প্রতিদিন ১০,০০০ স্টেপ হাঁটা স্বাস্থ্য ভালো রাখার একটি পরিচিত লক্ষ্য। কিন্তু সবার পক্ষে প্রতিদিন ১০,০০০ স্টেপ হাঁটা সম্ভব হয় না। সময়ের অভাব, শারীরিক সক্ষমতা বা দৈনন্দিন ব্যস্ততার কারণে অনেকেই এতটা হাঁটতে পারেন না। তবে নতুন একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু কতগুলো স্টেপ হাঁটছেন সেটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়; কত দ্রুত হাঁটছেন, সেটিও স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?
গবেষকরা যুক্তরাজ্যের ৬৪,০০০-এর বেশি মানুষের হাঁটা ও শারীরিক কর্মকাণ্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। এসব মানুষের গড় বয়স ছিল প্রায় ৬২ বছর। এরপর প্রায় ৮ বছর ধরে তাদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন ৫,০০০-এর কম স্টেপ হাঁটতেন, কিন্তু হাঁটার সময় তুলনামূলকভাবে দ্রুত হাঁটতেন, তাদের মৃত্যুঝুঁকি ধীরে হাঁটা মানুষের তুলনায় কম ছিল। দ্রুত হাঁটা ৫,০০০-এর কম স্টেপ হাঁটা মানুষের ঝুঁকি এমন মানুষের কাছাকাছি ছিল, যারা ধীরে ধীরে ৫,০০০–৭,৫০০ স্টেপ হাঁটতেন।
তবে সামগ্রিকভাবে যারা প্রতিদিন প্রায় ৭,৫০০–১০,০০০ স্টেপ হাঁটতেন, তাদের মৃত্যুঝুঁকি সবচেয়ে কম দেখা গেছে।
তবে মনে রাখতে হবে, এটি একটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা। তাই দ্রুত হাঁটার কারণেই মৃত্যুঝুঁকি কমেছে—এ কথা গবেষণাটি সরাসরি প্রমাণ করে না।
তাহলে কি ১০,০০০ স্টেপ হাঁটা জরুরি নয়?
১০,০০০ স্টেপের সংখ্যা নিয়ে অনেক দিন ধরে আলোচনা হয়ে আসছে। কিন্তু এই সংখ্যাটি আসলে কোনো নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে তৈরি হয়নি। ১৯৬০-এর দশকে জাপানে একটি পেডোমিটার (স্টেপ মাপার যন্ত্র) প্রচারণার মাধ্যমে ১০,০০০ স্টেপের ধারণাটি জনপ্রিয় হয়।
বর্তমান গবেষণাসহ আগের অনেক গবেষণা থেকে বোঝা যায়, স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য প্রতিদিন অবশ্যই ১০,০০০ স্টেপ পূরণ করতে হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। কতটা হাঁটছেন এবং কতটা দ্রুত হাঁটছেন—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।
দ্রুত হাঁটার উপকার কী?
দ্রুত হাঁটলে আমাদের হৃদস্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাস বেড়ে যায়। নিয়মিত এভাবে হাঁটলে শরীরের হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের কর্মক্ষমতা ভালো হতে পারে।
হৃদ্যন্ত্র শক্তিশালী হলে শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্ত ও অক্সিজেন আরও ভালোভাবে পৌঁছাতে পারে। নিয়মিত হাঁটা রক্তনালির নমনীয়তা বজায় রাখতে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতেও সাহায্য করতে পারে।
সহজভাবে বলা যায়, স্টেপের সংখ্যা বলে আপনি কতটা হাঁটেছেন, আর হাঁটার গতি বলে আপনার শরীর কতটা পরিশ্রম করেছে।
সময় কম থাকলে কী করবেন?
আপনার যদি দীর্ঘ সময় হাঁটার সুযোগ না থাকে, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যে একটু দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করতে পারেন। যেমন- প্রতিদিনের স্বাভাবিক হাঁটার পথটি একটু দ্রুত হাঁটুন। কিছু সময় স্বাভাবিক গতিতে এবং কিছু সময় দ্রুত গতিতে হাঁটুন। সম্ভব হলে হাঁটার পথে সামান্য উঁচু জায়গা বা সিঁড়ি যুক্ত করতে পারেন। ধীরে ধীরে হাঁটার সময় বা স্টেপের সংখ্যা বাড়াতে পারেন। একই সঙ্গে হাঁটার গতি কিছুটা বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন।
তবে হঠাৎ খুব বেশি পরিশ্রম না করে ধীরে ধীরে গতি ও হাঁটার পরিমাণ বাড়ানো ভালো।
কীভাবে বুঝবেন হাঁটার গতি ঠিক আছে?
এক্ষেত্রে একটি সহজ পদ্ধতি হলো “Talk Test” বা কথা বলার পরীক্ষা। মাঝারি গতিতে হাঁটার সময় আপনি সাধারণভাবে কথা বলতে পারবেন, কিন্তু স্বাভাবিকভাবে গান গাওয়া কিছুটা কঠিন মনে হতে পারে। আরেকটু দ্রুত হাঁটলে আপনার শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃদস্পন্দন বাড়বে, তবে আপনি এখনও কয়েকটি পূর্ণ বাক্যে কথা বলতে পারবেন।
সবার জন্য একই লক্ষ্য নয়
সবার শারীরিক সক্ষমতা একরকম নয়। বয়স, শারীরিক সক্ষমতা, চলাফেরার ক্ষমতা এবং স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর ভিত্তি করে একজন মানুষের জন্য উপযুক্ত হাঁটার পরিমাণ ও গতি অন্যজনের চেয়ে আলাদা হতে পারে। তাই ঘড়ি বা মোবাইলে ১০,০০০ স্টেপ পূরণ করতেই হবে-এমন চিন্তা করার প্রয়োজন নেই।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়মিতভাবে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চলাফেরা করা। যারা অনেকক্ষণ হাঁটার সময় পান না, তারা অল্প সময়ের মধ্যে একটু দ্রুত হাঁটতে পারেন। আবার যারা বেশি সময় পান, তারা ধীরে ধীরে হাঁটার সময় ও স্টেপের সংখ্যা বাড়াতে পারেন।
মূল কথা, ১০,০০০ স্টেপ একটি বাধ্যতামূলক সংখ্যা নয়। আপনি যদি ১০,০০০ স্টেপ হাঁটতে না পারেন, তবুও নিয়মিত হাঁটা আপনার জন্য উপকারী হতে পারে।
যতটা সম্ভব নিয়মিত হাঁটুন, সুযোগ হলে কিছু সময় একটু দ্রুত হাঁটুন, ধীরে ধীরে হাঁটার সময়, স্টেপ বা গতি বাড়ান, নিজের বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী লক্ষ্য ঠিক করুন।
অর্থাৎ, “১০,০০০ স্টেপ পূরণ করতেই হবে”-এর চেয়ে “নিয়মিতভাবে হাঁটা এবং সুযোগমতো একটু দ্রুত হাঁটা” বেশি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হতে পারে।
নোট: আপনার কোনো শারীরিক সমস্যা বা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত অবস্থা থাকলে হাঁটার গতি বা ব্যায়ামের মাত্রা বাড়ানোর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক