২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে প্রযুক্তিপণ্য, স্বাস্থ্যসামগ্রী, কৃষি উপকরণ ও পরিবহন খাতে ব্যাপক কর ও শুল্ক পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে কিছু পণ্যের দাম কমার সম্ভাবনা তৈরি হলেও কয়েকটি পণ্যের দাম বাড়তে পারে।
৬০ নিত্যপণ্যে কর ছাড়
প্রস্তাবিত বাজেটে ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল ও বিভিন্ন বীজসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে এসব পণ্যের দাম কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া শিশুখাদ্যের ওপর কর কমানো হয়েছে। আমদানি করা সব ধরনের মসলা ও খেজুরের ওপর ৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে, যা এসব পণ্যের বাজারমূল্য কমাতে সহায়ক হতে পারে।
শিল্প ও ভোগ্যপণ্যে স্বস্তি
বাজেটে ওয়াশিং মেশিন, ইলেকট্রিক ওভেন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন এবং এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর কর-শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে এসব পণ্যের দাম কমতে পারে।
এ ছাড়া দেশে উৎপাদিত ট্রান্সফরমার, ডিটারজেন্ট, বৈদ্যুতিক মোটর, বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশ, স্কিন কেয়ার ও সৌন্দর্যচর্চার পণ্য এবং সিমেন্টের দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্বর্ণ ও কফির দামেও প্রভাব
জুয়েলারি পণ্য তৈরিতে প্রতি ভরি স্বর্ণের ওপর আড়াই হাজার টাকা ভ্যাট নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকারের বাজারে মূল্য সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে কফির কাঁচামাল আমদানিতে ৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব করায় কফির দামও কমতে পারে।
ব্যাংক গ্রাহকদের জন্য সুবিধা
প্রস্তাবিত বাজেটে একটি ব্যাংক হিসাব থেকে বছরে মাত্র একবার আবগারি শুল্ক কাটার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
একই সঙ্গে ব্যাংক হিসাবের ওপর আবগারি শুল্ক আরোপের সীমা ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে। ফলে ক্ষুদ্র আমানতকারীরা কিছুটা স্বস্তি পাবেন।
সৌরবিদ্যুৎ খাতে কর রেয়াত
সৌরবিদ্যুৎ বিল পরিশোধে ৫ শতাংশ কর রেয়াত দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম আমদানিতে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত সব ধরনের শুল্ক শূন্য রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যের দাম কমতে পারে
মোবাইল ফোন, ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন, এটিএম মেশিন ও সিসিটিভি ক্যামেরার দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ছাড়া ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, মনিটর ও প্রিন্টারের উৎপাদন ও আমদানি ব্যয় কমায় এসব পণ্যের বাজারমূল্যও কমতে পারে।
স্মার্টকার্ড, ডেবিট কার্ড ও ক্রেডিট কার্ড উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা খাতে উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
স্বাস্থ্যখাতে বড় সুবিধা
কিডনি ডায়ালাইসিসের ফিল্টার আমদানিতে শুল্ক কমানোর ফলে রোগীদের প্রতিবার ডায়ালাইসিসে প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত খরচ কমতে পারে।
বিশ্বমানের ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধ উৎপাদনে ব্যবহৃত নতুন ৯টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট শূন্য করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া হৃদরোগীদের ব্যবহৃত স্টেন্টের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা এবং চোখের লেন্সের দাম প্রায় ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহৃত ১৫টি পণ্যের অগ্রিম আয়কর ১ শতাংশ কমানোর প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
কৃষিখাতে স্বস্তির বার্তা
কীটনাশক ও বালাইনাশক উৎপাদনে ব্যবহৃত ৩৬টি কাঁচামালের ওপর মূসক শূন্য করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যয় কমতে পারে।
একই সঙ্গে ভেটেরিনারি ওষুধ, পোল্ট্রি ও ডেইরি শিল্পের খাদ্য উৎপাদন ব্যয়ও কমতে পারে।
তবে আমদানি করা কাজুবাদামের দাম কিছুটা বাড়তে পারে বলে বাজেট প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইলেকট্রিক গাড়িতে ছাড়, বাড়তে পারে কিছু গাড়ির দাম
পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক গাড়ি ও এর যন্ত্রাংশের ওপর কর-শুল্ক ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে ইলেকট্রিক গাড়ি, বাস ও ট্রাকের দাম কমতে পারে।
অন্যদিকে ১২০০ থেকে ১৬০০ সিসি ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনচালিত (আইসি) গাড়ির দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য সুখবর
প্রস্তাবিত বাজেটে কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের আয় শতভাগ করমুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি স্টার্টআপ, উদ্ভাবনী উদ্যোগ, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা এবং ফ্রিল্যান্সারদের ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
মোবাইল সিমের কর প্রত্যাহার
সরকার প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা থাকলেও মোবাইল সিমের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকার কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেছে।
ফলে নতুন সিম কেনার ক্ষেত্রে গ্রাহকরা সরাসরি সুবিধা পাবেন।
বাড়ছে সিগারেটের দাম
প্রস্তাবিত বাজেটে সিগারেটের খুচরা মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
নিম্নস্তরের প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেটের দাম ৬২ টাকা, মধ্যম স্তরের ৯২ টাকা, উচ্চ স্তরের ১৬০ টাকা এবং অতি উচ্চ স্তরের সিগারেটের দাম ২১০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
ফলে সব স্তরের ধূমপায়ীদের সিগারেট কিনতে আগের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে।
এক নজরে
দাম কমতে পারে: চাল, চিনি, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, খেজুর, মসলা, শিশুখাদ্য, ওয়াশিং মেশিন, এলপিজি সিলিন্ডার, সিমেন্ট, স্বর্ণালংকার, কফি, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ফ্রিজ, এসি, ডায়ালাইসিস ফিল্টার, স্টেন্ট, চোখের লেন্স, সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও ইলেকট্রিক গাড়ি।
দাম বাড়তে পারে: সিগারেট, আমদানি করা কাজুবাদাম এবং ১২০০-১৬০০ সিসি ক্ষমতার কিছু আইসি ইঞ্জিনচালিত গাড়ি।
Tags: বাজেট ২০২৬