আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের প্রায় সব উন্নয়ন সহযোগী তাদের সহায়তার প্রতিশ্রুতি আপাতত স্থগিত রেখেছে। রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল ও নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত তারা ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’ নীতি অনুসরণ করছে বলে শনিবার জানিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।
এই স্থবিরতার মধ্যে রয়েছে নতুন প্রকল্প অনুমোদন বিলম্বিত হওয়া এবং ঋণের কিস্তি ছাড়ে দেরি। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে গত এক বছরের বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। ইংরেজি দৈনিক ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এর এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে যদি সরকার পরবর্তী প্রশাসনের জন্য প্রতিশ্রুত সহায়তা কাজে লাগানোর প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে চলতি অর্থবছরের শেষ দিকে আর্থিক চাপ বাড়তে পারে।
তাদের মতে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ছাড়া চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই–অক্টোবর) কোনো বহুপক্ষীয় বা দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন অংশীদার মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি স্বল্পসুদী ঋণ কিংবা অনুদানের প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বড় বহুপক্ষীয় ঋণদাতা বিশ্বব্যাংক জুলাই থেকে অক্টোবরের মধ্যে মাত্র ১ কোটি ২৪ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলারের সহায়তা অনুমোদন করেছে। একই সময়ে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি), জাপান, চীন, রাশিয়া ও ভারত কোনো আর্থিক প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
ইআরডি সূত্র জানায়, এই পাঁচ প্রধান দাতা গত চার মাসে এক ডলারও নিশ্চিত করেনি। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)সহ বড় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো একটি নির্বাচিত ও স্থিতিশীল সরকারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা চুক্তি করতে আগ্রহী।
মানবিক সহায়তা ও চলমান গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অর্থছাড় অব্যাহত থাকলেও নতুন বাজেট সহায়তা ও বড় অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থায়ন অনেকটাই ধীর হয়ে গেছে।
ইআরডির হিসাবে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে এডিবি ৫৮ কোটি ১৭ লাখ ১০ হাজার ডলারের প্রতিশ্রুতি দিলেও ছাড় দিয়েছে ২৪ কোটি ৮৮ লাখ ১০ হাজার ডলার যা মোট প্রতিশ্রুতির অর্ধেকেরও কম।
তবে উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশের চলমান প্রকল্পগুলোর অর্থ ছাড় অব্যাহত রেখেছে। ইআরডির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ২০২৫ সালের শেষ দিকে স্বাক্ষরের কথা থাকা কয়েকটি বড় চুক্তি ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, “এ ধরনের বড় রাজনৈতিক রূপান্তরের আগে দাতারা স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকি এড়িয়ে চলে। বহু বিলিয়ন ডলারের নতুন সহায়তা ছাড়ের আগে তারা স্পষ্ট জনমত ও পূর্বানুমেয় নীতিপরিবেশ চায়।”
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনী অনিশ্চয়তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহায়তার গতিপ্রকৃতিতে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিবর্তনও যুক্ত হয়েছে। ২০২৫ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের এক নির্বাহী আদেশের পর তথাকথিত ‘ট্রাম্প ইফেক্ট’-এর কারণে ইউএসএইডের অর্থায়নে পরিচালিত বহু প্রকল্প পর্যালোচনা ও সাময়িক স্থগিত হয়, যার প্রভাব এনজিও খাতজুড়ে পড়ে।
এপ্রিলে আইএমএফ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঋণকিস্তি ছাড় স্থগিত করে, রাজস্ব আহরণে গভীর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে। অন্তর্বর্তী সরকার এই রূপান্তরকালীন সময়ে ওই সংস্কার পুরোপুরি বাস্তবায়নে হিমশিম খাচ্ছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য মানবিক সহায়তা প্রয়োজনীয় বাজেটের প্রায় ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
আগামী নির্বাচনটি হবে গত ১৫ বছরের মধ্যে প্রথম নির্বাচন, যা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। দলটি ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হয়।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)কে সম্ভাব্য শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে নির্বাসিত নেতাদের দেশে ফেরা এবং প্রচারণা শুরুর পর (২২ জানুয়ারি থেকে) সম্ভাব্য সহিংসতা নিয়ে উন্নয়ন সহযোগীরা নিবিড়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের নির্বাহী চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার পর থেকেই দাতারা প্রতিশ্রুতি স্থগিত করেছে। তিনি দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে বলেন, “পরবর্তী সরকারের উন্নয়ন অগ্রাধিকার ও কৌশল, পাশাপাশি দাতাদের নিজস্ব অগ্রাধিকারের কারণে বিদেশি অংশীদাররা অপেক্ষা-পর্যবেক্ষণ নীতি নিয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, আর্থিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে নতুন প্রকল্প হাতে নিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সতর্ক অবস্থানও সহায়তার চাহিদা কমিয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অর্থনীতি অধ্যাপক ড. মঈনুল ইসলাম বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে উন্নয়ন সহযোগীরা অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ নীতি নিয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, বাজেট সহায়তা কমে যাওয়া, বড় প্রকল্পে সরকারের সতর্কতা এবং নির্বাচন ঘনিয়ে আসার কারণে দাতাদের প্রতিশ্রুতি হ্রাস পেয়েছে। তিনি জানান, কিছু দাতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত সহায়তার সর্বোচ্চ সীমাও ইতোমধ্যে পূর্ণ হয়ে গেছে।
তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, পরবর্তী প্রশাসনের জন্য সহায়তার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে আগাম প্রস্তুতি নিতে, যাতে উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত না হয়। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতার কারণে পাইপলাইনে আটকে থাকা প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার ব্যবহারে উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন।
বিটি/ আরকে
Tags: উন্নয়ন অংশীদার, নির্বাচন, প্রতিশ্রুতি স্থগিত, সহায়তা