“অসম্ভব বলে কিছু হয় না”- এই চিরন্তন সত্যটি যেন বুধবার আসামের গোহাটির সবুজ গালিচায় এক নতুন মাত্রা পেল। যখন মার্কো জানসেন তাঁর ২.০৮ মিটার দীর্ঘ শরীরটাকে সূর্যের আলো থেকে এক বিল্ডিংয়ের ছায়ায় ছুড়ে দিলেন, আর অসম্ভবকে সম্ভব করার শেষ এক প্রচেষ্টায় বাঁ হাতটি ছুড়ে দিলেন শূন্যে— সে যেন এক প্রতীকী যাত্রা, এক গভীর রূপকের জন্ম দিয়েছিল। মাটির বুকে আছড়ে পড়লেন তিনি, হাতে ধরা সেই মূল্যবান বল; টেস্ট সিরিজ সমাপ্তকারী ক্যাচ।
জানসেনের সেই মুহূর্তের পড়ে যাওয়া যেন দক্ষিণ আফ্রিকার দীর্ঘ পরাজয়ের ক্লান্ত, ক্লিষ্ট ইতিহাসের এক খণ্ডচিত্র। কিন্তু ক্যাচটি হাতে নিয়ে তাঁর উঠে দাঁড়ানো— সেটিই হলো অন্ধকার থেকে আলোতে ফিনিক্সের মতো উদয়ের গাথা। এ এক যুগান্তকারী পরিবর্তন, যা শুরু হয়েছিল জানসেনের জন্মের ৫৬ দিন পর।
দীর্ঘ ২৪ বছরের অভিশাপমুক্তি
প্রায় ২৫ বছরের এক দীর্ঘ যাত্রাপথ। এই সময়ের মধ্যে ভারতভূমিতে ১৪টি টেস্ট খেলেও অধরা ছিল সেই ‘ফ্রিডম ট্রফি’। ১৯৯৯-২০০০ সালে বেঙ্গালুরুতে অর্জিত সেই প্রথম এবং একমাত্র সিরিজ জয়ের পর, ভারত যেন দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হয়ে উঠেছিল এক দুর্ভেদ্য দুর্গ। নয়টি ভারতীয় জয় সেই সময়ের স্কোরবোর্ডকে করেছিল ভারাক্রান্ত।
কিন্তু বুধবার সেই গ্লানির অবসান হলো। একবিংশ শতাব্দীর দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট দল, যেখানে টেম্বা বাভুমা, সাইমন হার্মার, ট্রিস্টান স্টাবস এবং ডেওয়াল্ড ব্রেভিসের মতো তারকারা উজ্জ্বল বর্তমানের অংশ, তারা রচনা করলো নতুন ইতিহাস।
ঘূর্ণি-বিভীষিকা থেকে মুক্তি: মহারাজের বিপ্লব
ভারত সব সময়ই প্রোটিয়াদের কাছে ‘জুয়েল ইন দ্য ক্রাউন’— সবচেয়ে প্রতিকূল এবং বিদেশি ভূমি। এর মূল কারণ ছিল স্পিনকে বোঝার অজ্ঞতা। পেসের নিরলস আক্রমণের মাঝে স্পিন ছিল কেবলই একটি ‘বিরতি’।
তবে, কেশব মহারাজের উত্থান সেই দীর্ঘদিনের অন্ধকারকে ভেদ করলো। ২০১৬ সালে ওয়াকা-র মতো পেস-সহায়ক পিচে তাঁর অভিষেক সেই বিপ্লবের সূচনা। একরোখা, কৌশলবিদ এবং অবিচল মহারাজই যেন স্পিন-অবিশ্বাসী দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেট-মানসিকতার ফরাসির বিপ্লবী‘রোবসপিয়ের’ হয়ে উঠলেন— তবে রক্তপাতহীন, সম্পূর্ণ শান্ত বিপ্লব।
তাঁর নিরবচ্ছিন্ন সাফল্যের ফলেই হার্মারের মতো স্পিনাররা আবার দলে ফেরার সুযোগ পেলেন। গোহাটিতে কাগিসো রাবাদার অনুপস্থিতিতে ফাস্ট বোলার লুঙ্গি এনগিডির পরিবর্তে সেনুরান মুথুস্বামীকে বেছে নেওয়ার সাহসী সিদ্ধান্ত— এটিই প্রমাণ করে, স্পিনের প্রতি তাদের বিশ্বাস এখন আকাশছোঁয়া।
কাণ্ডারী বাভুমা ও কনরাড: আলোর দিশারী
ব্যাটাররাও নিজেদের ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছে। মুথুস্বামীর শতরান কিংবা স্টাবস ও জানসেনের নব্বইয়ের ঘরে পৌঁছানো— এসবই ঘূর্ণি বলের বিরুদ্ধে তাদের উন্নতির স্বাক্ষর। কিন্তু এই সব বিচ্ছিন্ন অংশগুলোকে এক সুতোয় গেঁথেছেন অধিনায়ক টেম্বা বাভুমা এবং কোচ শুকরি কনরাড।
২০১৫ ও ২০১৯ সালের ভারতের সেই দুঃসহ সফরগুলোর সাক্ষী বাভুমা। কিন্তু কনরাডের হাত ধরে সবকিছু পাল্টে গেল। বাভুমার নেতৃত্বে খেলা প্রথম ১২টি টেস্টের মধ্যে ১১টিতেই জয়! কনরাডের কোচিংয়ে ২১ টেস্টের মধ্যে ১৬টিতে জয় এবং লর্ডসে ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে জয়ও সেই সাফল্যের মুকুটে জ্বলজ্বল করছে। এ যেন কনরাড কর্তৃক ‘প্রতিশ্রুত ভূমির’ শুধু দর্শন নয়, সেখানে পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সাফল্য, এশিয়ায় শেষ ছয় টেস্টের মধ্যে পাঁচটিতে জয়— সন্দেহ নেই, এই দলটি নিজেদের ইতিহাসের ‘সর্বকালের সেরা’ দলের তকমা পাওয়ার যোগ্য। মার্কো জানসেনের সেই ক্যাচের মতোই, দক্ষিণ আফ্রিকা এখন আঁধারের পর আলোয় উদ্ভাসিত— সমগ্র ক্রিকেট বিশ্বের সেরা দল!
সূত্র: ক্রিকবাজ
Tags: ‘ইতিহাসের সেরা’?, দক্ষিণ আফ্রিকা