জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৃহস্পতিবার বিকেলে স্পিকার ড. হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এই বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়।
এর আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়। নির্বাচনের পর নতুন সরকারের এটিই প্রথম এবং দেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও নতুন সরকারের যাত্রা
অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, দেড় দশকের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন এবং চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নতুন করে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে এবং সেই সরকারের পক্ষ থেকেই প্রথম বাজেট উপস্থাপন করা হলো।
শহিদ ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা
বাজেট বক্তৃতার শুরুতে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহিদ, নির্যাতিত নারী এবং স্বাধীনতার পর থেকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মদানকারী ব্যক্তিদের স্মরণ করেন অর্থমন্ত্রী। একই সঙ্গে গুম, খুন ও গুলিবর্ষণের শিকার আহত ব্যক্তিদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান তিনি।
রাজনৈতিক সংস্কার ও জুলাই জাতীয় সনদ
অর্থমন্ত্রী বলেন, শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের ধারাবাহিকতায় বিএনপির ভিশন-২০৩০, রাষ্ট্র মেরামতের ২৭ দফা এবং যুগপৎ আন্দোলনের ৩১ দফা গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সেই ৩১ দফার ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ ও মানবিক সমাজ
বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়, রাজনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ অপরিহার্য। দেশের সব মানুষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
অর্থনীতি পুনর্গঠনের অঙ্গীকার
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারের সময় লুটপাট ও অর্থ পাচারের কারণে দেশের অর্থনীতি ও প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমান সরকার জনগণের আস্থাকে ভিত্তি করে সেই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে।
বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়
সরকারের মতে, জাতীয় বাজেট শুধু এক বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; বরং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা এবং দেশের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার একটি রাষ্ট্রীয় রোডম্যাপ। এ বাজেটের মাধ্যমে নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পরিকল্পনা
নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানকে প্রধান কৌশল হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি
সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি দেশের জনমিতিক ও দীর্ঘজীবিতা লভ্যাংশ কাজে লাগিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাজেটের ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার
১. সবার জন্য উন্নয়ন
দেশের সব অঞ্চল, শ্রেণি ও জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
২. শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা
দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে বাস্তবমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু এবং সবার জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
৩. সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা
সব বয়সী নাগরিকের জন্য জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
৪. বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান
পরিকল্পিত শিল্পায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মকাণ্ড এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষিকে খাদ্য নিরাপত্তার কৌশলগত খাত হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৫. ব্যবসা সহজীকরণ
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বচ্ছ, সহজ ও সাশ্রয়ী ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
৬. আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা
ব্যাংক ও আর্থিক খাতের অনিয়ম দূর করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি পুঁজিবাজার সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
৭. জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৮. তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ
বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
৯. পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বনায়ন কর্মসূচি জোরদার এবং দেশব্যাপী খাল খনন কার্যক্রম পুনরায় চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
১০. দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন
মেধাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলে সরকারি বিনিয়োগের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
নতুন অর্থনৈতিক খাতের ওপর গুরুত্ব
প্রথাগত অর্থনৈতিক খাতের পাশাপাশি ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি, ক্রীড়া অর্থনীতি, সবুজ অর্থনীতি এবং সুনীল অর্থনীতিকে জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া বাজেটের প্রতিটি বিনিয়োগে ‘ভ্যালু ফর মানি’, বিনিয়োগের আর্থিক সুফল, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সরকারের প্রত্যাশা
সরকারের মতে, এই বাজেটের মাধ্যমে মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর একচেটিয়া আধিপত্য কমিয়ে একটি প্রতিযোগিতামূলক, উৎপাদনশীল ও মর্যাদাবান বাংলাদেশের ভিত্তি গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সরকার আশা করছে, প্রস্তাবিত এই মেগা বাজেট বৈষম্যহীন উন্নয়ন, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং সব শ্রেণির নাগরিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আগামী এক বছরের কার্যকর নীতিপরিকল্পনা হিসেবে কাজ করবে।
Tags: বাজেট ২০২৬