দশকের পর দশক ধরে ইউরোপে ইসলাম একটি রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে। কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নতুন প্রজন্মের একদল ফুটবলার দেখিয়ে দিচ্ছেন যে, ইসলামও ইউরোপীয় সমাজ ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ২০০ কোটি মুসলমান রয়েছে, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। তাই ১৩টি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত একটি বিশ্বকাপে ইসলামী বিশ্বাসের প্রকাশ্য বহিঃপ্রকাশ খুব একটা বিস্ময়ের বিষয় হওয়ার কথা নয়।
তবুও ইসলামী বিশ্বাসের সবচেয়ে আলোচিত কিছু প্রকাশ এসেছে এমন সব ফুটবলারের কাছ থেকে, যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ খ্রিস্টান দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
স্পেন জাতীয় দল ও এফসি বার্সেলোনার আক্রমণভাগের কিশোর তারকা লামিন ইয়ামাল সৌদি আরবের বিপক্ষে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ গোল করার পর সিজদা দেওয়ায় শিরোনাম হন।
এর আগেই, মার্চ মাসে বার্সেলোনায় স্পেন ও মিশরের মধ্যকার একটি প্রীতি ম্যাচে ইয়ামালের ধর্মীয় পরিচয় আলোচনায় আসে। সেদিন গ্যালারির একাংশ থেকে স্লোগান ওঠে: মুসলিম এল কুইউইি নো বোটি (যে লাফ দিচ্ছে না, সে মুসলমান)।
এর জবাবে ইয়ামাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন: আমি মুসলমান, আলহামদুলিল্লাহ… ফুটবল মানুষের বিনোদন ও তাদের উৎসাহিত করার জন্য, মানুষের বিশ্বাসের কারণে তাদের প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের জন্য নয়।
এই স্লোগানগুলো হঠাৎ করেই সৃষ্টি হয়নি। ইউরোপজুড়ে উগ্র ডানপন্থী দলগুলো—এবং ক্রমবর্ধমানভাবে কয়েকটি মূলধারার রাজনৈতিক দলও—একটি ভ্রান্ত বিভাজন তৈরির চেষ্টা করেছে: খ্রিস্টান ইউরোপ বনাম তথাকথিত বিদেশি শক্তি ইসলাম।
অথচ বাস্তবতা হলো, খ্রিস্টধর্মেরও উৎপত্তি সেই একই ইউরোপের বাইরের উপদ্বীপে, যেখানে খ্রিস্টের ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার প্রায় ছয় শতক পরে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে।
‘আমাদের একজন নয়’
নিজ দেশের সমর্থকদের কাছ থেকে ‘ভিন্ন’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার অভিজ্ঞতা শুধু ইয়ামালের নয়। ২০২৪ সালে জার্মানির সেন্টার-ব্যাক আন্তোনিও রুডিগার রমজানের সূচনা উপলক্ষে ইনস্টাগ্রামে একটি ছবি পোস্ট করেন, যেখানে তিনি তাওহিদের প্রতীক হিসেবে তর্জনী উঁচু করেছিলেন।
বিশ্বাসের একটি সাধারণ প্রকাশ হওয়ার কথা থাকলেও, বিল্ড জাইটুং-এর প্রধান সম্পাদক জুলিয়ান রাইখেল্ট দাবি করেন, এটি কথিত ইসলামিক স্টেট (আইএস)-কে সমর্থনের প্রতীক।
এরপর রুডিগার মানহানি ও বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার অভিযোগে রাইখেল্টের বিরুদ্ধে মামলা করেন। যদিও পরে সরকারি কৌঁসুলি সেই মামলা আর এগিয়ে নেননি।
ইয়ামালের সৌদি আরবের বিপক্ষে গোল করার মাত্র কয়েক দিন আগে আরেক ইউরোপীয় ফুটবলারও গোল উদযাপনে সিজদা করেছিলেন।
সুইডেনের হয়ে তিউনিসিয়ার বিপক্ষে প্রথম গোল করেন ইয়াসিন আয়ারি। তখন অনেকেই তার তিউনিসীয় বংশোদ্ভূত পরিচয়ের দিকে মনোযোগ দেন এবং উল্লেখ করেন যে, তিউনিসিয়া ফুটবল ফেডারেশন একসময় তাকে নিজেদের হয়ে খেলতে রাজি করানোর চেষ্টা করেছিল।
বাবার জন্মভূমির প্রতি সম্মান জানিয়ে আয়ারি দু’হাত তুলে এমন ভঙ্গি করেন, যেন ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। কিন্তু তার এবং সুইডিশ দলের সাফল্য আবারও পুরোনো বিতর্ককে উসকে দেয়। সুইডিশ ডেমোক্র্যাটসের নেতা জিমি আকেসনসহ অনেকে আয়ারিকে সুইডিশ হিসেবে স্বীকার করতেই অস্বীকৃতি জানান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সমালোচনায় ভরে যায়—তার ধর্মীয় প্রকাশ এবং সংযত গোল উদযাপন, দুটিই ছিল সমালোচনার লক্ষ্য।
বাস্তবে, আয়ারির সাফল্যই প্রমাণ করে যে, ইসলাম ইউরোপেরই একটি অংশ এবং অধিকাংশ অভিবাসীই শেষ পর্যন্ত সমাজের সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়।
বরং তার তিউনিসীয় বাবা আজুজই তাকে তিউনিসিয়ার হয়ে না খেলার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি আফতোনব্লাদেত পত্রিকাকে বলেন: আমার সন্তানরা সুইডেনেরই অংশ। তাদের জন্ম সুইডেনে। তাদের বন্ধুরা সুইডেনে। আমি একজন অভিবাসী। ইয়াসিন তিউনিসীয় বংশোদ্ভূত একজন সুইডিশ। তাই সুইডেনের হয়ে খেলার অধিকার তার আছে।
তিনি আরও বলেন: আমি সত্যিই চাই সে সুইডেনের হয়েই খেলুক। সে যেন অনুভব করে যে, যে দেশ তাকে সত্যিকারের যত্ন নিয়েছে, সেই দেশের জন্য সে কিছু ফিরিয়ে দিতে পারে। যে দেশ তাকে স্কুল দিয়েছে, সুযোগ দিয়েছে, যেখানে সে মিটবল আর ম্যাশড পটেটো খেয়ে বড় হয়েছে। আমি কেন তাতে হস্তক্ষেপ করব? আমি তার জন্য ভীষণ খুশি।
ইউরোপে মুসলিম পরিচয়ের পরিবর্তিত চিত্র
আয়ারি, ইয়ামাল ও রুডিগার তাদের অভিবাসী পরিবার থেকে ইসলামের উত্তরাধিকার পেলেও, ইউরোপে ক্রমবর্ধমান সংখ্যক ফুটবলার ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন।
তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন নেদারল্যান্ডসের মিডফিল্ডার ও চারবারের উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগজয়ী ক্লারেন্স সিডর্ফ, ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া মালির স্ট্রাইকার ফ্রেদেরিক কানুতে এবং ২০১৮ বিশ্বকাপজয়ী ফরাসি মিডফিল্ডার পল পগবা।
আরেক ধর্মান্তরিত ফুটবলার জেড স্পেন্স এবারের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের লেফট-ব্যাক হিসেবে খেলছেন। গত বছর সার্বিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অভিষেকের মাধ্যমে তিনি ইংল্যান্ডের প্রতিনিধিত্বকারী প্রথম মুসলিম ফুটবলার হন।
৫-০ গোলের জয়ের পর তিনি বলেন: আমি অবাক হয়েছিলাম, কারণ আমি জানতামই না যে আমিই প্রথম। তাই এটি আমার জন্য এক আশীর্বাদ। ইতিহাসের অংশ হতে পারাটা ভালো লাগছে। আশা করি এটি বিশ্বের তরুণদের অনুপ্রাণিত করবে যে, তারাও একদিন এখানে পৌঁছাতে পারবে। তারা আমার মতোই নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে।
ইউরোপই আবার কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ দলে থাকা তিনজন খেলোয়াড়ের ইসলাম গ্রহণের পথও তৈরি করেছে। ছোট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে স্পেন, উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সাহসী পারফরম্যান্স দেখিয়ে এবারের টুর্নামেন্টের অন্যতম চমক হয়ে ওঠে। দেশটির অধিকাংশ মানুষ রোমান ক্যাথলিক হলেও ইতিহাস গড়া এই দলের বড় অংশই এসেছে প্রবাসী সম্প্রদায় থেকে। দলের প্রায় অর্ধেক খেলোয়াড়ের জন্ম কেপ ভার্দের বাইরে।
৩২ বছর বয়সী জামিরো মন্টেইরো ২০১৬ সালে প্রথম কেপ ভার্দের প্রতিনিধিত্ব করেন। পরে নিজ শহর নেদারল্যান্ডসের রটারডামে ২০২১ সালে ইসলাম গ্রহণ করেন। ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া তার সতীর্থ লোগান কোস্তা ও স্টিভেন মোরেইরাও পেশাদার ক্যারিয়ারের সময় একই পথে হাঁটেন।
নিজের আধ্যাত্মিক যাত্রার কথা বলতে গিয়ে লোগান কোস্তা বলেন: ছোটবেলা থেকেই ধর্ম নিয়ে আমার আগ্রহ ছিল। ইসলাম সম্পর্কে পড়তাম। পরে আমি একজন মুসলিম সতীর্থের সঙ্গে থাকতাম। সে আমাকে তার সঙ্গে নামাজ পড়তে উৎসাহিত করেছিল। তখনই আমি আমার ভেতরে এক ধরনের অনুভূতি উপলব্ধি করতে শুরু করি।
২৫ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডার আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২০ সালে ইসলাম গ্রহণ করেন।
৩১ বছর বয়সী স্টিভেন মোরেইরা, যিনি ২০২৪ সালে এমএলএস বর্ষসেরা ডিফেন্ডার নির্বাচিত হন, তিনিও প্রায় একই অভিজ্ঞতার কথা বলেন। তার ভাষায়: আমি রেঁনের একাডেমিতে ছিলাম এবং এক বন্ধুর সঙ্গে একই কক্ষে থাকতাম। আমরা একটি ভুল করেছিলাম। এরপর আমাদের আলাদা করে দেওয়া হয় এবং আমাকে একজন সিনিয়র খেলোয়াড়ের সঙ্গে রাখা হয়।
সেই সিনিয়র খেলোয়াড় ছিলেন এভারটনের সাবেক মিডফিল্ডার আবদুলাই দুকুরে, যিনি নিয়মিত ধর্মচর্চাকারী মুসলিম ছিলেন।
প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া এবং রমজানে রোজা রাখা দেখে মোরেইরার আগ্রহ জন্মায়। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি প্রশ্ন করতে শুরু করেন এবং শেষ পর্যন্ত নিজেও ইসলাম পালন শুরু করেন।
তিনি বলেন: আমার মনে হচ্ছিল আমার ভেতরে কিছু একটা পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু একটু ভয়ও লাগছিল, কারণ আমি তো এই ধর্মে বড় হইনি। পরিবার কীভাবে নেবে, তা জানতাম না… কিন্তু যখন আমি তাদের বললাম, তারা বলল, ‘তুমি এখন আরও ভালো মানুষ হয়েছ।’ আলহামদুলিল্লাহ।
২০২৩ আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে জামিরো মন্টেইরোর উদ্বোধনী গোলের পর এই তিনজন একসঙ্গে সিজদা করে উদযাপন করেছিলেন। তাদের এই বন্ধন জাতীয় দলের বৃহত্তর ঐক্যেরও প্রতিফলন।
এ বছরের টুর্নামেন্টে দলের অসাধারণ যাত্রা শুরু হওয়ার আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লোগান কোস্তা বলেন: আমরা মুসলিম হই বা খ্রিস্টান—আমাদের শক্তি হলো আমরা একসঙ্গে আছি। আমরা সবাই কেপ ভার্দিয়ান।
গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে আর্জেন্টিনাকে চমকে দেওয়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া এই দলটিতে তাদের এবং তাদের ধর্মীয় পরিচয়কে সম্মান করা হয়েছে। জাতীয় দল ও সতীর্থরা তাদের জন্য প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ও টুর্নামেন্টজুড়ে হালাল খাবারের ব্যবস্থা করেছে।
হাস্যকর হলেও সত্য, তাদের ভিন্ন ধর্মীয় পরিচয়কে দলটির ভেতরে কেবল ইউরোপে জন্ম ও বেড়ে ওঠার আরেকটি স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবেই দেখা হয়।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
Tags: ইংল্যান্ড, কেভভার্দে, বিশ্বকাপ-২০২৬, মুসলিম ফুটবলার, রুডিগার, লামিন ইয়ামাল, স্পেন