যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে অভূতপূর্ব সাফল্যের মুখ দেখেছেন মুসলিম প্রার্থীরা। দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে অনুষ্ঠিত লড়াইয়ে অন্তত ৩৭ জন মুসলিম প্রার্থী হয় জয়ী হয়েছেন, নতুবা ভোট গণনায় এগিয়ে রয়েছেন। ফেডারেল কংগ্রেস থেকে শুরু করে অঙ্গরাজ্যের আইনসভা এবং স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন পদে তাদের এই জয়জয়কার মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে মুসলিম সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণের একটি শক্তিশালী বার্তা দিচ্ছে। এদিকে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের ৪৮তম ডিস্ট্রিক্টে প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোট পেয়ে এগিয়ে ছিলেন ওসমান সালাহউদ্দিন। সূত্র: রয়টার্স, আনাদোলু এজেন্সি, রিলিজিয়ন নিউজ সার্ভিস, সিবিএস নিউজ ও মুসলিম নেটওয়ার্ক টিভি।
নির্বাচনী ফলাফল অনুযায়ী, জয়ী বা এগিয়ে থাকা প্রার্থীদের মধ্যে আটজন কংগ্রেসে জায়গা করে নিয়েছেন। এর মধ্যে একজন সিনেট এবং সাতজন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া অঙ্গরাজ্যগুলোর আইনসভায় ২৭ জন এবং বিচার বিভাগ ও কাউন্টি পর্যায়ের দুটি পদে মুসলিম প্রার্থীদের জয় বা অগ্রগমন নিশ্চিত হয়েছে। কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনসের (সিএআইআর) দেওয়া তথ্য বলছে, এবারের নির্বাচনে স্থানীয়, অঙ্গরাজ্য ও ফেডারেল পর্যায়ে ১৬০ জনেরও বেশি মুসলিম প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, যেখানে ২০২২ সালের নির্বাচনে এই সংখ্যাটি ছিল ১৪৫ জন। মিনেসোটার হেনেপিন কাউন্টি কমিশনার নির্বাচনে শ্যারন এল-আমিনও বর্তমান কমিশনার আইরিন ফার্নান্দোর চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন। এ ছাড়া কয়েকটি নির্বাচনী এলাকায় ভোট গণনা চলায় ফলাফল তখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে কয়েকটি আসনে ভোট গণনা ও আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা বাকি থাকায় জয়ী ও এগিয়ে থাকা প্রার্থীর সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে।
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে মিশিগান অঙ্গরাজ্যে। সেখানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ৪২ বছর বয়সী চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবদুল আল-সাইয়েদ রিপাবলিকান প্রার্থী ও সাবেক কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্সকে পরাজিত করে ইতিহাস গড়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম হিসেবে তিনি সিনেট সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে তিনি মিশিগানের স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নির্বাচনী ইশতেহারে তিনি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, করপোরেট প্রভাব কমিয়ে চিকিৎসা ব্যয় সহনীয় করা এবং ইসরায়েলকে নিঃশর্ত মার্কিন সামরিক সহায়তা প্রদানের ঘোর বিরোধিতার কথা বলেছিলেন। মিশিগানের আপিল আদালতের নির্বাচনে এগিয়ে ছিলেন মারিয়াম সাদ বাজ্জি। মার্কিন রাজনীতিতে মুসলিমদের অংশগ্রহণ বাড়ার বিষয়টি এবারের নির্বাচনে বিশেষভাবে সামনে এসেছে।
আল-সাইয়েদের বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রচারে ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি করা হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কয়েকজন রিপাবলিকান নেতা তাকে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ তুলেছিলেন। যদিও আল-সাইয়েদ এসব ভিত্তিহীন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং এর পক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি। মূলত ডেমোক্র্যাটরা এসব প্রচেষ্টাকে ইসলামবিদ্বেষী রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই চিহ্নিত করেছিলেন, তবুও ভোটারদের রায়ে তিনি জয়ী হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত এসব বিতর্কের মধ্যেও জয় পেয়েছেন তিনি।
প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনেও পুরনোদের আধিপত্য বজায় ছিল।
মিনেসোটা থেকে ইলহান ওমর, মিশিগান থেকে রাশিদা তালিব, ইন্ডিয়ানা থেকে আন্দ্রে কারসন এবং ক্যালিফোর্নিয়া থেকে লতিফা সিমন পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া নিউ জার্সির ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে বিজয়ী হয়েছেন আদম হামাওয়ি, যিনি পেশায় চিকিৎসক এবং ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। অন্যদিকে নিউইয়র্কের ১৩তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে দীর্ঘদিনের কংগ্রেস সদস্য আদ্রিয়ানো এসপাইয়াতকে পরাজিত করে লাতিনা মুসলিম নারী হিসেবে ইতিহাসে নাম লিখিয়েছেন দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ের। ক্যালিফোর্নিয়ার ১৪তম ডিস্ট্রিক্ট থেকে পূর্ণ মেয়াদে নির্বাচিত হয়েছেন আয়েশা ওয়াহাব। ইরাক যুদ্ধে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার।
অঙ্গরাজ্যগুলোর আইনসভায় মুসলিম প্রার্থীদের সাফল্য ছিল বেশ বিস্তৃত। মিশিগানে আব্বাস আলাউয়েহ, আলাবাস ফারহাত ও জালাল আবদুল্লাহ জয় পেয়েছেন। ওহাইওতে মুনিরা আবদুল্লাহি ও ইসমাইল মোহাম্মদ সফল হয়েছেন। ইলিনয়ে রিপাবলিকানদের দখলে থাকা আসন পুনরুদ্ধার করেছেন নাবিলা সৈয়দ, যিনি ২৬তম স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্টে ডার্বি হিলসকে পরাজিত করেছেন। একই রাজ্যে নিজের আসন ধরে রেখেছেন আবদেলনাসের রশিদ। এদিকে মিনেসোটায় ওমর ফাতেহ ও জয়নাব মোহাম্মদ জয়ের পাশাপাশি মোহামুদ নুর ও সামাকাব হুসেইন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ওরেগনে স্টেট সিনেটর কায়সে জামা নিজের আসন অক্ষুণ্ণ রেখেছেন।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও মুসলিমদের জয়যাত্রা অব্যাহত ছিল। নিউইয়র্কের ১২তম স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে আবের কাওয়াস নির্বাচিত হয়েছেন এবং রবার্ট জ্যাকসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন। কানেকটিকাটে মরিয়ম খান ও সৌদ আনোয়ার স্টেট সিনেট নির্বাচনে জয় পেয়েছেন। ডেলাওয়ারে মদিনা উইলসন-অ্যান্টন এবং পেনসিলভানিয়ায় তারিক খান আইনসভায় পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন।
দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে জর্জিয়ার সপ্তম স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্টে রুয়া রোমান এবং শেখ রহমান জয়ী হয়েছেন। ফারুক মুগল রিপাবলিকানদের কাছ থেকে নিজের পুরোনো আসন পুনরুদ্ধার করেছেন। টেক্সাসে সালমান ভোজানি ও সুলেমান লালানি পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। হ্যারিস কাউন্টির বিচারক পদে জিতে লেটিশিয়া প্লামার টেক্সাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্বাচিত মুসলিম নারী জনপ্রতিনিধি হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। নর্থ ক্যারোলাইনায় স্টেট সিনেটর মুজতবা মোহাম্মদ, কলোরাডোর ২৯তম ডিস্ট্রিক্টে ইমান জোদেহ এবং টেনেসিতে ইউসুফ হাকিম পুনরায় নির্বাচিত হয়েছেন।
তবে সব লড়াইয়ে জয় আসেনি। অ্যারিজোনার চতুর্থ কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান প্রার্থী জুহদি জাসের এবং ফ্লোরিডার ১০৩তম হাউস ডিস্ট্রিক্টে ইমতিয়াজ মোহাম্মদ হেরেছেন। ভোট গণনার ফলে ওয়াশিংটন কাউন্টির চেয়ারম্যান পদে নাফিসা ফাই কিছুটা পিছিয়ে ছিলেন। মুসলিম প্রার্থীদের প্রচারণায় এবার গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান, নাগরিক অধিকার এবং মানবিক সহায়তার বিষয়গুলো বেশ গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছিল, যা মার্কিন ভোটারদের ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তনের দাবি কয়েকজন প্রার্থীর প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
Tags: ২০২৬ নির্বাচন, আবদুল আল-সাইয়েদ, মার্কিন রাজনীতি, মুসলিম প্রার্থী, যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচন