কার্লো আনচেলত্তির সবচেয়ে বড় জাদু বোধহয় তার বাঁ চোখের ভুরুর সামান্যতম উত্থান, ঠিক যেন ৪৫ ডিগ্রি কোণে এক রহস্যময় চাহনি। এই ভুরু যেন তার কোচিং দর্শনের প্রতিচ্ছবি – সহজ, স্বচ্ছন্দ ও কিছুটা যেন বাঁধনহারা এক ব্যক্তিত্ব, অনেকটা জেফ্রি লেবোস্কির মতো (জেফ্রি “দ্য ডিউড” লেবোস্কি “দ্য বিগ লেবোস্কি” চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র জেফ ব্রিজেস যিনি তার সহজ জীবনযাপন এবং শান্ত স্বভাবের জন্য পরিচিত)।
মাঠের কোনে অন্য অতি-উৎসাহী কোচ, যারা চকবোর্ড আর জটিল কৌশল নিয়ে মগ্ন থাকেন, তাদের বিপরীতে আনচেলত্তি যেন কঠিন পরিস্থিতিতেও সিগার আর অপেরার স্বপ্নে বিভোর। তবে এই ‘ওল্ড ম্যান কার্লো’ নিশ্চয়ই কিছু জানেন, কারণ তিনি থামার পাত্র নন। তার এবারের গন্তব্য ব্রাজিল। যদিও আজকাল ব্রাজিল দল ও তাদের বেশিরভাগ খেলোয়াড় ইউরোপেই ম্যাচ খেলে, তবুও গন্তব্য তো সেলেসাওয়ের ডেরাই।
ডন কার্লোর সঙ্গে সেলেসাওয়ের মেলবন্ধন!
কার্লোকে কনফার্ম করার পর ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (সিবিএফ) এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে দুই কিংবদন্তীর মিলন ঘটলো – পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং ইউরোপের সেরা ক্লাব ফুটবলে এক অতুলনীয় সাফল্যের অধিকারী কোচ।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘রিয়াল মাদ্রিদের প্রতি এবং মিস্টার (ফ্লোরেন্তিনো) পেরেজের প্রতি সিবিএফ আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে, কারণ তারা কোচের চুক্তির মেয়াদ থাকা সত্ত্বেও তার ছাড়পত্র প্রদানে সহযোগিতা করেছেন।’
পেরেজের কোচ, খেলোয়াড় চুক্তি-বরখাস্তের অভ্যাসের নিরিখে এই মন্তব্য হয় নিদারুণ ভুল ব্যাখ্যা, নয়তো বব মর্টিমারের (ইংরেজ কৌতুকাভিনেতা, লেখক এবং টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব) মতো ঠান্ডা মাথার কৌতুক।
আজ ( ২৬ মে) সোমবার থেকে আনচেলত্তি তার নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। ক্যালেন্ডারও যেন সিবিএফের প্রতি সদয়। যদি সোমবার ২৫ মে হতো, তবে তা ইস্তাম্বুলের সেই রাতের ২০তম বার্ষিকী হতো, ২০০৫ চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে যেদিন জের্জি ডুডেক অবিশ্বাস্যভাবে আন্দ্রি শেভচেঙ্কোর এক গজ দূর থেকে নেওয়া শট বাঁচিয়েছিলেন, আর কার্লোর ভুরু উঠেছিল রেকর্ড ৮৪ ডিগ্রি উচ্চতায়! সেই স্মৃতি মনে না করেও আপাতত, আনচেলত্তি প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সেরে নিচ্ছেন।
তিনি বলেছেন, ‘রিয়াল মাদ্রিদের প্রতি আমার অগাধ সম্মান রয়েছে এবং এই সমর্থকদের প্রতিও। আমি এই অসাধারণ অভিযানের শেষ অংশের দিকে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়েছি। ২৬ মে থেকে আমি ব্রাজিলের কোচিং শুরু করব, যা ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হবে।’

রদ্রিগো, এদের মিলিতাও, এন্ড্রিক এবং বিশেষ করে ভিনিসিয়াস জুনিয়রের সঙ্গে তার পূর্বের সম্পর্ক তাকে কিছুটা এগিয়ে রাখবে। ২০২১ সালে আনচেলত্তি মাদ্রিদে ফেরার পরই ভিনিসিয়াসের গোল করার ক্ষমতা চারগুণ বেড়ে গিয়েছিল।
সাম্প্রতিক টুর্নামেন্টগুলোতে ব্রাজিলের পারফরম্যান্স হতাশাজনক ছিল – ২০০২ সালে শেষ বিশ্বকাপ জয়ের পর তারা মাত্র একবার সেমিফাইনালে পৌঁছেছে, যা মোটেও গর্ব করার মতো কিছু নয়। তাই এই কাজটি অনেকটা যেন হারানোর কিছু নেই এমন এক সুযোগ।
আনচেলত্তি ১৯২৫ সালের পর প্রথম কোনো অ-ব্রাজিলিয়ান কোচ হিসেবে সেলেসাওয়ের দায়িত্ব নিতে চলেছেন। আধুনিক যুগে বেশিরভাগ বড় ফুটবল খেলিয়ে দেশই বিদেশি কোচ নিয়োগ করার তেমন সাহস দেখাচ্ছে না। যদি আনচেলত্তি সফল হন, তবে তিনি সম্ভবত বিশ্ব ফুটবলের সংস্কৃতিতে এক বড় পরিবর্তন আনবেন।
আনচেলত্তি ইতিমধ্যেই পাঁচটি বড় কাপ, তিনটি ক্লাব বিশ্বকাপ এবং পাঁচটি ভিন্ন দেশে ছয়টি ঘরোয়া লিগ জিতেছেন। যদি তিনি ব্রাজিলের সঙ্গে দীর্ঘ ২৪ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকাপ জেতেন, তবে নিঃসন্দেহে তিনি সর্বকালের সেরা ফুটবল ম্যানেজার হিসেবে ইতিহাসে নিজের স্থান পাকা করে নেবেন। আর যদি তিনি পুরোপুরি ব্যর্থও হন, তাহলেও তিনি সিগার আর অপেরার স্বপ্ন দেখতে থাকবেন। জীবন তো একটাই, আর কার্লো সেই জীবনে নিজের মতো করেই বাঁচছেন।
তথ্য সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
Tags: কার্লো আনচেলোত্তি, ব্রাজিল