বলিউডে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত বিষয় স্বজনপ্রীতি বা নেপোটিজম নিয়ে নিজের অবস্থান ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা খোলামেলাভাবে প্রকাশ করেছেন অভিনেত্রী সারা আলী খান। তারকা দম্পতির সন্তান হিসেবে হিন্দি চলচ্চিত্র শিল্পে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন তিনি। তবে একই সঙ্গে নিজের পরিশ্রমের সঠিক মূল্যায়ন দাবি করে জানিয়েছেন, কাজের সুযোগ পেতে কিংবা চুক্তির দর-কষাকষিতে বাবা সাইফ আলী খান কখনো কোনো ধরনের তদবির করেননি।
চলতি বছর মুদাসসার আজিজ পরিচালিত ‘পতি পত্নী অউর ওহ দো’ এবং আকাশ কৌশিকের স্পাই কমেডি ‘উড়তা তীর’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন সারা। এই দুটি সিনেমাতেই তার বিপরীতে সহশিল্পী হিসেবে কাজ করছেন আয়ুষ্মান খুরানা। সাইফ আলী খান ও অমৃতা সিংয়ের মেয়ে হওয়ায় দীর্ঘ আট বছরের অভিনয় জীবনে তাকে প্রতিনিয়ত স্বজনপ্রীতির সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে নিজের অর্জিত সুবিধা ও ব্যক্তিজীবনের সংগ্রাম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন এই অভিনেত্রী।
ফিল্মফেয়ারকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে সারা স্বীকার করেন যে তারকা পরিবারের সন্তান হওয়ার সুবাদে তার জন্য বড় প্ল্যাটফর্মের দরজা সহজেই উন্মুক্ত হয়েছিল। তিনি বলেন, “আমি এতটা সরল বা বাস্তবতা সম্পর্কে এতটা অজ্ঞ নই যে স্বীকার করব না, এই পরিচয় আমার জন্য অনেক রাস্তা খুলে দিয়েছে। এটি আমাকে কাজের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে এবং অভিনেত্রী হওয়ার আগেই ব্যাপক পরিচিতি ও খ্যাতি এনে দিয়েছে।”
চলচ্চিত্রে অভিষেকের আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সারা আলী খানের বিপুল পরিচিতি তৈরি হয়েছিল। অভিষেক কাপুর পরিচালিত ‘কেদারনাথ’ সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির চার মাসেরও কম সময় আগে আনুষ্ঠানিকভাবে ইনস্টাগ্রামে যুক্ত হন তিনি। সামাজিক মাধ্যমে আত্মপ্রকাশের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তার অনুসারীর সংখ্যা ২ লাখ ৪৬ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এটি তারকা সন্তান হিসেবে তার জনপ্রিয়তার পথকে আরও সহজ করেছিল।
তবে এই প্রাথমিক সুবিধার পাশাপাশি স্বজনপ্রীতির নেতিবাচক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সারা। তিনি উল্লেখ করেন, স্বজনপ্রীতি শব্দটি এখন পুরোপুরি একটি নেতিবাচক ধারণায় পরিণত হয়েছে, যা একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত কষ্ট ও কঠোর পরিশ্রমকে জনসম্মুখে আড়াল করে ফেলে। একই ধরনের সমালোচনার মুখে থাকা সমসাময়িক অভিনেত্রী জাহ্নবী কাপুর ও অনন্যা পান্ডের হয়েও তিনি কথা বলেন। জাহ্নবী হলেন শ্রীদেবী ও বনি কাপুরের সন্তান, আর অনন্যা অভিনেতা চাঙ্কি পান্ডের মেয়ে। আমার যেটা ভালো লাগে না, তা হলো—এটি একজনের নিজের পরিশ্রমকে আড়াল করে দেয়। ”।
এ প্রসঙ্গে সারা বলেন, “জাহ্নবী, অনন্যা কিংবা আমি—আমরা কে কোন পরিবারে জন্ম নেব, তা নিজে থেকে নির্বাচন করিনি। আমরা কেবল ভাগ্যবান ছিলাম। যে বিষয়টি আমাদের কোনো ভুল বা দোষ নয়, তার জন্য ধারাবাহিকভাবে শাস্তি পাওয়া বা কটূক্তি সহ্য করা মোটেও ন্যায্য বলে মনে করি না।”
ইন্ডাস্ট্রিতে দীর্ঘ আট বছর কাজ করার পরও প্রতিনিয়ত একই বিষয়ের জবাবদিহি করা যুক্তিসঙ্গত নয় বলে মনে করেন সারা। তিনি বলেন, “আমরা কি বাড়তি সুবিধা পাই? হ্যাঁ, অবশ্যই পাই। এমন একটি স্বপ্নের অভিষেকের সুযোগ আমাদের দেওয়া হয়েছিল, যা অনেকেরই ক্যারিয়ারের মূল লক্ষ্য থাকে। কিন্তু আট বছর ধরে কাজ করার পরও যদি আমাকে এই একই ব্যাখ্যা দিয়ে যেতে হয়, তবে তার পুরো দায়ভার শুধু আমাদের ওপর থাকা উচিত নয়।”
নিজের একক পারিবারিক জীবনের প্রসঙ্গ টেনে সারা জানান, ২০০৪ সালে তার বাবা সাইফ আলী খান ও মা অমৃতা সিংয়ের বিচ্ছেদ ঘটে। তখন সারার বয়স ছিল মাত্র ৯ বছর। বিচ্ছেদের পর থেকে তিনি মূলত মা অমৃতা সিংয়ের কাছেই বড় হয়েছেন। ফলে তার ক্যারিয়ারের পরিচালনায় বাবা কোনো প্রশাসনিক বা বাণিজ্যিক ভূমিকা রাখেননি।
সারা আরও বলেন, “আমি একক মায়ের কাছে বেড়ে উঠেছি। আমার এমন কোনো বাবা ছিলেন না, যিনি বিভিন্ন প্রযোজনা সংস্থায় ঘুরে আমার চুক্তির অর্থ নিয়ে দর-কষাকষি করেছেন কিংবা কোনো সিনেমায় নেওয়ার জন্য পরিচালকদের কাছে সুপারিশ করেছেন। এমনকি প্রথম সিনেমা নিয়ে যখন ঘোর সংকট তৈরি হয়েছিল, তখন পুরো বিষয়টি আমাকে একাই সামলাতে হয়েছিল। ইন্ডাস্ট্রিতে আমার কোনো গডফাদার ছিল না।”
২০১৮ সালে ‘কেদারনাথ’ সিনেমার মাধ্যমে বলিউডে অভিষেক হয় সারার। সে সময় সাইফ আলী খানও বলিউডের একজন প্রতিষ্ঠিত তারকা ছিলেন। তবে, তত দিনে তিনি নিজের জীবনে এগিয়ে গেছেন এবং অভিনেত্রী কারিনা কাপুরকে বিয়ে করেছেন। অন্যদিকে সারার মা অমৃতা সিং আশির দশক ও নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে প্রথম সারির অভিনেত্রী ছিলেন। সারার জন্মের পর অভিনয় থেকে বিরতি নেন তিনি। ১৯৯৪ সালে তিনি বিরতিতে যাওয়ার আট বছর পর কাজ শুরু করলেও নিয়মিত হননি। ১৯৯৪ সালে অভিনয় থেকে দূরে সরে যাওয়ার পর আট বছর বাদে আবার ফিরলেও নিয়মিত সিনেমায় তাকে দেখা যায়নি।
‘কেদারনাথ’ সিনেমার শুটিং চলাকালীন শিডিউল সংক্রান্ত জটিলতা দেখা দিলে সিনেমাটির কাজ বিলম্বিত হয়। ওই সময়ে সারা অন্য একটি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ‘কেদারনাথ’-এর প্রযোজকরা সারার বিরুদ্ধে ৫ কোটি রুপির ক্ষতিপূরণ মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে বিষয়টি আদালতের বাইরে সমঝোতার মাধ্যমে আইনিভাবে নিষ্পত্তিকৃত হয়।
সেই সময় প্রযোজকদের সাথে আলোচনা করে পরিচালক রোহিত শেঠি তার নিজের পরিচালিত পুলিশি অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্র ‘সিম্বা’ থেকে প্রয়োজনীয় সময় বের করে দেন, যেন সারা নির্বিঘ্নে ‘কেদারনাথ’ সিনেমার বাকি শুটিং শেষ করতে পারেন। সে সময় গুঞ্জন উঠেছিল যে এই বিরোধ মেটাতে সাইফ আলী খান হস্তক্ষেপ করেছিলেন। তবে সারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, সেই পরিস্থিতি তিনি নিজেই সমাধান করেছিলেন এবং ক্যারিয়ারের জটিলতম সময়েও বাবার কোনো রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক সহায়তা তিনি পাননি।
Tags: কেদারনাথ, বলিউড, সাইফ আলী খান, সারা আলী খান, স্বজনপ্রীতি