ল্যানসেট কমিশনের দ্বিতীয় প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ৪৬৪ মিলিয়ন কিশোর-কিশোরী অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার শিকার হবে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজিএস) অর্জনের সময়সীমাও ২০৩০ সাল। প্রথম ল্যানসেট কমিশন রিপোর্ট ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয়েছিল।
প্রতিবেদনে আরও অনুমান করা হয়েছে যে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক কিশোর-কিশোরী (১ বিলিয়ন), যাদের বয়স ১০-২৪ বছর, এমন দেশগুলোতে বসবাস করবে যেখানে তারা জটিল এবং অতিরিক্ত রোগের বোঝা অনুভব করবে। এর মধ্যে রয়েছে এইচআইভি/এইডস, অল্প বয়সে গর্ভধারণ, অনিরাপদ যৌনতা, বিষণ্নতা, অপুষ্টি এবং আঘাতের মতো প্রতিরোধযোগ্য ও চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং আত্মহত্যার কারণে এসব কিশোর-কিশোরীদের সম্মিলিতভাবে ৪২ মিলিয়ন সুস্থ জীবনের বছর নষ্ট হবে।
লেখকরা অনুমান করেছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে এক তৃতীয়াংশ নারী কিশোরী শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে অথবা কোনো লাভজনক কর্মসংস্থান পাবে না। বর্তমানে, কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য এবং মঙ্গল একটি সন্ধিক্ষণে রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “একবিংশ শতাব্দীতে ছোট বাচ্চাদের স্বাস্থ্য ও উন্নয়নে যে উন্নতি হয়েছে, কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যে সে তুলনায় অগ্রগতি অনেক পিছিয়ে রয়েছে।”
জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ পরিস্থিতি ভবিষ্যতে নতুন হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। যদিও অ্যালকোহল এবং তামাকের ব্যবহার প্রতিটি অঞ্চলে হ্রাস পেয়েছে, তবে কিশোর-কিশোরীদের কাছে চিনিযুক্ত পানীয়, অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার, তামাক এবং ই-সিগারেটের মতো পণ্য সহজেই উপলব্ধ, যা তাদের স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
আসন্ন প্রজন্মকে অনেক নতুন হুমকির মুখোমুখি হতে হবে – এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জলবায়ু পরিবর্তন। বর্তমান প্রজন্মের কিশোর-কিশোরীরাই প্রথম প্রজন্ম যারা এই সমস্যার প্রভাব সম্পূর্ণরূপে অনুভব করবে।
লেখকরা সতর্ক করে বলেছেন, “২১০০ সালের মধ্যে আনুমানিক ১.৮ বিলিয়ন কিশোর-কিশোরী এমন এক বিশ্বে বাস করবে যেখানে তাপমাত্রা প্রাক-শিল্প সময়ের (১৮৫০-১৯০০) তুলনায় প্রায় ২.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।”
বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা হলো, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন প্রাক-শিল্প স্তরের ১.৫ ডিগ্রির বেশি হওয়া উচিত নয়। যদি এই সীমা বৃদ্ধি পায়, তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, তাপপ্রবাহ, খরা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বন্যা আরও ঘন ঘন ও তীব্র হবে।
লেখকরা আরও একটি নতুন হুমকি হিসেবে যুদ্ধ বা যুদ্ধ-সদৃশ পরিস্থিতিকে চিহ্নিত করেছেন। এর ফলে শরণার্থী জনসংখ্যাও বৃদ্ধি পেতে পারে।
অঞ্চলভিত্তিক চিত্র
অঞ্চলভিত্তিক ছবির দিকে তাকালে, দক্ষিণ এশিয়া এবং সাব-সাহারান আফ্রিকায় সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি হয়েছে। তবে এটিও উল্লেখ করা উচিত যে, এই অঞ্চলে সমস্যাগুলোর মৌলিক স্তর এতোই কম ছিল যে, কোনো অগ্রগতিই এই অঞ্চলে সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হবে। এই কারণেই এই অঞ্চলগুলোতে বসবাসকারী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে রোগের বোঝা এখনও অনেক বেশি। লেখকরা উল্লেখ করেছেন, ২০৩০ সালে লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং উচ্চ আয়ের দেশগুলিতে এক তৃতীয়াংশ কিশোর-কিশোরী অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলকায় হবে।
চ্যালেঞ্জের তুলনায় অপর্যাপ্ত অর্থায়ন
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যের জন্য অর্থায়ন তাদের স্বাস্থ্যগত চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। তারা উল্লেখ করেছেন, ২০১৬-২১ সালে মোট স্বাস্থ্য উন্নয়নে সহায়তার মাত্র ২.৪% কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যের জন্য নির্দিষ্টভাবে বরাদ্দ ছিল।
অন্যদিকে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ (২৫.২%) কিশোর-কিশোরী। লেখকরা উল্লেখ করেছেন, “কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য ও সেবা খাতে বিনিয়োগ অত্যন্ত ব্যয়-কার্যকরী হওয়া সত্ত্বেও, বিনিয়োগ অপর্যাপ্ত, ভুলভাবে লক্ষ্যযুক্ত এবং কিশোর-কিশোরীদের থেকে দূরে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।” মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য দেশগুলির বৈদেশিক সাহায্য প্রত্যাহার অর্থায়নের চ্যালেঞ্জগুলিকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।
সমাধান
লেখকরা যে মূল সমাধানগুলি প্রস্তাব করেছেন তা হলো-ভবিষ্যতের রোগের বোঝা মোকাবেলা করার জন্য কিশোর-কিশোরীদের প্রয়োজনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থায়ন বৃদ্ধি করা। এছাড়াও, দেশগুলিকে কিশোর-কিশোরী-নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যসেবার সার্বজনীন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। লিঙ্গ-নির্দিষ্ট ব্যবস্থার ক্ষেত্রে, লেখকরা সুপারিশ করে বলেছেন-দেশগুলিকে লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার অ্যাক্সেসে অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার জন্যও পদক্ষেপ নিতে হবে।
সূত্র: দ্য ওয়্যার
বিটি/ আরকে
Tags: অতিরিক্ত ওজন, কিশোর-কিশোরী, মানসিক স্বাস্থ্য