জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ নিয়ে কঠোর অবস্থান তুলে ধরেছেন। প্রায় ৩৭ মিনিটের ভাষণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সাফল্যের কথা তুলে ধরার পাশাপাশি বিদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আসা নানা ধরনের হুমকির বিষয়েও আলোকপাত করেন। একই সঙ্গে তিনি জাতিসংঘের সমালোচনা করেন এবং এআই খাতের বিকাশে অতিরিক্ত সরকারি নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করেন।
মঙ্গলবার ম্যানহাটনে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের হুমকি মেনে নেবে না। প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দেশটির সামরিক শক্তি ব্যবহারের কথাও জানান তিনি।
ইরান নিয়ে কঠোর বার্তা
ভাষণে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন ট্রাম্প। তিনি অভিযোগ করেন, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির দিকে ‘উন্মত্ত গতিতে’ এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আত্মরক্ষার নামে বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার গড়ে তুলছিল।
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত আট মাসে গড়ালেও এর কোনো সমাধান বা সমাপ্তির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না—এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প বলেন, তিনি একটি ‘বড় সিদ্ধান্তের’ অপেক্ষায় রয়েছেন। তার ভাষায়, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হতে পারে, অথবা দেশটিকে দ্রুত ‘ধ্বংস’ করে দেওয়ার পথ বেছে নেওয়া হতে পারে।
তবে ট্রাম্প আবারও দাবি করেন, আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক পরপরই ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হতে পারে। তিনি বলেন, চুক্তি না করার কোনো যৌক্তিক কারণ ইরানের নেই।
ট্রাম্প বলেন, “তারা দেখছে মধ্যবর্তী নির্বাচনে আমি কেমন ফলাফল করি। কিন্তু তারা যা বুঝতে পারছে না তা হলো, আমি তো নির্বাচনে লড়ছি না।”
ইরান বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচন কোনো ভূমিকা রাখছে না বলেও দাবি করেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, “ইরানের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আমি নির্বাচনকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দিইনি এবং ভবিষ্যতেও দেব না। বিষয়টি আমার চিন্তাতেই আসে না। আমার একমাত্র ভাবনা হলো, ইরানের হাতে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না।”
গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের সঙ্গে সামরিক চুক্তি
ভাষণে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহযোগিতার বিষয়টিও তুলে ধরেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আমেরিকান মহাদেশের পাশাপাশি ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চল রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আরও সক্ষমতা অর্জন করবে।
এর আগে মঙ্গলবার সকালে অনুষ্ঠিত একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে এ-সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে জানান তিনি।
কিউবা ও ভেনেজুয়েলা প্রসঙ্গ
কিউবার বিরুদ্ধেও কঠোর বক্তব্য দেন ট্রাম্প। তিনি দেশটিকে একটি ‘সম্পূর্ণ ব্যর্থ রাষ্ট্র’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং অভিযোগ করেন, কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের ‘বামপন্থী উগ্রবাদী ও কমিউনিস্ট নেটওয়ার্কগুলোর সঙ্গে সমন্বয়’ করে কাজ করছে।
বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, “আমেরিকায় কখনোই কমিউনিজম আসবে না, তবে কিউবায় স্বাধীনতা আসবে।”
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিউবার সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ট্রাম্পের বক্তব্যের সময় কিউবার প্রতিনিধিদল জাতিসংঘের হল থেকে বেরিয়ে যায়।
পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে—এমন কোনো বিষয়কে আর প্রশ্রয় দেওয়া হবে না বলেও সতর্ক করেন ট্রাম্প। এ প্রসঙ্গে তিনি ভেনেজুয়েলায় তার প্রশাসনের এ বছরের হস্তক্ষেপের বিষয়টি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “এবং প্রয়োজনে, যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আমরা আমাদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক শক্তি ব্যবহার করব।”
এআই নিয়ে নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা
ভাষণের শেষ দিকে ট্রাম্প কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে তার অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি এআইকে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ বা ‘অতি-বুদ্ধিমত্তা’ হিসেবে উল্লেখ করার চেষ্টা করেন এবং এই প্রযুক্তির বিকাশে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ বা বিধিনিষেধ আরোপের বিরোধিতা করেন।
এআই নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশকারীদের সমালোচনা করে ট্রাম্প বলেন, তাদের কেউ কেউ মনে করছেন এআই মানুষের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তিনি এ ধরনের আশঙ্কাকে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সতর্কবার্তার সঙ্গে তুলনা করেন।
ট্রাম্প বলেন, “এরাই সেই লোক যারা এখন বলছে যে এআই আমাদের সবাইকে ধ্বংস করে দেবে, রোবটরা আমাদের ওপর হামলা চালাবে এবং সবকিছু এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।”
তার মতে, এআই প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব ধরে রাখা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব বজায় রাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি বলেন, যারা এ প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকবে, তারাই ভবিষ্যতে এগিয়ে থাকবে।
ট্রাম্প দাবি করেন, এআই প্রযুক্তির দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে চীন ও অন্য দেশগুলোর তুলনায় এগিয়ে রয়েছে এবং এই অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করবে।
তিনি বলেন, “শিল্প বিপ্লবের চেয়েও বিশাল কোনো কিছুর বিকাশকে আমি রুদ্ধ করব না।”
তবে প্রয়োজন হলে সরকার পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রণে আনবে’ এবং এআই খাতকে ‘নিরাপদ ও দায়িত্বশীলভাবে’ পরিচালনার ব্যবস্থা করবে বলেও জানান তিনি।
শেষদিকে ট্রাম্প বলেন, “আমরা কেবল ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ বা অতি-বুদ্ধিমত্তার বিকাশকেই উৎসাহিত করব। আমরা একে উৎসাহিত করব, নিয়ন্ত্রণ বা রুদ্ধ করব না।”
জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্পের বক্তব্যে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা, পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন স্বার্থ রক্ষা এবং এআই প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ধরে রাখার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের কার্যক্রম নিয়েও তিনি সমালোচনামূলক অবস্থান তুলে ধরেন।
বিটি/ আরকে
Tags: ইরান, এআই, জাতিসংঘ, ট্রাম্প, বার্তা, বৈশ্বিক নিরাপত্তা, ভাষণ