যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বিশাল জয় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির নীতি এবং গত দুই বছরের কার্যক্রমের প্রতি সাধারণ ভোটারদের স্পষ্ট অনাস্থার চিত্র তুলে ধরেছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আমেরিকার রাজনীতির কেন্দ্রে থাকা ট্রাম্পের জন্য কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের এই ভরাডুবি এক বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা দিয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঢেউ এবার রিপাবলিকানদের ঐতিহ্যগত শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অঙ্গরাজ্যগুলোতেও আছড়ে পড়েছে, যার ফলে যেসব ভোটার জোট দুবার ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসে পৌঁছে দিয়েছিল, সেখানেও বড় ধরনের ফাটল দেখা যাচ্ছে। রিপাবলিকানদের হারে ইরান যুদ্ধের প্রভাব স্বীকার করলেন ট্রাম্প। কাতারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি নিতে চায় ভারত। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করা মানুষদের বিরুদ্ধে কঠোর ধরপাকড় দেখে তাঁরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। অথচ এসব উদ্যোগ নিয়ে ভোটারদের বিরক্তির লক্ষণ আগেই দেখা যাচ্ছিল। শাহজালালে পরিত্যক্ত বিমান ভাঙারি হিসেবে বিক্রির উদ্যোগ।
নির্বাচনী প্রচার চলাকালে ট্রাম্প ভোটারদের উদ্দেশ্যে বারবার বলেছিলেন, তারা যেন ব্যালটে তাঁর নাম আছে মনে করেই ভোট দেন। নিউ ইয়র্ক টাইমস বুধবার (৪ নভেম্বর) জানায়, মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারে ট্রাম্প ভোটারদের বারবার বলেছিলেন, ‘এমনভাবে ভোট দিন, যেন ব্যালটে আমার নাম আছে।
চলতি শরতে অন্তত ৪৭ বার তিনি এই কথার পুনরাবৃত্তি করেন এবং নিজের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের এক বড় হাতিয়ারে পরিণত করেন এই নির্বাচনকে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের হোয়াইট হাউসবিষয়ক প্রধান সংবাদদাতা পিটার বেকার তাঁর বিশ্লেষণমূলক নিবন্ধ ‘হিস্টোরিক মিডটার্ম রাউট সার্ভস অ্যাজ আ সুইপিং রিপিউক অব ট্রাম্প এরা’-তে উল্লেখ করেন, ট্রাম্প যেভাবে মধ্যবর্তী নির্বাচনকে নিজের মেয়াদের ওপর গণভোট বানিয়েছেন, অতীতে আর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট এমনটা করেননি। ১৯৮৬ সাল থেকে মধ্যবর্তী নির্বাচন কভার করা এই সাংবাদিকের মতে, এই ফল ট্রাম্পের রাজনৈতিক ধারার ওপর ভোটারদের সরাসরি অনাস্থা। এ বছর তাদের প্রধান পরিচয় ছিল ট্রাম্পবিরোধিতা।
জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এবং ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে ক্ষমতায় থেকে বিপুল অর্থ উপার্জনের অভিযোগের কারণে ভোটারদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছিল। বুধবার ভোর পর্যন্ত পাওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদের আসনগুলোতে জাতীয়ভাবে ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকানদের চেয়ে প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি ভোট পেতে পারে। পরিসংখ্যান বলছে, অন্তত ১৯৭৬ সালের পর কংগ্রেস নির্বাচনে কোনো দল এত বড় ব্যবধানে জয় অর্জন করতে পারেনি। ১৯৯৪ সালে বিল ক্লিনটন ও ২০১০ সালে বারাক ওবামার মেয়াদে রিপাবলিকানরা যে বড় জয় পেয়েছিল, এবার ডেমোক্র্যাটদের ভোটের ব্যবধান সেটিকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তবে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের কারণে রিপাবলিকানরা নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করে রেখেছিল, ফলে বিশাল ভোটের পার্থক্য সত্ত্বেও আসন সংখ্যায় তার প্রতিফলন শতভাগ নাও দেখা যেতে পারে। তা সত্ত্বেও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে রিপাবলিকানরা। ডেমোক্র্যাটদের এই বিশাল সাফল্য আমেরিকান রাজনীতিতে এক বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের রাজনৈতিক পরিচালক ডগলাস বি. সোসনিক এই ফলের বিশ্লেষণ করে বলেন, এটি মূলত ট্রাম্প, রিপাবলিকান পার্টি এবং তাদের বিগত দুই বছরের কর্মকাণ্ডের ওপর সরাসরি ভোটারদের প্রত্যাখ্যান। তাঁর মতে, নির্বাচনের পরদিন থেকেই মার্কিন রাজনীতি এক নতুন যুগে প্রবেশ করবে এবং আগামী দুবছর হবে বড় ধরনের পরিবর্তনের সময়। পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা একজন বহিরাগত নেতার ওপর যারা একসময় আস্থা রেখেছিলেন, তাঁদের অনেকেই এবার তাঁর দলকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। নিজেদের সুবিধামতো নির্বাচনী এলাকার সীমানা সাজিয়ে নেয়ায় এখন বিরোধী দলের পক্ষে অন্য দলের আসন কেড়ে নেয়া আগের চেয়ে কঠিন। ভোক্তাদের খরচ বাড়িয়ে দেয়া শুল্কনীতির বিরুদ্ধেও তাঁদের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে নির্বাচনের ফল পরিষ্কার হওয়ার পর থেকেই নিজের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি রক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেছেন, ডেমোক্র্যাটদের কাছে এই পরাজয় কোনোভাবেই তাঁর বিরুদ্ধে ভোটারদের রায় হতে পারে না। মঙ্গলবার রাতে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি তো ব্যালটে ছিলাম না। আর ব্যালটে সরাসরি আমার নাম না থাকায় ভোটারদের পর্যাপ্ত সংখ্যায় কেন্দ্রমুখী করা সম্ভব হয়নি।’ ট্রাম্পের এমন যুক্তি দলের ভেতরের অনেক রিপাবলিকান নেতা ও সমর্থকের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি করেছে, কারণ পুরো প্রচার পর্বটিই কার্যত আবর্তিত হয়েছিল তাঁকে কেন্দ্র করে। এখন সেই সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হচ্ছে তাঁকে। তাঁর এই বক্তব্য শুনে অনেক রিপাবলিকানও বিরক্তি প্রকাশ করবেন। ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার আগে গ্রোগান বলেন, ‘আজ রাতে যা-ই ঘটুক, আমরা এখনো ট্রাম্পের দলেই আছি। তাঁর কাছ থেকে দূরত্ব তৈরির সাহস অনেক রিপাবলিকান প্রার্থী দেখাতে পারেননি। তুলনামূলক বেশি জয়ের সম্ভাবনা থাকা প্রার্থীদের বাদ দিয়ে তিনি কেন প্যাক্সটন ও ডারলিন গ্রাহামকে বেছে নিয়েছিলেন, এখন সেই সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তবে ইতিহাসে এমন অনেক উদাহরণ আছে, যখন এ ধরনের পরিবর্তন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কারণ, ট্রাম্প দলটিকে নিজের আদলে নতুন করে গড়ে তুলেছেন।
ইরানের বিপক্ষে যুদ্ধ শুরু করার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে অস্থিরতা দেখা দেয়, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে পেট্রল ও ডিজেলের দাম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া প্রেসিডেন্ট পদে থেকে ব্যক্তিগতভাবে অর্থ উপার্জনের যে নৈতিক প্রশ্নগুলো উঠেছিল, ট্রাম্প সেগুলো এড়িয়ে গেছেন, যা ভোটারদের মনে দুর্নীতি বিষয়ে দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে দেয়। প্রচারের শুরু থেকে তিনি দলের প্রার্থীদের কাছ থেকে নিঃশর্ত আনুগত্য দাবি করেছিলেন। কিন্তু টেক্সাস ও সাউথ ক্যারোলাইনার মতো শক্ত ঘাঁটিতে তাঁর পছন্দের দুই সিনেট প্রার্থীর পরাজয় প্রমাণ করেছে যে ট্রাম্পের একক হস্তক্ষেপ কতটা ক্ষতির কারণ হয়েছে।
আমেরিকান ভোটারদের এক বড় অংশ জানিয়েছে, ট্রাম্প তাদের যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা রক্ষা করতে পারেননি। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমানো বা নতুন কোনো যুদ্ধ না শুরু করার কথা থাকলেও বাস্তবে তার বিপরীত ঘটেছে। নির্বাচনের আগের দিন ট্রাম্পের দেওয়া শেষ ভাষণেও ওয়াশিংটনে তাঁর পছন্দের ব্যক্তিগত নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে অতিরিক্ত আগ্রহের বিষয়টি উঠে আসে। অথচ জীবনযাত্রার আকাশছোঁয়া ব্যয় নিয়ে সাধারণ মানুষের চরম উদ্বেগের সময়ে ট্রাম্পের এমন অবস্থান ভোটারদের থেকে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার দূরত্বকেই স্পষ্ট করে তুলেছিল। জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগ কমানোর পরিকল্পনার কথা বলার বদলে তিনি ওয়াশিংটনের রিফ্লেক্টিং পুলের সামনে দাঁড়িয়ে শেওলা ও পানির পাইপ নিয়ে কথা বলেন।
ট্রাম্পের এই বিপর্যয়কে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউসিএলএ) অধ্যাপক লিন ভ্যাভরেক জানান, এই ফল ইঙ্গিত দেয় ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের মতো আকর্ষণীয় ভাবমূর্তি কিছুটা ফিকে হয়ে এসেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ‘মাগা’ (এমএজিএ) জোট পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে কিংবা অভিবাসন ও বৈচিত্র্যের মতো বিষয়ে পার্টি তার নীতি বদলে ফেলবে। ফোর্ডহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ক্রিস্টিনা এম. গ্রিয়ার মন্তব্য করেন, প্রেসিডেন্সির এই ধাক্কায় ট্রাম্প ঠিক কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন তা এখনই বলা শক্ত, তবে তাঁর রাজনৈতিক ধারা পিছু হঠলেও আগামী দুবছর হোয়াইট হাউসের ক্ষমতা ট্রাম্পের হাতেই থাকছে।
তবে ট্রাম্প সমর্থকরা এখনই হাল ছাড়তে নারাজ। অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে সোচ্চার সংগঠন ‘ক্লাব ফর গ্রোথ’-এর প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যাকিনটোশ উল্লেখ করেন, ট্রাম্পের সমালোচকেরা অতীতেও বহুবার তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি ঘোষণা করেছিলেন, কিন্তু তিনি প্রতিবারই ফিরে এসেছেন। রিপাবলিকান পার্টি যদি তাদের মূলনীতিতে ফিরে যেতে পারে, তবে ২০২৮ সালের নির্বাচনে পুনরায় জেতা সম্ভব। একইভাবে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের অভ্যন্তরীণ নীতিবিষয়ক উপদেষ্টা জো গ্রোগান বলেন, নির্বাচনের ফল যাই হোক, রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক কাঠামো বদলে দিয়েছেন ট্রাম্প। ভোটগ্রহণের দিন তিনি দাবি করেন, ট্রাম্পের রাজনীতি বাদ দিয়ে দলের পুরনো অবস্থায় ফেরার কোনো সুযোগ নেই। ২০২৮ সালের নির্বাচনে জিততে হলে সেটিই হবে পথ। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির শঙ্কায় সতর্ক অবস্থানে উপসাগরীয় দেশগুলো: দ্য গার্ডিয়ান।
আমেরিকার রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের জয় পেলেই যে সংশ্লিষ্ট দলের ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হয়ে যায় তা নয়। ১৯৭৪ সালে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর ডেমোক্র্যাটরা বিশাল জয় পেলেও তার মাত্র ছয় বছরের মাথায় রোনাল্ড ট্র্যোগান বড় ব্যবধানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালের সেই নির্বাচনে প্রথমবার বিজয়ী হওয়া প্রাক্তন কংগ্রেসম্যান জেমস ব্ল্যানচার্ড বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে পুরনো রাজনৈতিক ধারায় আর ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। একইভাবে ১৯৯৪ ও ২০১০ সালে রিপাবলিকানরা বিপুল জয় পেলেও তার দুই বছর পরেই ক্লিনটন ও ওবামা সহজেই দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য পুনরায় নির্বাচিত হয়েছিলেন।
শিকাগোর সাবেক ডেমোক্র্যাট মেয়র এবং সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত রাহম ইমানুয়েলের মতে, এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো ট্রাম্পের অন্ধ সমর্থক নন এমন সাধারণ রিপাবলিকান ভোটারদের দল থেকে সরে আসা। অন্যদিকে, ১৯৭৬ সালের পর ডেমোক্র্যাটদের এই ঐতিহাসিক জয়ের ফলে দলটির নিজস্ব নীতি ও কৌশল নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হতে পারে। আগামী দুবছরে ডেমোক্র্যাটরা কীভাবে এই জয়কে ব্যবহার করবে, তার ওপর নির্ভর করবে ২০২৭ সাল ও তার পরবর্তী মার্কিন রাজনৈতিক চিত্র। ২০২৭ সালে আমরা কী করব, তার ওপরই সেটি নির্ভর করছে।’। সৌদির সঙ্গে আলোচনা, বিদেশি সেনামুক্ত মধ্যপ্রাচ্য চায় ইরান।
Tags: ইউএস কংগ্রেস, ডেমোক্র্যাটদের জয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন, মার্কিন রাজনীতি, রিপাবলিকান পার্টি