ইরানের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেশম দ্বীপে দফায় দফায় সামরিক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ভোরে দক্ষিণ ইরানের কেশম দ্বীপ এবং বন্দর লেঙ্গেহ এলাকা বিকট বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে বলে স্থানীয় ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা আনাদোলুর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। তবে ভোরে ঘটা এই আকস্মিক বিস্ফোরণের সুনির্দিষ্ট কারণ, এতে হতাহতের সংখ্যা কিংবা অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
এমন এক সংবেদনশীল সময়ে এ হামলার খবর সামনে এলো, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগে ইরানের সাথে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত সৃষ্টি হওয়ার বিষয়টিকে সংবাদমাধ্যমের সামনে অনেকটাই খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করছেন।
স্থানীয় সময় সোমবার (২ নভেম্বর) সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ‘ইরানের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ হয়েছিল এবং সেই যুদ্ধে আমরা জয়ী হয়েছি।’ নিজের দাবির পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি আরও যোগ করেন, ‘বর্তমানে এটাকে আদৌ কোনো যুদ্ধ বলা যায় কিনা তা আমার জানা নেই, কারণ বিগত কয়েক মাস ধরে আমরা সরাসরি কোনো সংঘাত বা লড়াইয়ে লিপ্ত নেই।’
তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই বক্তব্যের বিপরীতে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে কয়েকজন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। তারা নিশ্চিত করেছেন যে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের অভ্যন্তরে থাকা বিভিন্ন কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী নিয়মিতভাবে ছোট পরিসরে হামলা চালিয়ে আসছে।
মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, এসব সামরিক অভিযান মূলত ‘প্রতিরক্ষামূলক’। বিশ্ব বাণিজ্য ও কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বেসামরিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে হুমকি সৃষ্টি করা কিংবা জাহাজে সম্ভাব্য হামলা চালানোর সক্ষমতা যাতে ইরান অর্জন করতে না পারে, তেহরানকে সেই সুযোগ থেকে বিরত রাখতেই তারা এই পদক্ষেপ নিচ্ছেন। ফের যুদ্ধ বাধলে মধ্যপ্রাচ্যের যেসব স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে ইরান।
পৃথক এক প্রতিবেদনে তুর্কি বার্তাসংস্থা আনাদোলু জানিয়েছে, মঙ্গলবার শেষ রাতের দিকে দক্ষিণ ইরানের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক জলসীমা হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত কেশম দ্বীপ এবং হরমোজগান প্রদেশের অন্যতম প্রধান উপকূলীয় শহর বন্দর লেঙ্গেহতে এই বিস্ফোরণ ঘটে।
হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনীতি নিয়ে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা বজায় থাকলেও দুই দেশের কূটনৈতিক চ্যানেল এখনও সচল রয়েছে। সোমবার (২ নভেম্বর) ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর মাধ্যমে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের মধ্যে নিয়মিত বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রেখেছে।
কূটনৈতিক বার্তালাপ এগিয়ে নেওয়ার অংশ হিসেবে কাতারের মধ্যস্থতায় দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ সহজ করতে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি বর্তমানে দোহা সফর করছেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে প্রথম বড় ধরনের যৌথ বিমান হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর পাল্টা জবাবে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত ২৬টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও ইসরায়েলি স্থাপনা লক্ষ্য করে রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান, যাতে শত কোটি ডলারের ক্ষতি হয়। পরবর্তীতে মে মাসে সামরিক উত্তেজনার পর এপ্রিলে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছায় পক্ষগুলো। ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে ২৬ মার্কিন ঘাঁটি ধ্বংস, ক্ষতি শত কোটি ডলারের।
পরবর্তীতে হরমুজ প্রণালিতে বিশ্ব বাণিজ্য ও সাধারণ নৌযান চলাচলের অবাধ স্বাধীনতা বজায় রাখার লক্ষ্যে ১৮ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। তবে প্রণালির সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হওয়ায় সেই স্মারকের পূর্ণ বাস্তবায়ন মাঝপথেই থমকে যায়।
Tags: ইরান, কেশম দ্বীপ, ডোনাল্ড ট্রাম্প, যুক্তরাষ্ট্র, হরমুজ প্রণালি, হামলা