জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, মজুরি স্থবিরতা, জ্বালানির ঊর্ধ্বমুখী মূল্য এবং সরকারি সেবার সংকোচনকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সজুড়ে তীব্র জনঅসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এতে সরকারি সেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অর্থায়ন করা সম্ভব হবে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিও ক্ষোভের বড় কারণ।
বৃহস্পতিবার দেশজুড়ে আয়োজিত বিক্ষোভ ও ধর্মঘটে বিপুল সংখ্যক মানুষ রাস্তায় নেমে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এদিন দেশব্যাপী ১৯৩টি স্থানে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এতে ৫ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেছেন।
তবে আন্দোলনের অন্যতম আয়োজক শ্রমিক সংগঠন সিজিটি-এর দাবি অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীর প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ ৭৩ হাজার। তবে মিছিলের সামনের অংশে কয়েকজন মুখোশধারী বিক্ষোভকারীর সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। লিয়ঁতে কালো পোশাক ও মুখোশ পরা একদল বিক্ষোভকারীর সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। ফ্রান্সে চলমান আন্দোলনের সূত্রপাত গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে।
প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকারের নেওয়া ব্যয় সংকোচন নীতি এবং ২০২৭ সালের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে সংসদে সৃষ্ট অচলাবস্থা এই আন্দোলনকে আরও ঘনীভূত করেছে। গত সেপ্টেম্বরে আন্দোলন শুরুর পর এটিই ছিল সবচেয়ে বড় ধরনের বিক্ষোভ। রাজধানী প্যারিসে কেবল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবেই ৬৫ হাজার মানুষ জমায়েত হয়েছিলেন, যেখানে সিজিটি-এর দাবি অনুযায়ী এই সংখ্যাটি ছিল ৩ লাখ ৫০ হাজার। রাজধানী ছাড়াও মার্সেই, বোর্দো, লিল, তুলুজ, লিয়ঁ, নঁত ও রেনের মতো শহরগুলোতেও বড় ধরনের জনসমাগম দেখা গেছে। প্যারিসে বিক্ষোভের শুরুতে পরিবেশ ছিল অনেকটা উৎসবমুখর। এ ছাড়া তুলুজের কাছাকাছি একটি স্কুলে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। তবে সামগ্রিকভাবে গণপরিবহন চলাচল তুলনামূলক স্বাভাবিক ছিল।
বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ন্যূনতম মজুরিসহ সব শ্রেণির কর্মীর বেতন বৃদ্ধি, করব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এবং সরকারি সেবার মান উন্নয়ন। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ ও শিক্ষক সংকট সমাধানের দাবিও জোরালো হয়েছে। আন্দোলনে শিক্ষক, রেলকর্মী, হাসপাতালের কর্মী, ডাক বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও জ্বালানি খাতের শ্রমিকদের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একাংশেও কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।
প্যারিসের সমাবেশে সিজিটি ইউনিয়নের প্রধান সোফি বেনে বলেন, শ্রমিকদের লড়াইয়ের লক্ষ্য এখন শুধু জয়ী হওয়া নয়, বরং তারা কতটা অধিকার অর্জন করতে পারেন সেটিই বড় প্রশ্ন। এছাড়া তিনি ধনকুবের ও বড় কোম্পানিগুলোর ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের মাধ্যমে সরকারি সেবার অর্থায়নের দাবি জানিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকেও তরুণদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে তীব্র অভিযোগ তোলা হয়েছে। আলজাজিরাকে দেওয়া বক্তব্যে এক শিক্ষার্থী বলেন, পরিবেশগত সংকট, যুদ্ধ, কর্মসংস্থানের অভাব এবং শিক্ষার ক্রমবর্ধমান ব্যয় তরুণদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে। অন্যদিকে, লিল শহরের এক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, বেতন বাড়ছে না, অথচ জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। সেখানে একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। তখন স্কুলগুলোতে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শ্রেণিকক্ষের সংকট, শিক্ষকস্বল্পতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিসংক্রান্ত সমস্যার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন।
শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের পাশাপাশি কয়েকটি শহরে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। প্যারিস ও লিয়ঁতে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করতে বাধ্য হয়। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভ চলাকালে অন্তত ৪৪৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ৫৩ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রায় ৭০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল। এছাড়া লিয়ঁ ও তুলুজে বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে।
ধর্মঘটের কারণে শিক্ষা ও পরিবহন খাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। জাতীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ১৬ শতাংশ শিক্ষক কর্মবিরতিতে যোগ দিয়েছেন এবং প্রায় ৮১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অবরুদ্ধ বা বন্ধের মুখে পড়েছে, যদিও শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর দাবি এই সংখ্যা প্রায় এক হাজার। এছাড়া পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত আইফেল টাওয়ার ও আর্ক দ্য ত্রিয়ম্ফ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। তবে সরকারিভাবে বন্ধ বা অবরুদ্ধ বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৮১ বলে জানানো হয়েছে।
ফ্রান্সের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে সরকার বাজেট ঘাটতি কমাতে ব্যয় সংকোচনের পরিকল্পনা নিয়েছে। তবে এর ফলে সাধারণ মানুষ ও সরকারি সেবার ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। গত বুধবার ফরাসি আইনপ্রণেতারা ২০২৭ সালের বাজেট প্রস্তাবের প্রথম অংশ প্রত্যাখ্যান করায় রাজনৈতিক অচলাবস্থা আরও স্পষ্ট হয়েছে। আগামী ৯ ডিসেম্বর সিনেটে এই বিষয়ে ভোটাভুটি হওয়ার কথা রয়েছে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব মোকাবিলায় গত ১ নভেম্বর থেকে সরকার কৌশলগত মজুত থেকে ১ কোটি ব্যারেল ডিজেল বাজারে ছাড়ার উদ্যোগ নেয়। অর্থনীতিমন্ত্রী রোলাঁ লেসকিউ জানান, এর ফলে বিভিন্ন পেট্রলপাম্পে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি গড়ে ১৫ সেন্ট কমেছে এবং কোনো কোনো স্থানে ২০ সেন্ট পর্যন্ত দাম কমেছে। তবে সাধারণ মানুষের মতে, জ্বালানির দাম সামান্য কমলেও জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো অসহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। প্লাস দ্য লা রিপাবলিক এলাকা থেকে প্লাস দ্য লা নাসিওঁ পর্যন্ত মিছিল করেন আন্দোলনকারীরা। তিন হাজারের বেশি পেট্রলপাম্পে দাম কমার পরিমাণ ২০ সেন্ট পর্যন্ত হয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু আগামী সোমবার শ্রমিক ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সামাজিক সম্মেলনের ঘোষণা দিয়েছেন। এপ্রিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে এই আন্দোলন সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনমত জরিপে বিরোধী দলগুলো এগিয়ে থাকলেও বর্তমান সরকারের সামনে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের বিষয়টি বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে। উল্লেখ্য, গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনার পর থেকে সরকারের কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা বলবৎ রয়েছে। এরপর সংসদের উভয় কক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে সমঝোতার চেষ্টা করা হবে।
Tags: অর্থনীতি, ইউরোপ, ফ্রান্স, বিক্ষোভ, ম্যাক্রোঁ