বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাটের সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের রামদাস মৌজায় অবস্থিত প্রায় ১৪০০ বছরের পুরনো ‘হারানো মসজিদ’, যা বর্তমানে ‘সাহাবায়ে কেরাম মসজিদ’ নামে পরিচিত। প্রাচীন এই স্থাপনাটি এখন দেশজুড়ে ইতিহাসপ্রেমী ও ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। রংপুর-কুড়িগ্রাম মহাসড়কের প্রায় এক কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এই মসজিদটি ইসলামের প্রাথমিক বিস্তার এবং প্রাচীন বাণিজ্যিক পথের ইতিহাস অনুসন্ধানে গবেষকদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
দীর্ঘদিন এই এলাকাটি পতিত জঙ্গল হিসেবে অবহেলিত ছিল।
ঝোপঝাঁপ ও হিংস্র জীবজন্তুর ভয়ে স্থানীয়রা ওই স্থানে সহজে যেতে সাহস পেতেন না।
১৯৮৩-৮৪ সালের দিকে এলাকাটি পরিষ্কার করার সময় প্রাচীন আমলের ফুল অঙ্কিত ইট ও ধ্বংসাবশেষের প্রথম সন্ধান মেলে। এরপর ১৯৮৬ সালের ১০ মহররম স্থানীয় বাসিন্দা আইয়ুব আলী মাটি সরানোর সময় একটি খোদাই করা শিলালিপি উদ্ধার করেন। শিলালিপি বা প্রাচীন ওই ইটে আরবিতে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ এবং ৬৯ হিজরি সন স্পষ্ট অক্ষরে খোদাই করা ছিল। এই আবিষ্কারের পর থেকে ঐতিহাসিক ও স্থানীয় মহলে স্থানটির প্রাচীনত্ব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। বর্তমানে এই শিলালিপি ও প্রাচীন ইটের অংশবিশেষ মসজিদ প্রাঙ্গণেই সংরক্ষিত রয়েছে।
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে প্রায় ২১ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১০ ফুট প্রস্থের ধ্বংসাবশেষ, চারটি স্তম্ভের অবশিষ্টাংশ এবং প্রাচীন কারুকাজে তৈরি মেহরাব। মূল প্রাচীন প্রবেশপথটি বর্তমানে কাচ দিয়ে ঢেকে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করতে আরও নিবিড় প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণের প্রয়োজন রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা অববাহিকা প্রাচীনকাল থেকেই রোমান ও আরব বণিকদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপথ হিসেবে পরিচিত ছিল, যা সিকিম হয়ে চীনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করত।
মসজিদটির প্রতিষ্ঠা নিয়ে লোকমুখে প্রচলিত আছে যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগের ধর্মপ্রচারক সাহাবায়ে কেরামের কয়েকজন, সম্ভবত হজরত আবু ওয়াক্কাস (রা.), চীনে যাওয়ার পথে এখানে মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। মসজিদকে কেন্দ্র করে বর্তমানে গড়ে উঠেছে ‘আস-সাহাবা কমপ্লেক্স’। এখানে একটি হাফিজিয়া ও একটি কওমি মাদ্রাসা পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় বেশ কিছু দোকানপাটও গড়ে উঠেছে। মসজিদটির নির্মাণকাল নিয়ে নানা জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে।
মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা রফিকুল ইসলাম জানান, প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর খুতবা পড়ার মেহরাবটি আজও বিদ্যমান। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে বহু দর্শনার্থী এখানে নামাজ আদায় করতে আসেন, অনেকে বিভিন্ন মানতও নিয়ে আসেন। দর্শনার্থীদের জন্য থাকার ভালো সুযোগ-সুবিধা ও আধুনিক কমপ্লেক্স তৈরি হলে এটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন ও ঐতিহাসিক গবেষণার কেন্দ্র হতে পারে বলে স্থানীয়রা মনে করেন। দেশের বুকে এত প্রাচীন এক ইসলামী ঐতিহ্যের সাক্ষী থাকতে পেরে খুব ভালো লাগছে। ’’।
কুড়িগ্রাম থেকে আসা দর্শনার্থী সিরাজুল ইসলাম পরিবারসহ এখানে এসে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করেছেন। তিনি জানান, শিলালিপি আর সাহাবিদের আগমনের কথা বহু আগে থেকে শুনে আসলেও, সরাসরি কাচে ঘেরা প্রাচীন নিদর্শন দেখে অন্যরকম অনুভূতি হয়েছে। লালমনিরহাটের শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ জানান, এই অঞ্চলে এমন ঐতিহাসিক নিদর্শন থাকাটা অত্যন্ত গর্বের বিষয়। ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় প্রতিদিনই পর্যটকরা এখানে ভিড় করছেন। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দাতা সংস্থার পরিকল্পনায় মসজিদটি আধুনিকায়ন হলে এটি ভবিষ্যতে মুসলমানদের জন্য একটি অন্যতম প্রধান তীর্থকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে। নিয়াজ আহমেদ সিপন, লালমনিরহাট ||। স্থানীয়রা আশা প্রকাশ করেন, দাতা সংস্থার পরিকল্পনা অনুযায়ী কমপ্লেক্সসহ ঐতিহাসিক এই মসজিদটি আরও সুন্দর ও আধুনিক আকারে গড়ে উঠলে এটি মুসলমানদের জন্য একটি অন্যতম প্রধান দর্শনীয় স্থান ও ঐতিহাসিক তীর্থকেন্দ্রে পরিণত হবে। ঢাকা থেকে লালমনিরহাট যাতায়াতের জন্য বাস ও ট্রেন উভয় মাধ্যমই বেশ জনপ্রিয়। সিরাজুল ইসলাম পরিবার নিয়ে প্রাচীন এই নিদর্শনটি দেখতে এসেছেন।
Tags: ইতিহাস, ইসলামী ঐতিহ্য, প্রত্নতত্ত্ব, লালমনিরহাট, সাহাবায়ে কেরাম মসজিদ, হারানো মসজিদ