আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক সরওয়ার আলম তালুকদারের বিরুদ্ধে গ্রাহকের আমানত আত্মসাৎ, স্বাক্ষর জালিয়াতি ও নিয়মবহির্ভূত ঋণ বিতরণের মতো গুরুতর সব অনিয়ম উঠে এসেছে। ২০১৯ সালের ১৬ নভেম্বর থেকে ২০২১ সালের ৯ জুন পর্যন্ত ওই শাখায় দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে ১৯টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠে, যার মধ্যে তদন্তে ১৭টিই প্রমাণিত হয়েছে। ব্যাংকের কেন্দ্রীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, সব মিলিয়ে ২৩ লাখ ৯২ হাজার ২৩৪ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এসব অভিযোগ তদন্তে ২০২১ সালের জুনে ব্যাংকের কেন্দ্রীয় কার্যালয় তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২২ সালের ৩ মার্চের অভিযোগনামায় গ্রাহকের আমানত আত্মসাৎ, জাল স্বাক্ষরে চেক নগদায়ন, গ্রাহকের নামে ঋণ বিতরণ দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন, এসডিপিএসের টাকা আত্মসাৎ এবং ঋণনীতিমালা লঙ্ঘন করে ঋণ দেওয়াসহ ১৯টি অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগনামা অনুযায়ী, অধীনস্থ এক কর্মকর্তার কাছ থেকে জোরপূর্বক চেক নিয়ে প্রাপকের স্বাক্ষর জাল করে ১ লাখ ২০ হাজার ৯৬৬ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ ছিল। এ ছাড়া আমানতকারীদের সঙ্গে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে ৯ লাখ ৮ হাজার ৩০০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও আনা হয়। গ্রাহকের নামে ঋণ বিতরণ দেখিয়ে ভুয়া স্বাক্ষরের মাধ্যমে ২ লাখ টাকা আত্মসাৎ, এসডিপিএস হিসাবের রসিদ পরিবর্তন করে ২৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ এবং এসডিপিএসের স্থিতির বিপরীতে ঋণ পরিশোধের ২ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও ছিল। এ ছাড়া সরওয়ার আলম তালুকদারের স্ত্রী রুনা লায়লার নামে ঋণ সার্কুলার লঙ্ঘন করে ৬৩ হাজার ৬৩০ টাকা অতিরিক্ত ঋণ প্রদান, প্রধান কার্যালয় থেকে নামঞ্জুর করা এক উদ্যোক্তাকে নিয়ম ভেঙে ১ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া এবং নগদ টাকা জমা ছাড়াই জমা-উত্তোলন দেখিয়ে ৩ লাখ টাকা আত্মসাতের। এসডিপিএসের মাসিক কিস্তি আদায় করে ৪ হাজার টাকা এবং হিসাবধারীদের কাছ থেকে মাসিক জমার ৭৯ হাজার টাকা ব্যাংকে জমা না দেওয়ার অভিযোগও তদন্তের আওতায় ছিল। রহিমা বেগম জানান, ২০২১ সালে অভিযোগ করলেও তদন্তের ফল সম্পর্কে তাঁরা জানতে পারেননি। আবুল খায়ের জানান, ২০২০ সালে এসডিপিএসের বিপরীতে নেওয়া ঋণের ৩০ হাজার টাকা পরিশোধ করলেও চলতি বছরের আগস্টে তিনি জানতে পারেন, তাঁর নামে ওই ঋণ এখনো বকেয়া রয়েছে।
অভিযোগের তালিকায় রয়েছে গ্রাহকের আমানত হাতিয়ে নেওয়া, ঋণের জামানত হিসেবে রাখা চেকে জাল স্বাক্ষর করে টাকা তোলা, ভুয়া ঋণ বিতরণ দেখানো এবং স্ত্রী ও স্বজনদের নিয়মবহির্ভূত ঋণ দেওয়া। ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট ব্যাংকের কেন্দ্রীয় সহকারী ব্যবস্থাপক মো. আবদুর রহিম শিকদারের স্বাক্ষরিত চিঠিতে এসব আর্থিক অনিয়মের তথ্য নিশ্চিত করা হয়।
এত বড় ধরনের জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ার পরও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তির মাত্রা নিয়ে ব্যাংকটির গ্রাহক ও সংশ্লিষ্ট মহলে ক্ষোভ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। দায়সারাভাবে কেবল ২০২৪ সালের ১ জুলাই এবং ২০২৫ সালের ১ জুলাই—এই দুই বছরের বেতনবৃদ্ধি স্থগিতের লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের চাকরি প্রবিধানমালা ২০০৫ অনুযায়ী এটি একটি বিভাগীয় মামলা হিসেবে বিবেচিত হলেও, লঘুদণ্ড দেওয়ার কারণ হিসেবে তাঁর ক্ষমাপ্রার্থনা, লিখিত জবাব এবং চাকরির মেয়াদ ও বয়সকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ২০০৫-এর সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী দায়িত্বে অবহেলা, অসদাচরণ, আত্মসাৎ, তহবিল তসরুপ ও প্রতারণামূলক অপরাধের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছিল।
ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ, তদন্তে জালিয়াতি প্রমাণিত হওয়ার পরেও তাঁরা তাঁদের জমাকৃত টাকা ফেরত পাননি। বরং ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নতুন করে আমানত আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। চলতি বছরের ২৫ আগস্ট থেকে পাওয়া নতুন অভিযোগ অনুযায়ী, গ্রাহক পারভীন আক্তার, পারভীন বেগম ও আবুল খায়েরের মোট কয়েক হাজার টাকা আত্মসাতের দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, গ্রাহক পারভীন আক্তারের ৫ হাজার ১৫৬ টাকা, পারভীন বেগমের ৩৮ হাজার ৪০৯ টাকা এবং আবুল খায়েরের ৩২ হাজার ৫১৭ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
গ্রাহক সোহেল আহমেদের দাবি, ঋণ নেওয়ার সময় জামানত হিসেবে দেওয়া চেকে জালিয়াতি করে অতিরিক্ত ২ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানিয়েও প্রতিকার পাননি, উল্টো প্রাণনাশের হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন। রহিমা বেগম ও তাঁর স্বামী আবদুর রহমানের ক্ষেত্রেও একইভাবে স্বাক্ষর জালিয়াতি করে ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা অতিরিক্ত ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় সে সময় থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন বলেও দাবি করেন।
প্রবাসী শফিউল আজম জানিয়েছেন, তিনি এসডিপিএস হিসাব থেকে ২৬ হাজার ৫৩৬ টাকা আত্মসাতের শিকার হয়েছেন। এমন আরও অনেক ভুক্তভোগী তাঁদের আমানত ও ঋণের দায় নিয়ে মানবেতর পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন। অভিযোগের বিষয়ে প্রতিকার না পাওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র হতাশা ও অনিশ্চয়তা কাজ করছে।
বর্তমান ব্যবস্থাপক নাছির উদ্দিন জানিয়েছেন, নতুন করে চারজন গ্রাহক এসডিপিএস-এর টাকা আত্মসাতের লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তবে এসব নতুন অভিযোগের সত্যতা বা তদন্তের অগ্রগতি এখনো নিশ্চিত নয়।
ব্যাংকটির কুমিল্লা অঞ্চলের আবাসিক ব্যবস্থাপক জামাল উদ্দিন জানান, সরওয়ার আলমের বিরুদ্ধে নতুন কোনো অভিযোগ এখনো তাঁর দপ্তরে পৌঁছায়নি, তবে পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মোফাজ্জল হোসেন জানিয়েছেন, তিনি নতুন দায়িত্ব নেওয়ায় পুরো বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে দেখবেন। খোঁজখবর নিয়ে এ বিষয়ে পরে বক্তব্য দেব।’।
অভিযুক্ত সরওয়ার আলম তালুকদার অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা নতুন অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। আগের বিভাগীয় শাস্তির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেছেন বলেও জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগীরা এখন তাঁদের টাকা ফেরত পাওয়া এবং নতুন অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্তের অপেক্ষায় আছেন। প্রশাসনিক এই দায়সারা শাস্তি ও জবাবদিহিতার অভাব নিয়ে ব্যাংকিং খাতের নীতিনির্ধারক পর্যায়েও নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
চৌদ্দগ্রামের বারৈয়া গ্রামের বাসিন্দা সরওয়ার আলম তালুকদার বর্তমানে কুমিল্লা আঞ্চলিক কার্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে আনা ১৯টি অভিযোগের মধ্যে অধীনস্থ কর্মকর্তার চেক ব্যবহার করে টাকা তোলা, রসিদ জালিয়াতি ও ঋণ নীতিমালা লঙ্ঘনের মতো বিষয়গুলো ব্যাংকিং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন গ্রাহকরা।
আর্থিক ক্ষতি ও মানসিক হয়রানির শিকার গ্রাহকদের দাবি, শুধু বেতনবৃদ্ধি স্থগিত নয়, বরং আত্মসাৎ করা অর্থ পুনরুদ্ধার এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
Tags: আত্মসাৎ, আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক, আর্থিক অনিয়ম, গ্রাহক হয়রানি, চৌদ্দগ্রাম