ওয়াশিংটন থেকে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণায় জানানো হয়েছে যে, ২০১৫ সালে ইরানের কৌশলগত চাবাহার বন্দরের কার্যক্রমের জন্য ভারতকে যে নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি (waiver) দেওয়া হয়েছিল, তা যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। বৃহস্পতিবারের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্তের ফলে বন্দরের উন্নয়নে দিল্লির ভূমিকা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে, এবং এটি ওয়াশিংটনের “সর্বোচ্চ চাপ” নীতির অংশ হিসেবে তেহরানের ওপর চাপ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ইরান ফ্রিডম অ্যান্ড কাউন্টার-প্রলিফারেশন অ্যাক্ট (আইএফসিএ)-এর আওতায় দেওয়া এই ছাড়ের কারণে ভারত ও অন্যান্য দেশ মার্কিন শাস্তির ভয় ছাড়াই বন্দরের কাজ চালিয়ে যেতে পারছিল। ভারতের জন্য চাবাহার বন্দরের কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। এটি পাকিস্তানকে এড়িয়ে আফগানিস্তান এবং মধ্য এশিয়ায় বাণিজ্য পথ তৈরি করে।
১৬ সেপ্টেম্বর, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে এই সিদ্ধান্ত “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরান সরকারকে বিচ্ছিন্ন করার সর্বোচ্চ চাপ নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।” এতে আরও বলা হয়েছে, “একবার প্রত্যাহার কার্যকর হলে, যারা চাবাহার বন্দরে কাজ করে বা আইএফসিএ-তে বর্ণিত অন্যান্য কার্যকলাপে জড়িত, তারা নিষেধাজ্ঞার শিকার হতে পারে।”
ভারতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ
এই ছাড় প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ভারতকে এক কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে। এর কারণ হলো, গত ১৩ মে, ২০২৪-এ ভারত ইরানের বন্দর ও সমুদ্র সংস্থার সঙ্গে চাবাহার পরিচালনার জন্য একটি ১০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। এই চুক্তির অধীনে ইন্ডিয়ান পোর্টস গ্লোবাল লিমিটেড (আপিজিএল) প্রায় ১২০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, এবং বন্দরের অবকাঠামোর জন্য আরও ২৫০ মিলিয়ন ডলার ঋণের পরিকল্পনা রয়েছে।
ভারতের জন্য চাবাহার কেবল একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র নয়। ২০০৩ সালে ভারত এই বন্দর উন্নয়নের প্রস্তাব দিয়েছিল, কারণ এটি পাকিস্তানকে এড়িয়ে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় সংযোগ স্থাপন করে এবং আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভারত, রাশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে। এই বন্দরটি ইতিমধ্যেই আফগানিস্তানে গম ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ পাঠানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৮ সালে নিষেধাজ্ঞা পুনরায় আরোপের পরও ভারত চাবাহার বন্দর প্রকল্পকে এর আওতার বাইরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। তখন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর চাবাহার বন্দরের উন্নয়ন এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত রেলওয়েকে কিছু নিষেধাজ্ঞা থেকে ‘ছাড়’ দিয়েছিল, কারণ এটিকে আফগানিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়েছিল।
তবে এখন যখন যুক্তরাষ্ট্র সেই ছাড় প্রত্যাহার করে নিচ্ছে, তখন ভারতকে তার বিনিয়োগ এবং এই প্রকল্পে জড়িত সংস্থাগুলোকে রক্ষার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
আফগানিস্তানে ফিরে আসার ইঙ্গিত এবং চীনের প্রভাব
ওয়াশিংটনের এই সর্বশেষ সিদ্ধান্ত এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে এসেছে, যখন নয়াদিল্লি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতে চাইছে।
কৌশলগতভাবে, চাবাহার ভারতকে আরব সাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় সাহায্য করে। কারণ এই ইরানি বন্দরটি পাকিস্তানের গোয়াদর থেকে মাত্র ১৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, যা বেইজিং মাধ্যমে পরিচালিত হয়। চাবাহারে কার্যক্রম পরিচালনা করার সুযোগ হারানো ভারতের আঞ্চলিক প্রতিযোগিতামূলক ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আফগানিস্তানে বাগরাম বিমানঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি পুনরায় স্থাপনের জন্য কাজ করছেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। চার বছর আগে আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে বিশৃঙ্খলভাবে সরে যাওয়ার পর ঘাঁটিটি তালেবানের হাতে চলে গিয়েছিল।
যুক্তরাজ্যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প এই ধারণাটি উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, “আমরা এটি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি।”
ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে তালেবানের সঙ্গে একটি চুক্তি আলোচনার মাধ্যমে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের শর্ত নির্ধারণ করেছিলেন। তবে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অধীনে ২০ বছরের এই সংঘাতের সমাপ্তি ঘটেছিল এক অস্থির পরিস্থিতিতে। বাইডেনের রিপাবলিকান সমালোচকরা, যার মধ্যে ট্রাম্পও আছেন, একে একটি ব্যর্থ প্রেসিডেন্সির প্রতীকী মুহূর্ত হিসেবে তুলে ধরেছেন।
ট্রাম্প আবারও বাগরামে মার্কিন উপস্থিতির গুরুত্বের কথা বলেন, কারণ এটি চীনের কাছাকাছি অবস্থিত। তিনি বলেন, “আমরা এই ঘাঁটিটি চাই কারণ এটি, আপনারা জানেন, চীন যেখানে তার পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে সেখান থেকে এক ঘণ্টার দূরত্বে।”
বিটি/ আরকে
Tags: অমর একুশে বইমেলা, ইরান-ভারত, চাহাবার, ট্রাম্প, ভারত