যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঝিমিয়ে পড়া শান্তি আলোচনা পুনরায় সচল করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ইরানের রাজধানী তেহরানে পৌঁছেছে কাতারের একটি প্রতিনিধিদল। শুক্রবার দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এই সফর নিশ্চিত করা হয়েছে। কাতারের প্রধানমন্ত্রীর একজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টার নেতৃত্বে এই দলটি ইরানি কর্মকর্তাদের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করবে।
এর মাত্র একদিন আগে ইরানের গণমাধ্যমে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়িকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্যমতে, এই চিঠিতে কোনো নির্দিষ্ট শান্তিচুক্তির শর্তের চেয়ে আলোচনার সম্ভাব্য কাঠামোগত বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাতারের মধ্যস্থতায় এই চিঠিটি গত রোববার জেনারেল রেজায়ির হাতে পৌঁছায়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন। এই ঘটনার পর থেকেই শুরু হওয়া যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই সংঘাত প্রশমনে এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর থেকেই কাতার ও পাকিস্তান নিয়মিত মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
চলতি সপ্তাহে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও তেহরান সফর করেছেন। এর আগে গত মঙ্গলবার মস্কোতে এক বৈঠকের ফাঁকে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। এছাড়া গত রোববারও কাতারের একটি প্রতিনিধিদল তেহরান সফর করেছিল বলে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন। গত আট মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের যুদ্ধ নতুন করে পূর্ণমাত্রায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার মধ্যে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কয়েকটি দেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা তেহরান সফর করেছেন।
বুধবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে পাকিস্তান ও কাতারের সাথে একটি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে তেহরান। এ লক্ষ্য অর্জনে ওয়াশিংটনকে সাতটি শর্ত পূরণের আহ্বান জানিয়েছে ইরান। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে পুরো অঞ্চলে, বিশেষ করে লেবাননে চলমান হামলা বন্ধ করা, বিদেশে জব্দ করা ইরানের সম্পদ ছাড় দেওয়া এবং দেশটির তেল খাতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা ও মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া। লেবাননে ইসরাইলের প্রতিদিনের হামলা অব্যাহত থাকায় আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতির বিষয়টিও ইরানের দাবিতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইরানের বন্দরগুলোতে কঠোর অবরোধ আরোপ করে রেখেছে, যা দেশটির তেল রপ্তানি ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতি অর্জনের বিষয়টি এখন ইরানের দাবির কেন্দ্রে রয়েছে। গত আগস্টে মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা জোট গঠনের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এতে দেশটির তেল রপ্তানি ও বাণিজ্য কার্যক্রম আরও সীমিত হয়ে পড়েছে।
Tags: ইরান, কাতার, মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র, যুদ্ধবিরতি