একটি হলোকাস্ট থেকে বেঁচে থাকাটা কোনো একটি মাত্র সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে না। এটি হলো প্রতিদিনের অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্তের সমষ্টি—যেসব সিদ্ধান্তের উপর জীবন-মৃত্যু নির্ভর করে।
আপনি কি থাকবেন নাকি চলে যাবেন?
বর্তমানে, ইসরায়েলের গাজা সিটিতে আগ্রাসনের ফলে দশ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি আটকা পড়েছেন। তাদের সামনে এই দুঃসহ, যন্ত্রণাদায়ক সিদ্ধান্তটি প্রতিদিন নতুন করে এসে দাঁড়াচ্ছে।
গত রোববার, মিডল ইস্ট আইয়ের সাংবাদিক মোহাম্মদ আল-হাজ্জার তার স্ত্রী ইনাস এবং দুই সন্তানকে নিয়ে চার ঘণ্টা ধরে সূর্যের তীব্র তাপের মধ্যে হেঁটেছিলেন। গাজা সিটির আল রশিদ স্ট্রিট থেকে পাঠানো একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিওতে দেখা যায়, একসময়ের ব্যস্ত এই রাস্তাটি এখন যেন এক ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দিয়ে যাওয়া একটি ধুলো মাটির রাস্তা।
রাস্তাটি ইসরায়েলি বাহিনীর ফেলে রাখা আরবি ভাষায় লেখা লিফলেটে ভরা, যেখানে গাজা সিটির বাসিন্দাদের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে ইসরায়েলিদের দেওয়া পথে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মোহম্মদ আল-হাজ্জারের এক শিশু একটি স্কুলব্যাগ হাতে আর অন্যজন কালো পোশাক পরে অজানা এক গন্তব্যের দিকে হেঁটে চলেছে।
বেঁচে থাকার জন্য এক মরিয়া লড়াই
গত দুই বছর ধরে মোহাম্মদ তার পরিবারকে গাজার এই ব্যাপক ধ্বংসলীলার মধ্যে দিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু বেঁচে থাকার প্রতিটি চেষ্টাই নতুন নতুন বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে।
গত বছর মোহাম্মদ এবং ইনাস তাদের সন্তানদের ভালো শিক্ষার জন্য গাজা ছেড়ে মিশরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ইসরায়েল তখন গাজার সব স্কুল বোমা মেরে ধ্বংস করে দিয়েছিল, যার ফলে সেখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছিল।
কিন্তু উত্তর গাজা থেকে দক্ষিণ গাজাকে বিভক্তকারী নেৎজারিম করিডোরে অবস্থিত একটি ইসরায়েলি চেকপয়েন্টে ইনাসকে গ্রেফতার করা হয়। সৈন্যরা তার সঞ্চয়, পাসপোর্ট, ফোন, ক্রেডিট কার্ড—এমনকি পরিবারের সোনা পর্যন্ত লুট করে নেয়।
দুই দিন পর ইনাসকে মুক্তি দিয়ে আবার উত্তরে ফেরত পাঠানো হয়। তার স্বামী ও সন্তানদের তাকে ছাড়াই সামনে এগিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়। কিন্তু তারা যখন গন্তব্যে পৌঁছালেন, ততক্ষণে মিশরে যাওয়ার রাফাহ ক্রসিং স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
মোহাম্মদ ও তার সন্তানরা দক্ষিণে আটকা পড়লেন, আর ইনাস রয়ে গেলেন উত্তরে। জানুয়ারিতে একটি সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতি চলাকালীন মোহাম্মদ তার সন্তানদের নিয়ে আরও হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে পায়ে হেঁটে উত্তরে ফিরে আসেন। ৭৫ দিনের বিচ্ছেদের পর অবশেষে পরিবারটি আবার একত্রিত হয়।
কিন্তু গত রোববার তিনি এবং তার পরিবার আবারও পথে নামতে বাধ্য হন। হোয়াটসঅ্যাপে তিনি আমাকে বলেন, “গত রাতটা ছিল ভয়াবহ। ভোরের দিকে তারা আমাদের ওপর তিনটি বিস্ফোরক রোবট এবং ২০-৩০টি বোমা ফেলেছিল। আমাদের বাড়ি এবং প্রতিবেশীর বাড়ির উপরে একটি কোয়াডকপ্টার ঘোরাফেরা করছিল। এটা ছিল একটা নরকীয় রাত, আমরা ঘুমাতে বা কিছু করতে পারছিলাম না। আমরা আমাদের বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এটাই শেষ।”
গত রাতে হামিদ স্ট্রিটে তাদের পাশের বাড়িতে ইসরায়েলি বাহিনী শেল নিক্ষেপ করেছিল। নিজেদের বাড়ি, জিনিসপত্র এবং স্মৃতি পেছনে ফেলে মোহাম্মদ, ইনাস এবং তাদের সন্তানরা এক রাত রাস্তায় ঘুমিয়ে কাটান। এরপর তারা যা কিছু সাথে নিতে পারছিল, তা নিয়ে দক্ষিণে হাঁটা শুরু করে।
মোহাম্মদ বলেন, “আমরা আজ সকাল থেকে হাঁটছি। এই যাত্রা আমাদের জীবনের দ্বিতীয়-সবচেয়ে খারাপ দিন। প্রথম যাত্রায় তারা আমার স্ত্রীকে আটক করেছিল, আমাদের লুট করেছিল এবং আমাদের আলাদা করে দিয়েছিল। এখন আমরা আবার সেই একই যাত্রায় আছি। আমরা আমাদের বাড়ি এবং গাজাকে বিদায় জানিয়ে অজানার দিকে যাত্রা করছি।”
জীবনের সমস্ত আশা ধ্বংস হয়ে গেছে
ফিলিস্তিনিদের সামনে এখন একটি অসম্ভব পছন্দ: এমন আশ্রয়শিবিরের দিকে পালিয়ে যাওয়া যেখানে ক্ষুধা ও স্নাইপারের গুলি অপেক্ষা করছে, অথবা গাজা সিটিতে থেকে যাওয়া যেখানে ইসরায়েলি বাহিনী পরিকল্পিতভাবে তাদের বেঁচে থাকার প্রতিটি উপায় ধ্বংস করে দিচ্ছে।
ঠিক কতজন পথে নেমেছেন আর কতজন নিজেদের বাড়িতে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
এমাদ সারসাবি নামে গাজার একজন বাসিন্দা মিডল ইস্ট আইকে জানান, তিনি তার বাড়িতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বলেন, “কয়েক মাস ধরে আমি বলতাম যে, আমি আমার স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে নিজের বাড়িতে মরতেও রাজি আছি, কিন্তু আবার বাস্তুচ্যুত হতে চাই না। কিন্তু এখন যা ঘটছে, তা কেবল মৃত্যুর চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর।”
এর আগের দিন, তার প্রতিবেশীর ছাদে থাকা সোলার প্যানেলগুলো বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা দিয়ে তারা পানি পাম্প করতেন এবং ডিভাইসগুলো চার্জ দিতেন।
সারসাবি বলেন, “বোমা পড়লে আমরা সবাই একসঙ্গে মারা যেতাম। কিন্তু এভাবে আমরা পানযোগ্য বা এমনকি অপানযোগ্য পানিও খুঁজে পাচ্ছি না, এবং আমরা ধীরে ধীরে তৃষ্ণায় মারা যাব।”
গাজা সিটিতে মিডল ইস্ট আইয়ের সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, যারা জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির বিরোধিতা করছেন, ইসরায়েলি বাহিনী তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বনগুলো পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে জোর করে বের করে দিচ্ছে। ইসরায়েলি বাহিনী তাদের আক্রমণগুলো গুরুত্বপূর্ণ জীবনধারণের উৎসগুলোর উপর কেন্দ্রীভূত করছে, যেমন হাজার হাজার শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া উঁচু ভবন ও স্কুল, পানির ট্যাংক, ছাদের সোলার প্যানেল, ইন্টারনেট সংযোগ এবং মোবাইল চার্জিং স্টেশন।
কোনো নিরাপদ জায়গা নেই
যারা দক্ষিণে যাচ্ছেন, তাদের জন্য বিপদ আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।
মোহাম্মদ এবং তার পরিবার যেদিকে যাচ্ছেন, সেটা হলো একটি ক্যাম্পের জীবন। সেখানে খাবার খোঁজা মানে প্রতিদিন স্নাইপারের গুলির মুখে পড়া।
বেনি নামের নাহাল ব্রিগেডের একজন ইসরায়েলি স্নাইপার ইসরায়েলি পত্রিকা হারেৎজকে জানিয়েছেন, তিনি এত বেশি সংখ্যক শিশু হত্যা করেছেন যে, তিনি তাদের সংখ্যা গণনা করতে পারেন না। তিনি বলেন, “আমি প্রতিদিন ৫০-৬০টি গুলি চালাই, গণনা করা বন্ধ করে দিয়েছি। আমি জানি না আমি কতজনকে মেরেছি, অনেক। শিশু।”
প্রতিদিন বেনিকে একই কাজ দেওয়া হয়, “গাজার উত্তরে মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা।”
তার দিন শুরু হয় ভোর সাড়ে ৩টায়। তিনি ড্রোন এবং সাঁজোয়া যানের আড়ালে একটি স্নাইপার অবস্থান তৈরি করেন এবং অপেক্ষা করেন।
সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে সাহায্যবাহী ট্রাকগুলো এসে তাদের জিনিসপত্র নামানো শুরু করে। তখন শত শত ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনি লাইনে জায়গা করে নেওয়ার জন্য সামনে এগিয়ে আসে। তারা জানে না, তাদের সামনে একটি অদৃশ্য লাইন আছে।
বেনি বলেন, “একটি লাইন, যা তারা অতিক্রম করলে আমি তাদের গুলি করতে পারি।”
তিনি বলেন, “এটা অনেকটা বিড়াল-ইঁদুরের খেলার মতো। তারা প্রতিবার ভিন্ন রাস্তা দিয়ে আসার চেষ্টা করে, আর আমি স্নাইপার রাইফেল নিয়ে সেখানে থাকি, এবং কর্মকর্তারা আমাকে চিৎকার করে বলেন, ‘একে নামিয়ে দাও, ওকে নামিয়ে দাও’।”
দক্ষিণের এই পরিস্থিতিই গাজা সিটির হাজার হাজার মানুষকে তাদের বাড়ি ছাড়তে বাধা দিচ্ছে।
‘আমার হারানোর কিছু নেই’
গাজা সিটির হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলোতে একটি তীব্র বিতর্ক চলছে—বাড়িতে থেকে মরে যাওয়া নাকি রাস্তায় মৃত্যুর ঝুঁকি নেওয়া।
একজন ফিলিস্তিনি বলেন, “গত বছর দক্ষিণে গিয়ে যে ভুল করেছিলাম, এবার আর সেই ভুল করব না। শুধু নিরাপদ জায়গাই নেই, বরং আমি গাজা সিটিতে আমার বাড়িতে মরতে পছন্দ করি। আমার হারানোর কিছু নেই।”
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে যে, তারা গাজা সিটি দখলের জন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে, আর এর ফলস্বরূপ হাজার হাজার মানুষকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে।
গাজার সিভিল ডিফেন্স রেসকিউ অ্যান্ড সাপোর্ট এজেন্সি জানিয়েছে, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং বেসামরিকদের ওপর রাতের হামলার ফলে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ৭০,০০০ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
তবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতদের সংখ্যা অনেক বেশি দাবি করছে, তাদের মতে, ৩,০০,০০০ মানুষ পালিয়ে গেছে, যার মধ্যে মাত্র এক রাতেই ২০,০০০ জন। এই তথ্যের পার্থক্য রাজনৈতিক। গাজা সিটি যত বেশি খালি বলে দেখানো হবে, ইসরায়েলি সৈন্যরা তত বেশি অবাধে সেখানে থাকা যে কাউকে হত্যা করতে পারবে বলে মনে করবে।
কয়েক রাত রাস্তায় কাটানোর পর মোহাম্মদ এবং তার পরিবার অবশেষে দির আল-বালাহর উত্তরে অবস্থিত নুসেইরাত শরণার্থী ক্যাম্পে পৌঁছান।
দিনের প্রখর তাপে ১২ কিলোমিটার হাঁটার পর তাদের শরীর ছিল ক্লান্ত এবং কাঁধ ভেঙে যাচ্ছিল, কারণ তারা তাদের বাড়ি থেকে যা কিছু বাঁচাতে পেরেছিল, তা বহন করছিল।
তাদের চারপাশে তখনও বোমা পড়ছিল।
মোহাম্মদ বলেন, “এটা আমার জীবনের সেরা সময় হওয়ার কথা ছিল, যখন আমি আমার সন্তানদের বেড়ে উঠতে দেখতে পারতাম এবং তাদের কিছু একটা হতে দেখতে পারতাম। তার পরিবর্তে, আমি আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ দিনগুলোর মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, এবং আমি জানি না আমি তাদের বড় হতে দেখতে পাব কিনা।”
সূত্র: মিডলইস্টআই
Tags: ইসরায়েল, গাজা, ফিলিস্তিন, মিশর, রাফা ক্রসিং, হামাস