1. ershadmc@gmail.com : নিউজ ডেস্ক : নিউজ ডেস্ক .
  2. ashraf@websofttechnologyltd.com : businesstimesadmin :
  3. shafidocs@gmail.com : News Desk : News Desk
  4. rezadu31@gmail.com : বিজনেস ডেস্ক : বিজনেস ডেস্ক .
  5. abdullahsheak8636@gmail.com : Shk Abd : Shk Abd

যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব: ভারত-পাকিস্তান প্রেক্ষাপট

রেজাউল করিম
  • আপডেট সময় বুধবার, ৭ মে, ২০২৫

পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হামলায় উভয় দেশে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। এই পরিস্থিতিতে অবিলম্বে সংঘাত ও প্রাণহানির হুমকির বাইরেও একটি গভীর বিপদ লুকিয়ে আছে: অর্থনীতি, বাস্তুতন্ত্র এবং নির্মিত পরিবেশের ধ্বংসলীলা। এই ধ্বংস উভয় দেশকে স্থায়ীভাবে ক্ষতবিক্ষত করবে, তা যে পক্ষই বিজয়ী হোক না কেন।

মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন সভ্যতা সিন্ধু নদের অববাহিকা আবারও এক বিপর্যয়কর ঝুঁকির মুখে। একটি প্রথাগত যুদ্ধও অকল্পনীয় ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে আনতে পারে, যা কয়েক দশকের উন্নয়নকে নস্যাৎ করে দেবে এবং কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে-পাকিস্তানের জলবায়ু পরিবর্তন এবং টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ আলী তৌকির শেখ এই যুদ্ধ নিয়ে এভাবেই কথাগুলো বলেছেন।

যুদ্ধ কেবল অসংখ্য মানুষের জীবনহানি ঘটায় না, অর্থনীতিরও অপূরণীয় ক্ষতি করে। যুদ্ধ শব্দটি শুনতে রোমাঞ্চকর মনে হলেও এর পেছনে থাকে ধ্বংসের এক দীর্ঘ চিত্র। এটি অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং যুদ্ধরত পক্ষগুলোকে কয়েক দশক পিছিয়ে দেয়।

ঐতিহাসিক শিক্ষা: ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাতের অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয়ে ইতিহাস আমাদের তিক্ত শিক্ষা দেয়। ১৯৯৯ সালের কার্গিল সংঘাত, যদিও সীমিত পরিসরের ছিল, কয়েক দিনের মধ্যেই ভারত ও পাকিস্তানের শেয়ারবাজারে তীব্র পতন ঘটায়। বাজার পুনরুদ্ধার হলেও, শত্রুতা শেষ হওয়ার অনেক দিন পরেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব রয়ে যায়। পাকিস্তানের জিডিপি প্রবৃদ্ধি পরবর্তী অর্থবছরে ৪.২ শতাংশ থেকে ৩.১ শতাংশে নেমে আসে। ২০১৯ সালের পুলওয়ামা সংকটের সময়ও এক সপ্তাহের মধ্যে উভয় দেশের অর্থনীতিতে ১২ বিলিয়নেরও বেশি ডলার বাজার মূলধন হ্রাস পায়।

আজ একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ আরও ভয়াবহ হবে। ‘ইকোনমিক ইমপ্যাক্টস অফ এ ফুল-স্কেল ইন্ডিয়া-পাকিস্তান ওয়ার’ বিষয়ক ফরেন অ্যাফেয়ার্স ফোরামের মতে, ভারতের সামরিক অভিযানের দৈনিক খরচ ৬৭০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি সম্ভবত ১৭.৮ বিলিয়ন ডলার হতে পারে – যা চার সপ্তাহের সংঘাতে জিডিপির ২০ শতাংশ সংকোচনের সমান। পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতি ইতিমধ্যেই রিজার্ভের অভাব এবং আইএমএফের উপর নির্ভরতার সাথে লড়াই করছে। যুদ্ধ সম্ভবত অতিমুদ্রাস্ফীতি এবং প্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি তৈরি করবে।

দৈনিক খরচ ১,৪৬০ কোটি থেকে ৫,০০০ কোটি টাকা
এখন প্রশ্ন হলো, একটি যুদ্ধের খরচ আসলে কত? যুদ্ধের খরচ সম্পূর্ণভাবে এর পরিধি এবং তীব্রতার উপর নির্ভর করে। দেশভেদে এই খরচের ভিন্নতা দেখা যায়। ভারত-পাকিস্তান প্রেক্ষাপটে, ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স ফোরাম’-এর মতে, একটি স্বল্পমেয়াদী প্রচলিত যুদ্ধে শুধুমাত্র সরাসরি সামরিক খরচ হিসেবে ভারতের দৈনিক ১,৪৬০ কোটি থেকে ৫,০০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ভিত্তিক একটি অলাভজনক নেটওয়ার্ক ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স ফোরাম’ (faf.ae) বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কিত ঘটনাবলীর উপর প্রতিদিন নজর রাখে এবং “গ্রেট ডিসিশনস” নামক বিভিন্ন বিষয়ে পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করে।

দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে অর্থনৈতিক ক্ষতি
ফরেন অ্যাফেয়ার্স ফোরাম আরও জানিয়েছে যে, একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ক্ষেত্রে, যদি ব্যাপক সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাবগুলো বিবেচনা করা হয়, তাহলে দৈনিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ১.৩৪ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

ভারত বনাম পাকিস্তানের অর্থনীতি
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) অনুসারে, ২০২৫ সালে ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬.২ শতাংশ। বর্তমানে ভারতের জিডিপির মূল্য ৪.৩৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিশ্বব্যাপী চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি। অন্যদিকে, পাকিস্তানের অর্থনীতি এখনও বেশ দুর্বল। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ২.৬ শতাংশ এবং এর জিডিপির মূল্য ৩৩৭.৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

সশস্ত্র সংঘাতে পরিবেশগত ক্ষতির শঙ্কা
এমনকি ভারতের তুলনামূলকভাবে বৃহত্তর অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। আর্থিক বাজার থেকে পুঁজি প্রত্যাহার হবে। অর্থনীতিবিদরা অনুমান করেছেন, সংঘাতের প্রথম মাসে ১০-১৫ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রত্যাহার হতে পারে (মুডিস অ্যানালিটিক্স, ২০২৪)। উভয় দেশের রুপির মান সম্ভবত কমে যাবে এবং তেলের দাম ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়বে। সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে ধীর করে দেবে।

পাকিস্তানের জন্য, সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করা হলে দেশটির কৃষি অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়বে, যা জিডিপির ২২.৭ শতাংশ কিন্তু প্রয়োজনীয় পানির ৯৫ শতাংশের বেশি ব্যবহার করে। এর ফলে তাদের খালগুলোতে, বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমের বাইরে, পানি সংকট দেখা দিতে পারে। খাদ্য নিরাপত্তা নাটকীয়ভাবে খারাপ হবে – ভারতে প্রায় ২০ কোটি এবং পাকিস্তানে ৪ কোটি মানুষ ইতিমধ্যেই পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাবে ভুগছে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) দিকে দুই দেশের ইতিমধ্যেই সামান্য অগ্রগতি অর্থনৈতিক সংকোচন, মুদ্রাস্ফীতি এবং চাকরি হারানোর কারণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে, যা কোটি কোটি মানুষকে আরও দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেবে।

পরিবেশগত বিপর্যয়: ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সশস্ত্র সংঘাত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইতিমধ্যেই বিপর্যস্ত বাস্তুতন্ত্র জুড়ে পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে আনতে পারে। ইউক্রেন ও গাজার সাম্প্রতিক সংঘাত হতাশাজনক শিক্ষা দেয়। ইউক্রেনে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ৭০ লাখ একরেরও বেশি বন ও সুরক্ষিত এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কারখানা থেকে প্রায় ৯০০টি শিল্প দূষণের ঘটনা ঘটেছে। নোভা কাখোভকা বাঁধ ধ্বংসের ফলে ব্যাপক এলাকা প্লাবিত হয়েছে, যা পুনরুদ্ধার করতে আনুমানিক ৫০ বিলিয়ন ইউরো (৫৭ বিলিয়ন ডলার) এবং কয়েক দশক সময় লাগবে।

ভারত ও পাকিস্তানের কৃষিপ্রধান অঞ্চল সম্ভবত দীর্ঘমেয়াদী দূষণের শিকার হবে, যা কোটি কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে। উভয় দেশের জলবায়ু বিষয়ক প্রতিশ্রুতি ভেস্তে যাবে। ২০৩০ সালের মধ্যে পাকিস্তানের রিনিউয়েবল জ্বালানি মিশ্রণের ৬০ শতাংশে উন্নীত করার অঙ্গীকার এবং ভারতের কার্বন নির্গমন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে যদি সম্পদ সংঘাত ও পুনরুদ্ধারের দিকে চলে যায়।

এই পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্টভাবে যুদ্ধরত দেশগুলোর অর্থনীতির উপর যুদ্ধের সম্ভাব্য বিধ্বংসী প্রভাব তুলে ধরে। সামরিক ব্যয়ের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ক্ষতি একটি দেশের উন্নয়নকে বহু বছর পিছিয়ে দিতে পারে।

লেখক: সাংবাদিক ও উন্নয়নকর্মী

Tags:

এই ধরনের আরও নিউজ
© কপিরাইট ২০২৫ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: NagorikIT