বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সম্মেলনে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা এবং বঙ্গোপসাগরের অফশোর সম্পদের সম্ভাবনা তুলে ধরেন। তিনি আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোকে ‘বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড ২০২৬’-এ অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ জ্বালানি এবং খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক খবর বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়।
বাংলাদেশের নতুন অফশোর বিডিং রাউন্ডটি গত ২৪ মে আহ্বান করা হয়। পেট্রোবাংলার নোটিশ অনুযায়ী, ১১টি অগভীর সমুদ্রের ব্লক হলো এসএস-০১ থেকে এসএস-১১ এবং গভীর সমুদ্রের ১৫টি ব্লক হলো ডিএস-০৮ থেকে ডিএস-২২। দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ৩০ নভেম্বর ২০২৬।
২০২৪ সালে আগ্রহ ছিল, দরপত্র দেয়নি কেউ
নতুন বিডিং রাউন্ডের অন্যতম বড় পরীক্ষা হচ্ছে আগের রাউন্ডের অভিজ্ঞতা। ২০২৪ সালে বঙ্গোপসাগরের ২৪টি ব্লক, ৯টি অগভীর ও ১৫টি গভীর সমুদ্রের, আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছিল। সে সময় কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানি তথ্য ও দরপত্রের নথি সংগ্রহ করলেও শেষ পর্যন্ত কোনো কোম্পানি দরপত্র জমা দেয়নি। ওই সময় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করা হয়।
২০২৪ সালের রাউন্ডে একপর্যায়ে সাতটি আন্তর্জাতিক কোম্পানি দরপত্রের নথি কিনেছিল। এর মধ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের এক্সনমোবিল ও শেভরন, চীনের সিএনওওসি, জাপানের ইনপেক্স, ভারতের ওএনজিসি, সিঙ্গাপুরের ক্রিসএনার্জি এবং থাইল্যান্ডের পিটিটিইপি। এ ছাড়া নয়টি কোম্পানি অফশোর ডেটা প্যাকেজ কিনেছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পরও কোনো দরপত্র জমা পড়েনি।
এবার সেই অভিজ্ঞতা থেকে পিএসসি কাঠামোতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। সরকার বলছে, নতুন ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট-২০২৬’-এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের জন্য বাণিজ্যিক শর্ত আরও প্রতিযোগিতামূলক করা হয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ওয়েবসাইটেও নতুন পিএসসি ও বিডিং নোটিশ প্রকাশ করা হয়েছে।
বদলেছে পিএসসির শর্ত
নতুন কাঠামোর আওতায় বিনিয়োগকারীদের মুনাফা দেশে থেকে নেওয়ার পূর্ণ সুযোগ রাখা হয়েছে। কোনো সিগনেচার বোনাস ও রয়্যালটি রাখা হয়নি। যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক সুবিধা এবং ঠিকাদারের করভার পেট্রোবাংলার বহন করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। গ্যাসের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারের ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দামের সঙ্গে যুক্ত করার বিধান রাখা হয়েছে।
নতুন পিএসসিতে গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদনকাল ২৫ বছর এবং তেলক্ষেত্রের উৎপাদনকাল ২০ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্দিষ্ট শর্তে উভয় ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত ১০ বছর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
পিএসসিতে গ্যাস বিক্রির ক্ষেত্রেও আগের তুলনায় নমনীয়তা আনা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রি এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গ্যাস রপ্তানির সুযোগ রাখা হয়েছে বলে সরকারি নথি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিপির আগ্রহ, কিনেছে ছয় প্রতিষ্ঠান নতুন বিডিং রাউন্ডে এরই মধ্যে বিদেশি কোম্পানির আগ্রহের খবর পাওয়া গেছে। গত জুলাইয়ে ব্রিটিশ বহুজাতিক জ্বালানি কোম্পানি বিপি পেট্রোবাংলার কাছে দরপত্রের নথি কেনার জন্য অর্থ পাঠানোর বিষয়ে যোগাযোগ করে। পেট্রোবাংলা তাদের প্রয়োজনীয় ব্যাংক তথ্য দেয়।
এ ছাড়া ছয়টি প্রতিষ্ঠান এখন পর্যন্ত ২০২৬ সালের অফশোর বিডিংয়ের তথ্য প্যাকেজ কিনেছে বলে জনাগেছে।
লন্ডনের সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বঙ্গোপসাগরের অনাবিষ্কৃত অফশোর সম্ভাবনার পাশাপাশি আধুনিক ভূতাত্ত্বিক ও সিসমিক তথ্যের প্রাপ্যতাকে বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
২০২৪ সালের বিডিং রাউন্ডের আগে টিজিএস, এসএলবি ও পেট্রোবাংলা মিলে বাংলাদেশের অফশোর এলাকায় ১২ হাজার ৬৩৬ লাইন কিলোমিটারের ২ডি মাল্টিক্লায়েন্ট সিসমিক জরিপ সম্পন্ন করেছিল। জরিপটির আওতায় তখনকার ২৪টি ব্লকের প্রায় ৭৫ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা ছিল।
এবারও আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে ভূতাত্ত্বিক ও সিসমিক তথ্য পর্যালোচনা করে ব্লক নির্বাচনের আহ্বান জানানো হয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল সরকার ও পেট্রোবাংলার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে চলমান বিডিংয়ে অংশ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে।
‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’-এর চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন সম্মেলনে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির পরিস্থিতি, বিনিয়োগের প্রবাহ এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকারের বিভিন্ন সহায়ক নীতির বিষয় তুলে ধরেন।
বাংলাদেশের জন্য এবারের বিডিং রাউন্ডের গুরুত্ব শুধু নতুন বিনিয়োগ পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশে গ্যাসের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে। ফলে বঙ্গোপসাগরে নতুন গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেলে তা ভবিষ্যতের জ্বালানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে অনুসন্ধান, আবিষ্কার ও বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে ১০ বছর সময় লাগতে পারে বলে পেট্রোবাংলার তরফ থেকে জানানো হয়েছে।
এন/আই
Tags: আশিক চৌধুরী, জ্বালানী, বিনিয়োগ