গত প্রায় দুই দশক ধরে অনলাইন জগতে নিজেদের ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলো শেয়ার করে নিয়েছে মানুষ, কিন্তু সাম্প্রতিক প্রবণতা ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। নতুন এক জরিপ অনুযায়ী, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী গত এক বছরের তুলনায় এখন কম পোস্ট করছেন। বিশেষ করে, পশ্চিমা বিশ্বের ‘জেন জি’ প্রজন্মের তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়।
কিন্তু এই পরিবর্তন শুধু ইউরোপ-আমেরিকার নয়, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতেও এর লক্ষণ স্পষ্ট। যেখানে একসময় সামাজিক মাধ্যম গ্রামীণ বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল, সেখানে এখন বিজ্ঞাপন আর ইনফ্লুয়েন্সারদের ভিড়ে সেই সংযোগই ফিকে হয়ে আসছে।
নিউ ইয়র্কারের লেখক কাইল চায়কা এই বিষয়টিকে “পোস্টিং জিরো” বলে আখ্যা দিয়েছেন, অর্থাৎ এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে সাধারণ মানুষ অনলাইনে নিজেদের জীবনের মুহূর্তগুলো শেয়ার করে নেওয়ার সার্থকতা খুঁজে পাচ্ছে না। ক্যাটি কে তার নিজস্ব ফিডে বিজ্ঞাপন এবং ব্র্যান্ডের প্রচারণার ভিড়ে বন্ধুদের পোস্ট খুঁজে পাওয়ার সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। একসময় সামাজিক মাধ্যমকে ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিচ্ছবি মনে হলেও, এখন তা যেন এক বিরাট ‘কন্টেন্ট’-এর বাজার।
কারণ
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিবর্তনের পেছনে সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর নিজস্ব পরিবর্তনও দায়ী। টিকটক এবং ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো অসংখ্য ভার্টিক্যাল ভিডিও এবং শক্তিশালী অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীদের সামনে তুলে ধরে, যা তাদের ব্যক্তিগত সংযোগের চেয়ে বাণিজ্যিক বিষয়বস্তুর দিকে বেশি মনোযোগী করে তোলে।
কাইল চায়কা মনে করেন, এই প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রধান গ্রাহক এখন বিজ্ঞাপনদাতারা। ব্যবহারকারীরা যতক্ষণ প্ল্যাটফর্মে যুক্ত থাকছেন, তাদের ব্যবসায়িক মডেল ততক্ষণ সচল থাকছে। চায়কা আরও অনুমান করেন যে, মানুষের তৈরি বিষয়বস্তু ধীরে ধীরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্বারা তৈরি বিষয়বস্তু দ্বারা প্রতিস্থাপিত হবে, যা অসীম এবং সস্তা হলেও অর্থহীন।
বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাতকারে তিনি আরও বলেছেন, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতেও, যেখানে ডেটা এবং ডিজিটাল বিভাজন একটি বড় সমস্যা, সেখানে এই এআই-ভিত্তিক কন্টেন্টের আগ্রাসন আরও জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, কারণ এটি স্থানীয় এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে আরও প্রান্তিক করে দেবে।
প্রশ্ন ও বিকল্প
তবে কি সামাজিক মাধ্যমগুলো বন্ধু এবং পরিবারের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছে? চায়কা বিশ্বাস করেন যে, একটি ধীরগতিতে হলেও এই পতন শুরু হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেছেন, ব্যক্তিগত আদান-প্রদান এখন সরাসরি বার্তা (ডিরেক্ট মেসেজ) এবং ওয়ান-টু-ওয়ান কথোপকথনের দিকে বেশি ঝুঁকছে। হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এই নতুন সামাজিক প্রয়োজনে সাড়া দিতে পারে, যেখানে আরও ব্যক্তিগত এবং অন্তরঙ্গ সংযোগ স্থাপন সম্ভব হবে।
তরুণ প্রজন্মের ভাবনা
তরুণ প্রজন্ম, যারা একসময় গোপনীয়তা নিয়ে কম চিন্তিত বলে মনে করা হয়েছিল, তারাও এখন ব্যক্তিগত জীবনের অনলাইন সম্প্রচারের নেতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে। চায়কা জোর দিয়ে বলেন ‘সামাজিক মাধ্যমের সামাজিক চুক্তি বদলে গেছে। আগে ধারণা ছিল যে, আপনি যত পোস্ট করবেন, তত বেশি দর্শক পাবেন। কিন্তু এখন এই চক্রটি অনেকের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
ব্যক্তিগত জীবনের অনেক মুহূর্ত প্রকাশ পর যে বিড়ম্বনা বা অপমানের ঝুঁকি থাকে, তার তুলনায় প্রাপ্ত সুবিধা এখন অনেক কম।
তবে, এই ‘পোস্টিং জিরো’ প্রবণতা কি আমাদের ফোনের প্রতি আসক্তি কমাতে সাহায্য করবে? চায়কা মনে করেন, যদিও আমরা ‘পিক সোশ্যাল মিডিয়া’ অতিক্রম করে এসেছি, তবুও ২৪/৭ ডিজিটাল কথোপকথন আমাদের জীবনের অংশ হয়েই থাকবে। তবে তা এখন পাবলিক চ্যানেল থেকে গ্রুপ চ্যাট বা ডিএম-এর মতো আরও ব্যক্তিগত পরিসরে চলে যাবে।
আগামীতে জীবন-যাপন যেমন হতে পারে
ভবিষ্যতে, আমাদের ফোনগুলো আরও বেশি টেলিভিশনের মতো হয়ে উঠবে, যেখানে পেশাদার মিডিয়া এবং প্যাসিভ কন্টেন্ট দেখাই প্রাধান্য পাবে। কাইল চায়কা আশাবাদী, এই পরিবর্তনের ফলে মানুষ বাস্তবের ব্যক্তিগত মিথস্ক্রিয়ার গুরুত্ব আরও বেশি করে উপলব্ধি করবে। তিনি মনে করেন, ব্যক্তিগত সেলফি বা প্রাতঃরাশের ছবি পোস্ট করার কারণ এখন আর নেই, কারণ এতে মনোযোগও পাওয়া যায় না এবং আবর্জনাপূর্ণ কন্টেন্টের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়।
হয়তো সামাজিক মাধ্যম তার উন্মোচনের শুরু থেকেই একধরনের বিচ্যুতি ছিল – একটি ধারণা যা সাধারণ মানুষকে তাদের ব্যক্তিগত জীবন জনসমক্ষে প্রকাশ করতে উৎসাহিত করেছিল। এখন আমরা সেই ক্ষতির দিকটি উপলব্ধি করে এই অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছি, যা ইউরোপ-আমেরিকা থেকে শুরু করে তৃতীয় বিশ্বের প্রতিটি ডিজিটাল জীবনে প্রভাব ফেলছে।
Tags: ‘সামাজিকতা’, সামাজিক মাধ্যম