যুক্তরাজ্যে ক্রমবর্ধমান মুসলিম-বিদ্বেষ মোকাবিলায় সরকার দ্রুত একজন বিশেষ উপদেষ্টা নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। ‘বিভেদের আরেকটি দশক’ প্রতিরোধ এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের সুরক্ষায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো ডাউনিং স্ট্রিটে ব্রিটিশ মুসলিম নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি এই ঘোষণা দেন। বৈঠকে তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন কমিউনিটিজ বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেনার। তিনি বলেন, এসব সমস্যার সমাধান জরুরি।
বার্নহাম বলেন, মুসলিম সম্প্রদায় বর্তমানে যে প্রতিকূল পরিস্থিতি ও বিভেদের সম্মুখীন, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশেষ করে অনলাইনে ছড়ানো বিদ্বেষ তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তরুণ প্রজন্মের ব্রিটিশ মুসলিমদের মনে যেন এই ধারণা জন্মে যে দেশটি তাদেরও এবং তাদের পাশে রয়েছে, সেজন্য তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা অন্য কোনো মহলের পক্ষ থেকে মুসলিমদের নিয়ে ব্যবহৃত আপত্তিকর ভাষারও তীব্র সমালোচনা করেন তিনি, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠকে অংশগ্রহণকারী ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্টের প্রধান আকিলা আহমেদ এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। এর পেছনে উগ্র ডানপন্থী মতাদর্শের বিস্তারকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, মুসলিমরা নানা ক্ষেত্রেই সাফল্য অর্জন করলেও বর্তমানে তারা ব্যাপক বর্ণবাদী হামলার শিকার হচ্ছে।
বিশেষ করে মসজিদগুলোতে আক্রমণের ঘটনা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ব্রিটিশ দাতব্য সংস্থা টেল মামার তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে লন্ডনে মুসলিমবিদ্বেষী অপরাধ ছয় গুণ বেড়েছে। ২০২৬ সালের জুনের শেষ পর্যন্ত ১ হাজার ৩১টি ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে, যা বছর শেষে পূর্ববর্তী বছরের ১ হাজার ৯০৯টি অভিযোগের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। মুসলিমবিদ্বেষী অপরাধ বাড়ছে, প্রতি পাঁচ দিনে একটি মসজিদে হামলা বা বর্ণবাদী ঘটনার শিকার হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রতি ছয়জনের একজন ব্রিটিশ মুসলিমদের সম্পর্কে বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব পোষণ করেন। তবে গত এক বছরে তুলনামূলক কম গুরুতর হয়রানির ঘটনা কমেছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সময় থেকেই মুসলিম-বিদ্বেষ মোকাবিলায় বিশেষ প্রতিনিধি নিয়োগের বিষয়টি আলোচনায় ছিল। মূলত মুসলিমবিদ্বেষের সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং বিভিন্ন কমিউনিটি, স্কুল ও প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় করার লক্ষ্যে এই পদটি সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত সেপ্টেম্বরে লেবার পার্টির সংসদ সদস্য আফজাল খানও এই নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সরকারকে সতর্ক করেছিলেন।
সরকার এবার আরও বড় একটি পদক্ষেপ বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর হয়ে লড়াই করে প্রাণ হারানো মুসলিম সেনাদের স্মরণে একটি যুদ্ধস্মৃতিসৌধ তৈরির প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হবে। কিয়ার স্টারমারের উদ্যোগে শুরু হওয়া এই প্রকল্পে প্রায় ১০ লাখ পাউন্ড বা ১৩ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার ব্যয় হতে পারে। এটি শুধু একটি স্মৃতিস্তম্ভ নয়, বরং ব্রিটিশ ইতিহাসে মুসলিমদের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেখছে সরকার। বার্নহামের ভাষায়, এ বিষয়ে বিরোধী দলগুলোর অবস্থান ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’।
দীর্ঘমেয়াদী এই পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো সমাজে সংহতি বজায় রাখা এবং বিভেদ সৃষ্টিকারী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করা। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্টসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করবেন। বার্নহাম আশাবাদী যে, সরকারের এই সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে তরুণ ব্রিটিশ মুসলিমরা একটি নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ খুঁজে পাবেন এবং তাদের অর্জনের পথে কোনো ঘৃণা বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।
Tags: অ্যান্ডি বার্নহাম, ব্রিটিশ রাজনীতি, মুসলিম সম্প্রদায়, মুসলিম-বিদ্বেষ, যুক্তরাজ্য