্তজুড়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা এবং সীমান্ত এলাকায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন। যতদিন মুসলিম সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ঘিরে সংঘাত অব্যাহত থাকবে এবং অস্থিতিশীলতা বজায় থাকবে, ততদিন এই সীমান্ত বেড়া প্রকল্প তার প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না।”
তার এই মূল্যায়ন একটি বৃহত্তর শিক্ষা তুলে ধরে। টেকসই সীমান্ত নিরাপত্তা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, কার্যকর শাসনব্যবস্থা, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা এবং বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে আরাকান আর্মিকে স্বীকৃতি দেবে কি না, তা কূটনৈতিক বিষয়; কিন্তু বাস্তবে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছাড়া সীমান্ত কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব কি না, সেটি বাস্তব প্রয়োজনের প্রশ্ন।
মিয়ানমারের সংঘাত যখন পুরো অঞ্চলের বাস্তবতাকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে, তখন সরকারগুলো ক্রমেই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে, যেখানে রাজনৈতিক ভূগোল কূটনৈতিক নীতির তুলনায় অনেক দ্রুত পরিবর্তিত হবে। বাংলাদেশ–রাখাইন সীমান্ত সম্ভবত সেই রূপান্তরের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ।
দ্য ইরাবতী টাইমসে রাখাইনভিত্তিক সংবাদ সংস্থা ডেভেলপমেন্ট মিডিয়া গ্রুপ (ডিএমজি)-এর প্রধান সম্পাদক ও নির্বাহী পরিচালক অং মার্ম উ-এর লেখা থেকে।
Tags: আরএসএ, আরসা, আরাকন, আরাকান আর্মি, বাংলাদেশ–রাখাইন সীমান্ত, মিয়ানমার, রাখাইন, রোহিঙ্গা, রোহিঙ্গা সমস্যা