আমেরিকার স্বঘোষিত ‘শান্তির রাষ্ট্রপতি’ এমন একটি দেশের বিরুদ্ধে নৃশংস যুদ্ধ শুরু করেছেন যারা তার নিজের দেশের জন্য কোনো সরাসরি হুমকি ছিল না। এই সংঘর্ষটি গত ছয় মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় সামরিক অভিযান, যা আমেরিকার যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রপতিদের তালিকায় তার স্থান পাকাপোক্ত করেছে। ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ আগ্রাসন কোনো বিস্ময় হয়ে আসেনি। গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ওয়াশিংটন তেহরানের সাথে পারমাণবিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ভান করলেও, প্রকৃতপক্ষে ওই অঞ্চলে বিশাল নৌবহর মোতায়েন করছিল। এটি ছিল ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের পর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম সামরিক সমাবেশ।
এটি ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল যে ট্রাম্প প্রকৃতপক্ষে কোনো চুক্তির চেষ্টা করছেন না; আলোচনাগুলো ছিল কেবল সামরিক প্রস্তুতির একটি আড়াল মাত্র। এমনকি চলমান আলোচনায় অগ্রগতির খবর পাওয়া সত্ত্বেও এই আক্রমণ শুরু করা হয়। কূটনৈতিক আলোচনা বর্জন করে যুদ্ধে যাওয়ার ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তটি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নিরন্তর চাপ এবং ভেনিজুয়েলায় নিজের কথিত সাফল্যের আত্মতুষ্টি থেকে নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বরেই যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল একটি যুদ্ধ পরিকল্পনায় একমত হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল কেবল সামরিক স্থাপনা নয়, বরং ইরানের শীর্ষ নেতাদের নির্মূল করা।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে ট্রাম্পের ঔদ্ধত্য ও ধৃষ্টতা প্রকাশ পেয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি—যিনি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রধান—এবং তার পরিবারের সদস্যদের ওপর মার্কিন-ইসরায়েল হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে। ইসরায়েলের দাবি অনুযায়ী, এই সুনির্দিষ্ট হামলায় বিপ্লবী গার্ডের কমান্ডার, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অফ স্টাফসহ ৪০ জনেরও বেশি জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এছাড়া একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার ফলে ১৬৫ জন স্কুলছাত্রী ও কর্মীসহ বিপুল সংখ্যক বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড যুদ্ধাপরাধের চেয়ে কম কিছু নয়।
এদিকে, ট্রাম্প তার সামরিক অভিযানের ঘোষিত উদ্দেশ্যগুলো বারবার পরিবর্তন করছেন। তিনি এখন প্রকাশ্যেই ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের (রেজিম চেঞ্জ) কথা বলছেন। শুরুতে তিনি এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করলেও, এখন স্বীকার করছেন যে এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। ভয়াবহ বিমান হামলা সত্ত্বেও ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বজায় রেখেছে, যা ইসরায়েলের অভ্যন্তরে এবং মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানতে সক্ষম।
খবর পাওয়া গেছে যে, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েলের শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে স্পর্শকাতর নিরাপত্তা স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। এমনকি মার্কিন বিমানবাহী রণতরীতেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে, যাতে আমেরিকান সৈন্যরা হতাহত হয়েছে। ইরান কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং সৌদি আরবে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে সংঘাতের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসেও ইরানি ড্রোনের আঘাত লেগেছে।
তেহরান ঘোষণা করেছে যে, আমেরিকান আগ্রাসনের জবাবে এই স্থাপনাগুলো বৈধ লক্ষ্যবস্তু। পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর আকার ধারণ করেছে কারণ কিছু হামলা বেসামরিক স্থাপনায় আঘাত হানছে, যা সংঘাতকে তীব্রতর করছে এবং পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করছে। এরই মধ্যে ইসরায়েল লেবাননে ইরানপন্থী হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালিয়ে যুদ্ধের পরিধি বিস্তৃত করেছে।
সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে যখন অন্য দেশগুলো এতে জড়িয়ে পড়ছে, ট্রাম্প স্থল সৈন্য মোতায়েনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। যুক্তরাষ্ট্রের এমন কোনো সামরিক হঠকারিতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলবে। ইরানের ওপর মার্কিন হামলা এবং বিশ্বের লক্ষ লক্ষ শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে শ্রদ্ধেয় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ড অনেক দেশে ব্যাপক আমেরিকা বিরোধী বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, যা আমেরিকার আঞ্চলিক মিত্রদের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। পাকিস্তান, ইরাক এবং বাহরাইনে, যেখানে বিপুল সংখ্যক শিয়া জনসংখ্যা রয়েছে, সেখানে সবচেয়ে বেশি সহিংস বিক্ষোভ দেখা গেছে। প্রকৃতপক্ষে, সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ ভুলে জনগণের একটি বৃহত্তর অংশ এই প্রতিবাদে যোগ দিয়েছে।
স্থল সৈন্য নামিয়ে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালানো হলে তা ইতিমধ্যে অস্থির হয়ে থাকা আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে। বিপুল সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র জয়ের নিশ্চয়তা দিতে পারে না; ট্রাম্প বোধহয় আফগানিস্তানে আমেরিকার দুই দশকের যুদ্ধ এবং ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের শিক্ষা ভুলে গেছেন। তার এই যুদ্ধংদেহী মনোভাব বিশ্বকে এক গভীর অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত করেছে।
যুদ্ধ তীব্র হওয়ার সাথে সাথে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ইরান এই জলপথ বন্ধের হুমকি দেওয়ার পর বিশ্বের বেশ কয়েকটি বড় কন্টেইনার শিপিং লাইন তাদের পরিষেবা স্থগিত করেছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে এবং তেল-গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী করে তুলেছে। আঞ্চলিক আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে কেবল যাতায়াতই বিঘ্নিত হয়নি, বরং তা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। যুদ্ধের দ্রুত কোনো সমাপ্তি না ঘটায় বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা তীব্র হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে বিশ্ব আজ বিভক্ত। চীন ও রাশিয়া ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল সামরিক অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে, পশ্চিমা দেশগুলো একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আমেরিকার এই অবৈধ যুদ্ধের সরাসরি নিন্দা জানানো থেকে বিরত রয়েছে—যা অনেকের কাছে তাদের ভণ্ডামিকে উন্মোচিত করে।
ইরানের সাথে দীর্ঘ সীমান্ত থাকা পাকিস্তান এই যুদ্ধের ফলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। খামেনির হত্যাকাণ্ডের পর পাকিস্তানের বেশ কয়েকটি শহরে ভয়াবহ আমেরিকা বিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন এবং সৌদি আরবের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে বর্তমান পাকিস্তান সরকার এখন বেশ বিপাকে। করাচি, ইসলামাবাদ এবং স্কার্দুতে বিক্ষোভকারীদের হত্যার ঘটনা—যা কথিতভাবে মার্কিন মেরিন সেনাদের দ্বারা ঘটেছে—সরকার বিরোধী মনোভাবকে আরও উসকে দিয়েছে। অনেকেই ট্রাম্পের বিতর্কিত ‘বোর্ড অফ পিস’ (বিওপি)-এ যোগ দেওয়ার পাকিস্তানের সিদ্ধান্তের বিষয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। ওয়াশিংটনে বিওপি-এর প্রথম বৈঠকের পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সাথে সমন্বয় করে ইরানে হামলা চালায়, যে বৈঠকে ইসরায়েলও উপস্থিত ছিল। এই সমস্ত ঘটনা সামরিক মদদপুষ্ট সরকারকে এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই অন্তহীন বা ‘নো-উইন’ যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হবে। ট্রাম্পের এই অবৈধ যুদ্ধ অবশ্যই ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দেবে, কিন্তু সেটি তার কাঙ্ক্ষিত পথে হবে না। অঞ্চলটি আরও চরম অরাজকতার দিকে ধাবিত হবে, যার পরিণতি ভোগ করতে হবে পুরো বিশ্বকে।
সূত্র: ডন
Tags: ইরান, ইরান আক্রমণ, ইরানে মার্কিন-ইসরায়েল হামলা, ইরানে হামলা, ট্রাম্পের অন্তহীন যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্র, সামরিক শক্তি