পাকিস্তানের আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং বৈশ্বিক শান্তিরক্ষক হিসেবে তার ভূমিকা অবশেষে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে। কূটনীতি একটি দ্বিমুখী পথ, এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল–ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান সত্যিই শান্তির একটি বড় সুবিধাভোগী।
এটি শুধু এই কারণে নয় যে আন্তর্জাতিক তেলের উচ্চ মূল্য আমাদের নাজুক সামষ্টিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করে এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি ও রুপির অবমূল্যায়নের ঝুঁকি বাড়ায়। বরং এ কারণেও যে, ইরানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা পাকিস্তানের অভ্যন্তরেও প্রভাব ফেলে, কারণ বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম শিয়া জনগোষ্ঠীর বসবাস পাকিস্তানেই।
এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই সংঘাত আরব দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে এক ধরনের দোটানায় ফেলেছে। একদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, সৌদি আরব, বাহরাইন, ওমান এবং কুয়েতের মতো দেশগুলোর ওপর আমাদের শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নির্ভরতা রয়েছে। অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে আমাদের ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ স্থায়ী সীমান্ত এবং উষ্ণ সম্পর্ক রয়েছে। অতীতে ইরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ ছিল, কিন্তু যৌথ নৌ-মহড়ার পর একটি ইরানি জাহাজে টর্পেডো হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারত-ইসরায়েল ঘনিষ্ঠতা বাড়ায় সেই সম্পর্ক বদলে যায়। দীর্ঘমেয়াদে ভারত বরং ইসরায়েলের সঙ্গেই বন্ধুত্ব বজায় রাখতে আগ্রহী। এদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক সৌদি আরব, ইরান কিংবা এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের মতো মসৃণ বলে মনে হয় না।
প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত দেয়, গুরুত্বপূর্ণ শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে পাকিস্তানই যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছিল—যদি ইসরায়েল আব্বাস আরাঘচি এবং মোহাম্মদ-বাগের গালিবাফের মতো ব্যক্তিদের হত্যা করে, তাহলে আলোচনার জন্য আর কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। এই বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এই দুই ব্যক্তি ইরানি প্রতিনিধিদলের হয়ে শান্তি প্রচেষ্টার নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বাধীন দলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করেছেন। এটি কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; বরং প্রাণ রক্ষা, স্থায়ী বন্ধুত্ব গড়ে তোলা, পারস্পরিক আস্থা অর্জন, জাতীয় সমৃদ্ধি রক্ষা এবং আমাদের আরব মিত্রদের ওপর যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব কমানোর জন্য ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ। ইরানে অবতরণের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি যে উষ্ণ অভ্যর্থনা চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস (সিডিএফ) আসিম মুনিরকে জানিয়েছেন, তা শুধু প্রতীকী নয়—এটি জীবনরক্ষাকারী ও আন্তরিক ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রতিফলন।
একইভাবে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বারবার পাকিস্তানের প্রশংসা এবং সেনাপ্রধানকে আমন্ত্রণ জানানো—তাকে প্রকাশ্যে “মহান ফিল্ড মার্শাল” ও “তার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল” বলে আখ্যায়িত করা—একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ তৈরি করেছে। শরিফ ও মুনিরের যৌথ ব্যক্তিগত উদ্যোগ এমন একটি সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, যা পাকিস্তানের জন্য বাস্তব সুফল বয়ে আনতে পারে। মনে রাখতে হবে, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে “মোদী-ট্রাম্প ঘনিষ্ঠতা” প্রথমে পাকিস্তানকে আড়ালে ঠেলে দিয়েছিল, পরে অবশ্য ইমরান খানকে স্বাগত জানানো হয়। এখন পরিস্থিতি বদলেছে।
যদি শান্তি আলোচনা সফল হয় এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বিলম্বিত করা ও হরমুজ প্রণালী দিয়ে অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করার মাধ্যমে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে পাকিস্তান একটি অর্থনৈতিক প্রতিদান পাওয়ার যোগ্য। সদিচ্ছার প্রদর্শনের পরপরই বৈদেশিক বিনিয়োগ আসে না, কিন্তু হোয়াইট হাউস থেকে একটি ফোনকলই বাণিজ্য প্রতিনিধি দল বা তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বড় বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে। এর ফলে “ক্রিপ্টোমেসি”, বিরল খনিজ অনুসন্ধান এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—ইরান-পাকিস্তান গ্যাস পাইপলাইনের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ একটি কৌশলগত সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব গড়ে উঠতে পারে।
পাকিস্তানকে এই মুহূর্তটি কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হয়ে উঠতে হবে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় আফগানিস্তানে তালেবান শাসনকে বৈশ্বিক স্বীকৃতি দেওয়ার বিনিময়ে জঙ্গি আস্তানা নির্মূল এবং বাণিজ্য পথ ও গ্যাস রপ্তানির মাধ্যমে আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক প্রবাহ সচল রাখা সম্ভব। বর্তমানে ব্রেন্ট মূল্যের ১০-১১ শতাংশ হারে পাকিস্তানের এলএনজি চুক্তি—যেখানে দাম ৯০ ডলারের বেশি—প্রতি এমএমবিটিইউ ১০ ডলার পড়ে। এর সঙ্গে অতিরিক্ত ৪-৫ ডলার খরচ যুক্ত হওয়ায় আমাদের শিল্প খাত বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। ইরান-পাকিস্তান পাইপলাইন থেকে প্রতিদিন ১ বিসিএফ গ্যাস নির্দিষ্ট ৫-৬ ডলার দরে পাঞ্জাবের চাহিদা পূরণে সরবরাহ করা গেলে আমাদের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো (এসইজেড) সত্যিকার প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে যেতে পারবে।
বিশ্বব্যাপী তেলের দাম ১৫০-২০০ ডলারের সীমা থেকে কমাতে সহায়তা করে এবং আমদানি ব্যয় ও উচ্চ সুদের খাতে শত শত বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করে পাকিস্তান তার অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছে। যদি আমরা ইরানের জন্য একটি শান্তি চুক্তি নিশ্চিত করতে পারি এবং যুক্তরাষ্ট্রকে কিছু তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে রাজি করাতে পারি—অথবা ভারতের মতো পাকিস্তানের জন্যও ইরানি জ্বালানি কেনার বিশেষ অনুমতি আদায় করতে পারি—তাহলে আমাদের দীর্ঘ সীমান্ত একটি বাণিজ্য করিডরে রূপ নিতে পারে। বেলুচিস্তানে শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠিত হলে ভূগর্ভস্থ বিপুল খনিজ সম্পদও উন্মোচিত হতে পারে।
রেকো দিক কেবল শুরু। এর মাধ্যমে পাকিস্তান রাসায়নিক, ধাতু ও গ্যাস খাতে একটি অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে রূপান্তরিত হতে পারে। আশা করা যায়, বর্তমান নেতৃত্ব, বিশেষ করে চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেসের (সিডিএফ) মেয়াদকালে, এমন একটি সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হবে যা আগামী কয়েক দশক ধরে জনগণের জন্য বাস্তব সুফল বয়ে আনবে।
সূত্র: দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন
Tags: ইরান-পাকিস্তান সম্পর্ক, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলা, ইরানে হামলা, মধ্যপাচ্য