স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর অনলাইন বিনোদনের এই সময়ে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা সহজ নয়। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামে শিশু-কিশোরদের পাঠ্যবইয়ের বাইরের জগতে আগ্রহী করে তোলা বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার সীমান্তঘেঁষা আগ্রাদিগুন গ্রামে কাজ করছে ‘মজিবুর রহমান স্মৃতি গ্রন্থাগার’। বই পড়ার পাশাপাশি নানা প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে শিশু-কিশোরদের যুক্ত করছে পাঠাগারটি।
শুরুতে এসব আয়োজনে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কম থাকলেও ধীরে ধীরে বাড়ছে অংশগ্রহণ। আশপাশের ৪২টি গ্রামের শিশু ও তরুণদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে একাধিক পাঠক দল। এসব দলের সদস্যরা নিয়মিত গ্রন্থাগারে এসে বই পড়ছে। পাশাপাশি নিজেদের পরিচিতদের বই পড়ায় উৎসাহিত করছে। পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে পাঠকদের নিয়ে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে।
গ্রন্থাগারটির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আলমগীর কবির জানান, উপজেলার ২৬টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও আশপাশের কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে নিয়মিত আয়োজন করা হচ্ছে। প্রতি মাসে নির্দিষ্ট দিনে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা গ্রন্থাগারে আসে। তাদের জন্য শিক্ষণীয় তথ্যচিত্র প্রদর্শন, বই পড়া, ছড়া-কবিতা, বিতর্ক ও গানসহ নানা আয়োজন থাকে। প্রতিযোগিতা ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের পুরস্কৃত করা হয়। এসব আয়োজনের ব্যয় বহন করে গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ।
শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের বাইরের জগৎ সম্পর্কে জানাতে মাঝেমধ্যে শিক্ষণীয় সিনেমা ও তথ্যচিত্রও প্রদর্শন করা হয়। পরিবেশ, সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তাদের আগ্রহী করে তোলার পাশাপাশি সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ তৈরি করাও এসব আয়োজনের উদ্দেশ্য।

আলমগীর কবির বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ও গ্রিন ভয়েস বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা। বাবা মরহুম মজিবুর রহমানের স্মৃতি ধরে রাখতে পরিবারের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেন এই গ্রন্থাগার। তার মতে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস তৈরির পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক বন্ধন গড়ে তোলাও পাঠাগারের গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
শুধু পাঠাভ্যাস নয়, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সহায়তার জন্যও কাজ করছে গ্রন্থাগারসংশ্লিষ্ট মজিবুর রহমান ফাউন্ডেশন। গত কয়েক বছর ধরে উপজেলার বিভিন্ন মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং মাদ্রাসার মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে।
পাঠাগারটির উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন স্থানীয় শিক্ষকেরাও। চকময়রাম সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খেলাল-ই-রব্বানী বলেন, গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা নিঃসন্দেহে মহৎ উদ্যোগ। গ্রন্থাগার মনুষ্যত্ব বিকাশের অন্যতম মাধ্যম। মনুষ্যত্বের বিকাশের মধ্য দিয়েই মানুষ পূর্ণতা পায়।
আগ্রাদিগুন ইউনিয়নের প্রবীণ ব্যক্তি ও সাপাহার উপজেলার চৌধুরী চান মোহাম্মদ মহিলা ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. আব্দুল জলিল বলেন, মজিবুর রহমান গ্রন্থাগার নিজস্ব স্বকীয়তায় জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখবে। তার প্রত্যাশা, পাঠাগারটি মাদকমুক্ত, প্রতিহিংসামুক্ত ও ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ গঠনে অবদান রাখবে। নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরাও এই উদ্যোগ দেখে বই পড়ায় আগ্রহী হবে।

গ্রন্থাগারটির গ্রন্থাগারিক রায়হান পারভেজ বলেন, গ্রামের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেই তাদের কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। তবে স্থানীয় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আগ্রহ প্রতিনিয়ত এই কার্যক্রমে গতি আনছে।
প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও বই পড়ার বিকল্প হিসেবে পাঠাগারের গুরুত্ব কমেনি। আগ্রাদিগুনের এই উদ্যোগে সেই বার্তাই সামনে আসছে। একটি গ্রন্থাগারকে ঘিরে শিশু-কিশোরদের পাঠাভ্যাস, সৃজনশীলতা ও সামাজিক যোগাযোগের যে পরিসর তৈরি হচ্ছে, তা প্রত্যন্ত জনপদে জ্ঞানচর্চার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
Tags: মজিবুর রহমান স্মৃতি গ্রন্থাগার