চেষ্টা করা, খোঁজা, খুঁজে পাওয়া এবং কখনো হার না মানা—কিন্তু এই দলের বিপক্ষে হয়তো তা যথেষ্ট ছিল না। আটলান্টার বিশাল, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গম্বুজের নিচে অবিরাম গর্জনের এক মহাকাব্যিক দিনে থেমে গেল ইংল্যান্ডের পথচলা। এই বিশ্বকাপের শেষ সীমায় এসে থমকে গেল তাদের যাত্রা। আর তার মূল কারণ ছিলেন একজনই—লিওনেল মেসি। যিনি অন্তত এভাবে, এত তাড়াতাড়ি বিদায় নেওয়ার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না।
ম্যাচের ৫৫ মিনিট পর্যন্ত ইংল্যান্ডই এগিয়ে ছিল। অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে তারা ১-০ ব্যবধানে লিড নিয়েছিল, সেটিই ছিল পুরো ম্যাচে তাদের সবচেয়ে পরিষ্কার ও সৃজনশীল মুহূর্ত। কিন্তু সেই মুহূর্তের পর যেন দলটি জীবন্ত সত্তা হিসেবেই মাঠ থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
ইংল্যান্ড এখানে খুবই বাজে খেলেছে। বদলি খেলোয়াড়রা কোনো প্রভাব ফেলতে পারেননি। হ্যারি কেইন যেন বিশ্বকাপের একটি সেমিফাইনালের বদলে মাঠে হালকা ব্যায়াম করতেই নেমেছিলেন।
তবে শেষ পর্যন্ত ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিল সেই পরিবর্তন—একটি এমন মুহূর্ত, যখন মনে হয় ঘড়ির কাঁটা উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করেছে, আকাশ অন্ধকার হয়ে এসেছে, অসম্ভবও যেন সম্ভব হয়ে উঠছে। আর স্টেডিয়ামের সমস্ত শক্তি, সমস্ত মনোযোগ ঘুরে জমা হচ্ছে গাঢ় নীল জার্সি পরা এক মানুষের চারপাশে।
মেসি। যিনি হাঁটা শুরু করেই অদ্ভুত, কষ্টদায়ক সব কাজ করতে শুরু করলেন। তিনি ফাঁকা জায়গাগুলোকে নিজের দিকে টেনে আনলেন, আশপাশের প্রতিটি বস্তু যেন তার ইচ্ছামতো ঘুরতে লাগল। প্রতিপক্ষের প্রতিরোধও যেন ধীরে ধীরে গলে যেতে লাগল।
হঠাৎ করেই মাঠের সবাই যেন প্রবেশ করল ‘মেসির মহাকর্ষক্ষেত্রে’।
৯১ মিনিটে গিয়ে স্কোর তখনও ১-১। এমন এক ফল, যা তখন আর বাস্তব মনে হচ্ছিল না, বরং যেন কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি, সাময়িকভাবে টাঙানো একটি সাইনবোর্ড। আর ঠিক তখনই শেষ আঘাতটি করলেন মেসি।
সেই সময় ইংল্যান্ড নিজেদের বক্সের সামনে এমনভাবে গুটিয়ে ছিল, যেন জাহাজডুবির পর বেঁচে যাওয়া ক্লান্ত নাবিকেরা শেষ শক্তিটুকু দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
এর ঠিক আগে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের নিচু শট পোস্টে লেগে ফিরে এসেছিল। ডিজেড স্পেন্স, যিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেছেন, একবারের জন্য মেসির সামনে গিয়ে বল কেড়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু সেই বল যেন তার কাছে শুধু ধারেই ছিল।
স্পেন্স ও নিকো ও’রাইলি এই দুই ফুল-ব্যাককে সামনে রেখে মেসি নিঃশব্দে ঢুকে পড়লেন সেই ফাঁকা জায়গায়, যেখানে তৃতীয় একজন ডিফেন্ডার থাকার কথা ছিল। ছোট্ট সেই সবুজ ঘাসের অংশ যেন কেবল তার জন্যই সংরক্ষিত ছিল।
তার ডান পায়ের ক্রসটি ছিল নিখুঁত, পরিমিত এবং বুদ্ধিদীপ্ত। বলটি এমনভাবে ভেসে এল সবচেয়ে যৌক্তিক জায়গায়, যেন কেউ ধৈর্য ধরে একটি কঠিন গণিতের সমস্যা বুঝিয়ে দিচ্ছে। এক মুহূর্তের জন্য বলটি আকাশে স্থির হয়ে রইল—নরম, সাদা, নিখুঁত একটি গোলকের মতো। সময় যেন ধীর হয়ে গেল। স্টেডিয়ামের সবাই যেন সেই মুহূর্তে মেসি হয়ে উঠলো—ঘটনার আগেই যা ঘটতে যাচ্ছে, তা দেখে ফেললো।
তারপর সময় আবার এগিয়ে চললো। লাউতারো মার্তিনেজ মাথা ছুঁইয়ে বল পাঠিয়ে দিলেন ছড়িয়ে পড়া জর্ডান পিকফোর্ডকে পরাস্ত করে ইংল্যান্ডের জালে এবং সেটিই ছিল সমাপ্তি।
মেসি যখন এই ম্যাচের শেষ অধ্যায়টি স্পষ্ট দেখতে শুরু করেছিলেন, যখন তিনি বুঝে ফেলেছিলেন কোন বাধাগুলো আর নেই, তখন থেকেই এই পরিণতি যেন অবধারিত হয়ে উঠেছিল। সামনে থাকা প্রতিটি বিন্যাসের ওপর তিনি নিজের পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করলেন।
শেষদিকে ইংল্যান্ডের কাছ থেকে কিছু মরিয়া প্রচেষ্টা দেখা গেল। কিন্তু তা ছিল যেন ইংল্যান্ডের ফুটবলের বহুবার দেখা পুরোনো নাটকের পুনরাবৃত্তি। ড্যান বার্ন আর্জেন্টিনার বক্সে উঁচু বলের নিচে নিজের শরীর ছুড়ে দিচ্ছিলেন, তারপর ওপরের তলা থেকে ছুড়ে ফেলা ডাবল ম্যাট্রেসের মতো মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিলেন। কিন্তু ম্যাচ তখন শেষ।
ইংল্যান্ড এই উপলক্ষের সামনে নিজেকে ছোট করে ফেলেছিল। তারা যখন চাপ সৃষ্টি করতে পারতো, তখন তা করেনি। শেষ পর্যন্ত তারা পরাস্ত হয়েছে শুধু ফুটবল নয়, এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বের আভা ও প্রতিভার কাছে, যে প্রতিভা তার অপেক্ষাকৃত নিস্তেজ কিংবা এলোমেলো দিনেও শেষ পর্যন্ত নিজের ছন্দ খুঁজে নেয়।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে স্টেডিয়ামজুড়ে গর্জে উঠলো অবিরাম উল্লাস। তবু মেসি তখনও হাঁটছিলেন। সতীর্থদের মাটিতে লুটিয়ে থাকা শরীরের ফাঁক গলে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, দু’মুঠো হাত আকাশের দিকে ছুড়ে দিচ্ছিলেন উচ্ছ্বাসে—সেই উত্তাপ আর আলোর মাঝখানে।
ইংল্যান্ড নিঃসন্দেহে খুব খারাপ খেলেছে। এমন একটি সেমিফাইনাল, যা তারা কার্যত নিজেরাই হাতছাড়া করেছে। তাদের খেলায় ছিল না আক্রমণের ধার, ছিল না শক্তি, ছিল না সেই বিশ্বাস যে দিনটিকে নিজেদের করে নেওয়ার সামর্থ্য তাদের আছে।
পরে অবশ্য বিশ্লেষণের সময় আসবে। কোথায় ভুল হয়েছে, কোন জায়গায় ভাঙন ছিল, দল নির্বাচন থেকে শুরু করে বড় মঞ্চে এসে বারবার আলোয় চোখ ঝাপসা হয়ে যাওয়ার পুরোনো সমস্যাগুলো, সবই আলোচনায় আসবে।
কিন্তু এই দিনটি ছিল মেসির। এই মুহূর্তটিও ছিল মেসির। এখন তিনি খেলবেন নিজের তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল। এই মঞ্চে নামা ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক আউটফিল্ড খেলোয়াড় হিসেবে এবং সম্ভবত সর্বকালের সেরাও।
এবারের যাত্রাটা আবারও আলাদা ছিল। ফাইনালে ওঠার এই টানটান অভিযাত্রায় মেসির মধ্যে নতুন কিছু দেখা গেছে। কখনও মনে হয়েছে তিনি যেন কোনো গভীর উপলব্ধির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন, হঠাৎ ঘুম ভেঙে জেগে ওঠা এক মানুষের মতো।
মেসির সবসময়ই একটি অনন্য সুবিধা ছিল, যা অন্য কোনো ফুটবলারের নেই। তিনি প্রতিটি ম্যাচেই মেসির সঙ্গে খেলেন। আর মেসি তার দলের প্রতিটি খেলোয়াড়কে আরও ভালো করে তোলেন। তিনি যেন আলাদা এক মহাকর্ষক্ষেত্র তৈরি করেন, যার আলোয় সতীর্থরাও উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন। আর তিনি সবসময়ই সবচেয়ে বেশি আনন্দ পান, কারণ প্রতিটি ম্যাচই তার কাছে একটি ‘মেসি ম্যাচ’।
একবার ভাবুন, এমন একজন ফুটবলার, যিনি জীবনে কখনও এমন কোনো ম্যাচ খেলেননি যেখানে মেসি ছিলেন না। তার কাছে প্রতিটি দিনই মেসির দিন। ফুটবলকে তিনি এত ভালোবাসেন, এতে আর আশ্চর্যের কী আছে!
দর্শক হিসেবে কখনও কখনও ইচ্ছে করে তার কাঁধে আলতো চাপ দিয়ে বলা যায়: তুমি তো জানো, সবার জন্য কিন্তু ফুটবল সবসময় এমন হয় না, তাই না?
ইংল্যান্ড কীভাবে মেসিকে সামলাবে? এই প্রশ্ন ছিল ম্যাচের অন্যতম বড় আলোচ্য বিষয়। কারণ মেসিকে ঘিরেই সবসময় পরিকল্পনা হয়, কৌশল সাজানো হয়, পুরো ম্যাচের রূপরেখা আঁকা হয়।
থমাস টুখেল শক্তি ও গতির ওপর ভরসা রেখে ডান প্রান্তে মর্গান রজার্সকে খেলান। আর মেসিকে থামানোর বিশেষ পরিকল্পনায় বাঁ-প্রান্তের ডিফেন্ডার হিসেবে বেছে নেন ডিজেড স্পেন্সকে,যিনি সাম্প্রতিক ফর্ম, লড়াকু মানসিকতা এবং সমর্থকদের ভালোবাসায় এই ইংল্যান্ড দলের অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
অ্যাটলান্টা স্টেডিয়াম সত্যিকারের এক শহরের কেন্দ্রস্থলের ভেন্যু। সুউচ্চ ভবন আর কাচে মোড়া অট্টালিকার সারির মাঝখান থেকে এটি যেন হঠাৎ উদ্ভাসিত হয়েছে, একটি বিশাল, খাঁজকাটা রুপালি উল্কাপিণ্ড, যা এসে আছড়ে পড়েছে শহরের বুকের ওপর।
কিক-অফের মুহূর্তে রং আর আকৃতির সেই সমাহার ছিল যেন সম্মোহিত করার মতো। গাঢ় নীল, সাদা, লাল আর সোনালি রঙের ব্লকগুলো এত নিখুঁতভাবে একে অপরের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল যে দৃশ্যটি চোখ সরানো কঠিন করে তুলেছিল। কিক-অফের আগে বাজানো জাতীয় সংগীতগুলোও ছিল নিখাদ আবেগের বহিঃপ্রকাশ, এক ধরনের অস্পষ্ট অথচ তীব্র বিদ্যুতায়িত উত্তেজনা।
খেলা শুরু হওয়ার মাত্র এক মিনিট ২০ সেকেন্ডের মাথায় জুড বেলিংহ্যামকে শক্ত ট্যাকলে মাটিতে ফেলে দেন লিয়ান্দ্রো পারেদেস। ঘটনাটি যেন ছিল এক অনিবার্য আনুষ্ঠানিকতা, ঠিক যেমন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরু হওয়ার ঘোষণা দিতে ব্ল্যাক রড উপস্থিত হন।
লিওনেল মেসির প্রথম স্পর্শেই দেখা গেল তার চিরচেনা জাদু। গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে থাকা খেলোয়াড়দের ভিড় চিরে তিনি এগিয়ে গেলেন, যেন সব সময়ের মতোই অন্য সবার থেকে ভিন্ন এক সময় ও স্থানের মাত্রায় খেলছেন। এরপর তিনি পড়ে গেলেন। ফাউল দেওয়া হলো না। সঙ্গে সঙ্গে ক্ষোভের বিস্ফোরণ। প্রায় একই মুহূর্তে পারেদেস অ্যান্ডারসনকে কঠোর ট্যাকলে ফেলে দেন এবং হলুদ কার্ড দেখেন। এরপরই শুরু হলো জার্সির ভিড়, খেলোয়াড়দের মুখোমুখি হওয়া, ম্যাচের সেই আনুষ্ঠানিক সংঘর্ষের নৃত্য।
এরপর থেকেই যেন খেলা আর স্বাভাবিক ছন্দে এগোয়নি। প্রথমার্ধে ইংল্যান্ডের সামনে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করার এবং আরও বেশি উদ্যমে আক্রমণে ওঠার সুযোগ ছিল। অন্যদিকে, মেসি যেন নিজের ছন্দেই হাঁটছিলেন, খেলার প্রান্তঘেঁষে অবস্থান করছিলেন, এমন একজন ফুটবলার, যার জন্য যেন খেলাটাই প্রায়শই অপেক্ষা করে থাকে।
কিন্তু ইংল্যান্ড যখন সুযোগ পেয়েছিল, তখন ফাঁকা জায়গায় দ্রুত ঢুকে পড়তে পারেনি। তারা এগিয়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই লিড বেশিক্ষণ টিকল না। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সবকিছু বদলে যেতে শুরু করল, যখন মেসি অদৃশ্য সুতোয় খেলার নিয়ন্ত্রণ টানতে শুরু করলেন। তিনি একের পর এক সাদা জার্সি এড়িয়ে ভেসে গেলেন, আর তার পা থেকে বের হতে লাগল সেই নিখুঁত, বাঁক নেওয়া, প্রতিপক্ষের জন্য সর্বনাশা পাসগুলো।
শেষ বাঁশি বাজার সময় মনে হচ্ছিল, যেন একই সঙ্গে দুটি সত্য সামনে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে ছিল এমন এক ইংল্যান্ড দল, যারা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সাহস হারিয়েছে এবং কোচের তাগিদে সাড়া দিতে পারেনি। অন্যদিকে ছিল মেসির অনিবার্যতা। ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা প্রতিভা, যিনি এখনও এই মঞ্চে হেঁটে বেড়ান, আর এখনও পরাজয় মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত নন।
দ্য গার্ডিয়ানে ইংরেজ সাংবাদিক , লেখক ও গার্ডিয়ানের চিফ স্পোর্টস রাইটার বার্নি রোনের লেখা থেকে ।
Tags: আর্জেন্টিনা, বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬, মেসি, লিওনেল মেসি