কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (সিআরএফ) এক জরিপ অনুযায়ী, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় ৯০ শতাংশ ভোটার ভোট দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘আনকভারিং দ্য পাবলিক পালস: আ নেশনওয়াইড সার্ভে’ শীর্ষক জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশকালে এই তথ্য জানানো হয়।
জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, অতীতে আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়া ভোটারদের ৪৮ শতাংশ এখন বিএনপিকে ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
এছাড়া, আওয়ামী লীগের সাবেক ভোটারদের ২৯.৯ শতাংশ জামায়াতে ইসলামীকে এবং ৬.৫ শতাংশ জাতীয় নাগরিক পার্টি বা ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) প্রার্থীদের সমর্থন দিতে চান।
সার্বিকভাবে এনসিপি প্রার্থীদের প্রতি জনসমর্থন রয়েছে ১৭ শতাংশ।
ভোটারদের পছন্দ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। জরিপ অনুযায়ী, প্রথমবারের মতো যারা ভোটার হয়েছেন (নতুন ভোটার), তাদের ৩৭.৪ শতাংশ জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছেন। যেখানে ২৭ শতাংশ বিএনপিকে এবং ১৭ শতাংশ এনসিপিকে সমর্থন জানিয়েছেন।
জরিপে ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দুর্নীতি উঠে এসেছে। ৬৭ শতাংশেরও বেশি ভোটার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।
যুক্তরাজ্যের রিডিং ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির ভিজিটিং প্রফেসর এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ বলেন, ভোটাররা মূলত দুর্নীতি দমন এবং নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে প্রার্থীদের বিচার করবেন।
রাজনৈতিক তথ্যের উৎসের ক্ষেত্রে, প্রায় ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন যে তারা এখনো রাজনৈতিক খবরের জন্য টেলিভিশনের ওপর নির্ভর করেন। তবে ৭৩ শতাংশ ভোটার অন্তত দুটি ভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য যাচাই-বাছাই (ক্রস-চেক) করেন, যা ভুল তথ্য বা গুজব সম্পর্কে তাদের সচেতনতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়েও ভোটারদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ দেখা গেছে। প্রায় ২০ শতাংশ ভোটার নিরাপদে ভোট দিতে পারা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
উত্তরদাতারা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে বাধা, ব্যালট বাক্স ছিনতাই এবং প্রাতিষ্ঠানিক নির্বাচনী জালিয়াতিকে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ভোটকেন্দ্রে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও আতঙ্ক আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয়। জরিপে দেখা গেছে, বিএনপির ৪৯ শতাংশ, এনসিপির ৭৩ শতাংশ এবং জামায়াতের ৭১ শতাংশ সমর্থক ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন নিয়ে চিন্তিত।
ভোট দেওয়ার বিবেচ্য বিষয় সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে, ৩০.৪ শতাংশ উত্তরদাতা জানান তারা দলীয় প্রতীকের ওপর ভিত্তি করে ভোট দেন। অন্যদিকে, ৩০.২ শতাংশ প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেন। ধর্মীয় বিষয়গুলো তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হলেও, দুর্নীতি দমনের প্রতিশ্রুতি সবচেয়ে প্রভাবশালী ফ্যাক্টর হিসেবে উঠে এসেছে।
প্রায় ৬৭.৩ শতাংশ ভোটার বলেছেন দুর্নীতি দমনের অঙ্গীকার তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে ৩৫.৯ শতাংশ ভোটার ধর্মীয় বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
সিআরএফ উল্লেখ করেছে যে, নির্বাচনের আগে ভোটারদের কাছে দুর্নীতিই একমাত্র এবং সবচেয়ে জরুরি উদ্বেগের বিষয়, যা ৬৭.৩ শতাংশ উত্তরদাতা চিহ্নিত করেছেন। লিঙ্গ ও বয়স নির্বিশেষে সব শ্রেণির ভোটাররা এমন নেতৃত্বের দাবি জানিয়েছেন যারা সহানুভূতিশীল ও কার্যকর। তারা এমন নেতা চান যারা নাগরিকদের কথা শোনেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষমতা দেখান।
প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার মনে করেন, ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রার্থীর ব্যক্তিগত দক্ষতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, নির্বাচনী জালিয়াতি এবং সহিংসতাকে গুরুতর উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অনেক ভোটার প্রাতিষ্ঠানিক আশ্বাসের চেয়ে ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
জরিপে সাবেক আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মধ্যে লক্ষণীয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যাদের অনেকেই এখন বিকল্প রাজনৈতিক দলের দিকে ঝুঁকছেন।
বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক অপিনিয়ন ইনস্টিটিউটের (বেপসি) সহযোগিতায় সিআরএফ এই গবেষণাটি পরিচালনা করে।
সিআরএফ-এর নির্বাহী সমন্বয়ক জাকারিয়া পলাশ প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন। সংবাদ সম্মেলনে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
বিটি/ আরকে