কোভিট -১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির কারণে গত ছয় বছরে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। জ্বালানি, খাদ্য ও সারের সরবরাহে বিঘ্ন, পণ্য পরিবহনে অনিশ্চয়তা এবং বাণিজ্য ব্যয় বৃদ্ধির মধ্যেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। তবে বাণিজ্যের ধরন, সরবরাহের উৎস ও দেশগুলোর মধ্যে লেনদেনের গতিপথ বদলে যাচ্ছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্ব পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং সেবা বাণিজ্য ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট পণ্যের বাড়তি চাহিদা এই প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সেমিকন্ডাক্টর, সার্ভার ও টেলিযোগাযোগ সরঞ্জামের মতো পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে শুল্ক ও বাণিজ্যনীতির অনিশ্চয়তার নেতিবাচক প্রভাব কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এআই-সংশ্লিষ্ট পণ্য বিশ্ব পণ্য বাণিজ্যের ১০ শতাংশেরও কম হলেও ২০২৫ সালে বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধিতে এসব পণ্যের অবদান ছিল প্রায় ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রযুক্তিপণ্যের চাহিদা বিশ্ব বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধিকে উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে নিয়েছে। তবে এই প্রবৃদ্ধির সুফল সব অঞ্চলে সমানভাবে পৌঁছায়নি। এআই প্রযুক্তির সরবরাহব্যবস্থায় এশিয়ার দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকলেও আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে।
বদলে যাচ্ছে সরবরাহ ব্যবস্থা
বিশ্ব বাণিজ্যে পরিবর্তনের অন্যতম কারণ সরবরাহব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস। কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিভিন্ন দেশের কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। এরপর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো একটি দেশ বা নির্দিষ্ট কয়েকটি উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজতে শুরু করে। বিশেষ করে বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদনকেন্দ্র চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রবণতা বাড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতিও এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করেছে। দেশটি বিভিন্ন বাণিজ্য অংশীদারের ওপর ভিন্ন ভিন্ন শুল্ক আরোপ, শুল্কছাড় নিয়ে আলোচনা এবং পৃথক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবেশকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। এতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বহুপক্ষীয় বাণিজ্যব্যবস্থার আওতায় থাকা ‘সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত দেশ’ নীতির কার্যকারিতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
তবে বিশ্বায়ন পুরোপুরি থেমে যায়নি। বরং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার পরিবর্তে নতুন দেশ ও অঞ্চলে ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে বিশ্ব পণ্য বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ ডব্লিউটিওর সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত দেশের শর্তে পরিচালিত হলেও পরবর্তী সময়ে তা প্রায় ৭২ শতাংশে নেমে আসে। এর অর্থ, বহুপক্ষীয় বাণিজ্যব্যবস্থা এখনো গুরুত্বপূর্ণ থাকলেও দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য পরিচালনার শর্তে পরিবর্তন আসছে।
চীনের বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি এবং চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগের ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় নতুন কিছু দেশের গুরুত্ব বাড়ছে। পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের (পিআইআইই) তথ্যের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত পণ্য আমদানি ২৮ শতাংশ কমার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। একই সময়ে অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি ৯ শতাংশের বেশি বাড়ার প্রত্যাশা ছিল।
এই পরিবর্তনে ভিয়েতনাম, তাইওয়ান ও মেক্সিকোর মতো দেশ ও অঞ্চল লাভবান হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ না করে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ বাড়াচ্ছে।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের সহযোগী অধ্যাপক টমাস স্যাম্পসনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বায়ন কমছে কি না, তার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দেশগুলোর অংশীদার ও সরবরাহের উৎস কতটা বদলে যাচ্ছে।
জ্বালানি বাণিজ্যেও বড় পরিবর্তন
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপের জ্বালানি আমদানির উৎসেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মোট গ্যাস আমদানিতে রাশিয়ার অংশ ২০২১ সালের ৪৫ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫ সালে ১২ শতাংশে নেমে আসে। একই সময়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) অংশ ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৫ শতাংশে পৌঁছায়। নরওয়ে ও যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী হয়ে ওঠে।
এ ছাড়া ইউরোপ রাশিয়ার কয়লা আমদানি কার্যত বন্ধ করে দেয় এবং রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে। অন্যদিকে, রাশিয়া ইউরোপের পরিবর্তে চীন ও ভারতের মতো বাজারে তেল বিক্রি বাড়ানোর সুযোগ নেয়। ফলে জ্বালানি বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার পরিবর্তে এর গন্তব্য ও সরবরাহের পথ পরিবর্তিত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের আশঙ্কাও বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে বিকল্প পথে জ্বালানি পরিবহন এবং অন্য উৎপাদনকারী দেশ থেকে সরবরাহ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে পরিবহন ব্যয় ও ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বাড়ছে ব্যয় ও অনিশ্চয়তা
বিশ্ব বাণিজ্যের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও এর অর্থ এই নয় যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আগের মতো স্থিতিশীল রয়েছে। যুদ্ধ, শুল্ক, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং বাণিজ্যনীতির অনিশ্চয়তা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে উৎপাদনকেন্দ্র ও সরবরাহকারী নির্বাচন করতে বাধ্য করছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রধান অর্থনীতিবিদ রবার্ট স্টাইগারের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সংস্থাটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুতর ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যাঘাতগুলোর মধ্যে অন্যতম। এআই-সংশ্লিষ্ট পণ্যের বাড়তি চাহিদা সামগ্রিক বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সাহায্য করলেও অন্য খাতগুলোর দুর্বলতা আড়াল হয়ে থাকতে পারে।
সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক বাণিজ্য সংকুচিত হওয়ার পরিবর্তে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। তবে সরবরাহের উৎস বহুমুখী করা, বিকল্প পরিবহনপথ তৈরি এবং নতুন বাজারে প্রবেশের কারণে ব্যবসার ধরন বদলে যাচ্ছে। এই পুনর্বিন্যাস দীর্ঘ মেয়াদে সরবরাহব্যবস্থাকে আরও বৈচিত্র্যময় করতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে পণ্য উৎপাদন ও পরিবহনের ব্যয় এবং ব্যবসায়িক ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
সূত্র: ভিয়েতনামের সংবাদমাধ্যম কং লুয়ান-এ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদন অবলম্বনে।
Tags: চুক্তি, বিশ্ববাণিজ্য